পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বর্বরতার সাক্ষী রমনা কালীমন্দির

 Posted on

৭১-এর মার্চের আগে এমনই ছিল ১২০ ফুট উঁচু স্তম্ভ বিশিষ্ট রমনা কালী মন্দির
৭১-এর মার্চের আগে এমনই ছিল ১২০ ফুট উঁচু স্তম্ভ বিশিষ্ট রমনা কালী মন্দির

দলিতকন্ঠ ডেস্ক : রমনা কালীমন্দির ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত হিন্দু মন্দিরসমূহের মধ্যে অন্যতম। এটি রমনা কালীবাড়ি নামেও পরিচিত। এ মন্দিরটি প্রায় হাজার বছরেরও পুরাতন বলে ধারনা করা হলেও ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে মন্দিরটি আবার নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের দক্ষিণ দিকে ২.২২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল রমনা কালী মন্দির ও আনন্দময়ীর আশ্রম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দ্বারা মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে পরবর্তীকালে এটি আবার পুনর্নির্মিত হয়।

মন্দিরটি পাশেই রয়েছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ব পাশে হাইকোর্ট, দক্ষিণে কার্জন হল, পশ্চিম পাশে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং মন্দিরের ঠিক উলটো দিকে রয়েছে বাংলাদেশের পরিশীলিত জ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার ধারক বাংলা একাডেমি। এই সব ঐতিহাসিক স্থানের মধ্যমণি হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে রমনা কালীমন্দির।

বর্তমানে বাংলার সংস্কৃতিতে এ মন্দিরের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের সঙ্গেও রমনা কালীমন্দিরের নাম জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পরে পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠিত হয়েছিল রমনা রেসকোর্স ময়দানেই। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বাধীন বাংলাদেশে সফরে এসে একই স্থানে মুজিব-ইন্দিরা মঞ্চে বাংলার মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে ঢাকায় পৌঁছে ছুটে আসেন রমনা রেসকোর্স ময়দানেই।

রমনা কালী মন্দিরের নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে বেশকিছু জনশ্রুতি  রয়েছে। প্রায় ৫০০ বছর আগে বদরীনাথের যোশীমঠ থেকে গোপালগিরি নামে এক উচ্চমার্গের সন্ন্যাসী প্রথমে ঢাকায় এসে সাধন-ভজনের উপযোগী একটি আখড়া গড়ে তোলেন। তখন এ আখাড়া ‘কাঠঘর’ নামে অভিহিত হত। সেখানেই আরও ২০০ বছর পরে মূল রমনা কালীমন্দিরটি নির্মাণ করেন আর এক প্রসিদ্ধ সাধু হরিচরণ গিরি। হরিচরণ গিরিকর্তৃক নির্মিত নতুন মন্দিরটি বাঙালি হিন্দু স্থাপত্য রীতি বহন করে ছিল।

ঐতিহাসিক এই মন্দিরটির কাঠামো ছিল দ্বিতল। এর দ্বিতল ছাদের উপর ছিল চতুষ্কোণাকার ১২০ ফুট উঁচু চূড়া। মন্দিরের চূড়ার নিম্নভাগ ছিল ছত্রি ডিজাইন শোভিত। মন্দির চত্বরে পুরনো ও নতুন বেশ কয়েকটি সমাধি মন্দিরের কাঠামো ছিল। এই চত্বরে ছিল হরিচরণ ও গোপাল গিরির সমাধি।

পরবর্তী সময়ে ভাওয়ালের ভক্তিমতী ও দানশীলা রানী বিলাসমণি দেবীর আমলে এই মন্দিরের প্রধান সংস্কারকার্য হয়। প্রাচীর ঘেরা মন্দিরে ভদ্রকালীর মূর্তি সুন্দর একটি কাঠের সিংহাসনে স্থাপিত ছিল। এই মূর্তির ডান দিকেই ছিল ভাওয়ালের কালী মূর্তি। মন্দিরের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমে ছিল পূজারী সেবায়েত ও অন্য ভক্তদের থাকার ঘর। পাশে একটি শিব মন্দির, একটি নাট মন্দির ও সিংহ দরজা ছিল। সে সময়কার মানুষের পানীয় জলের সমস্যা মিটাতে ভাওয়ালের রানী বিলাস মনি কালীবাড়ির সামনের দীঘিটি কাটিয়েছিলেন। তবে ইংরেজ আমলের নথিপত্র অনুসারে দীঘিটি কাটিয়েছিলেন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ড’স। বর্তমানে এই দীঘিটি রমনার কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের স্মৃতি বহন করছে।

রমনা কালী মন্দিরের উত্তর পাশে ছিল মা আনন্দময়ী আশ্রম। শাহবাগের মা নামে পরিচিত এই সন্ন্যাসিনী ছিলেন ঢাকার নবাবের শাহবাগ বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রমনী মোহন চক্রবর্তীর স্ত্রী। বাজিতপুর থেকে চাকরি নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। আনন্দময়ী তাঁর সাধক স্বামীর নাম দিয়েছিলেন বাবা ভোলানাথ। শাহবাগে অবস্থান কালে এরা দুজন বিশেষ করে মা আনন্দময়ী আধ্যাত্মিক শক্তির ধারক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন এবং সাধিকা হিসেবে পূজিত হন। তাঁর ভক্তরা রমনা ও সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে দুটি আশ্রম তৈরি করে দেন। আনন্দময়ী আশ্রমের প্রবেশদ্বার ছিল পূর্বদিকে। পশ্চিম দিকে ছিল একটি নাট মন্দির। এর উত্তর দিকের একটি কক্ষে সংরক্ষিত ছিল মা আনন্দময়ীর পাদপদ্ম। মন্দিরের বেদীর উপর স্থাপিত ছিল বিষ্ণু ও অন্নপূর্ণা বিগ্রহ। কালীমন্দির প্রাঙ্গণে সন্ন্যাসী ভক্ত ছাড়াও সাধারণ কর্মজীবি অনেকেই তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে বাস করতেন এবং মন্দির ও আশ্রমের অনুষ্ঠানাদিতে অংশ নিতেন।

১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ। এই দুটো দিন রমনা কালীমন্দিরের পবিত্র ভূমি ঘিরে পাকিস্তানি সেনারা যে বিভীষিকার রাজত্ব তৈরি করেছিল তার করুণ কাহিনি ইতিহাসের পাতায় চিরদিন লেখা থাকবে। এক তীর্থভূমি রাতারাতি পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমিতে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ট্যাংক বহর নিয়ে মন্দিরটি ঘিরে ফেলে। মন্দিরের সেবায়েতসহ প্রায় ১০০ সন্ন্যাসী, ভক্ত এবং সেখানে বসবাসরত সাধারণ মানুষকে হত্যা করে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। রেহাই পায়নি শিশুরাও। এ সময় কালী মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ গিরি। এই হত্যাকান্ডের সময় রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম দাউ দাউ করে জ্বলেছিল। রমনা কালীমন্দিরের চূড়া ছিল ১২০ ফুট, যা বহুদূর থেকে দেখা যেত। সেটি ডিনামাইট দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় বর্বর পাকিস্তানি সেনারা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনও সরকার রমনা কালীমন্দির পুননির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে রমনা কালীমন্দিরকে ২.২৬ একর জমি দান করা ছাড়াও অন্যান্য সহযোগিতা করেন। ২০০৬ সালে রমনা কালীমন্দির আবার নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়। শুরু হয় পূজা-অর্চনা।

২০১৯ সালে রমনা কালীমন্দির মা আনন্দময়ী আশ্রমের বহুতল ভক্তনিবাস এবং মন্দির পুনর্নির্মাণে প্রাথমিক ভাবে ৭ কোটি টাকা অনুদান দেয় ভারত সরকার। মন্দির কমপ্লেক্সে ১ হাজার আসনের আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ ও অন্যান্য উন্নয়ন খাতে আরও অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় তৎকালীন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা দাসগাঙ্গুলী।

যা দেখবেন :
বিশাল এলাকা নিয়ে মন্দির কমপ্লেক্স। চারপাশ গাছপালায় আবিষ্ট। ছায়াঘেরা পরিবেশ, নগর জীবনের কোলাহল গ্রাস করবে না আপনাকে। আপনি চাইলেই গাছের ছায়ায় বসে যেতে পারবেন। তা ছাড়া মায়ের মন্দিরে গিয়ে মাতৃমূর্তি দর্শনের পরে সেখানে কিছু সময় প্রার্থনা করে আসতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন :
রমনাকালী মন্দিরের মূল প্রবেশ পথ হলো বাংলা একাডেমির বিপরীতে। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব দিকের গেট দিয়েও এখানে যাতায়াত করা যায়। ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আপনি রমনা কালী মন্দিরে যেতে পারেন।

Facebook Comments