নিজস্ব ভাষা হারাচ্ছে দলিত বেদে ও হরিজন সম্প্রদায়

 Posted on


পলাশ রায়, ঝালকাঠি প্রতিনিধি :
জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার এক শ্রেণির মানুষ সমাজে ‘দলিত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশে বাঙালি দলিত এবং অবাঙালি এই দুই রকমের দলিত স¤প্রদায় রয়েছে। এদের মধ্যে বাঙালি দলিত যেমন- চর্মকার, মালাকার, কামার, কুমার, জেলে, পাটনী, কায়পুত্র, কৈবর্ত, কলু, কোল, কাহার, ক্ষৌরকার, নিকারী, পাত্র, বাউলিয়া, ভগবানীয়া, মানতা, মালো, মৌয়াল, মাহাতো, রজদাস, রাজবংশী, রানা কর্মকার, রায়, শব্দকর, শবর, সন্ন্যাসী, কর্তাভজা, হাজরা, জোলা, হাজাম, বেদে, বাওয়ালি প্রভৃতি সম্প্রদায়।

আর অবাঙালি দলিত বলতে আমরা বুঝি ব্রিটিশ শাসনামলের বিভিন্ন সময়ে পূর্ববঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী, চা-বাগানের শ্রমিক, জঙ্গল কাটা, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাচি, মাদ্রাজ ও আসাম থেকে হিন্দি, উড়িয়া, দেশওয়ালি ও তেলেগু ভাষাভাষী যে সকল মানুষেরা এসেছিল তাদের বর্তমান প্রজন্মকে।

দখিন জনপদ ঝালকাঠিতে এই দুই স¤প্রদায়ের দলিত মানুষের বসবাস রয়েছে। এর মধ্যে বিহার ও উড়িষ্যা থেকে আসা হরিজন এবং বেদে স¤প্রদায় উল্লেখযোগ্য। ঝালকাঠি শহরতলীর কৃষ্ণকাঠি এলাকায় স্থায়ী ভাবে গত ১০ বছর ধরে সরদার আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে বেদে স¤প্রদায়ের বসবাস। জমি কিনে শত পরিবার এখন সেখানে বসবাস করছেন। নদীতে তাদের নৌকাও রয়েছে। পুরাতন পেশার সাথে কেউ কেউ নতুন নতুন পেশায়ও জড়িয়ে পড়েছেন। বেদে পল্লিতে সরেজমিনে গিয়ে সরদার আব্দুর রহিম, বেদে মোসলেম আলী, আব্দুল কুদ্দুসসহ একাধিক লোকজনের সাথে কথা হয়। তারা জানান, এক সময় তাদের পূর্বপুরুষ নৌকায় বসবাস করতেন। দেশের বিক্রমপুরে তাদের আদি বাস। তবে বর্তমানে বেদেরা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন এবং বিভিন্ন জেলায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেছেন।

ঝালকাঠির এ বেদে পল্লিতে গিয়ে দেখা গেছে নিজস্ব ভাষায় নিজেদের মধ্যে একে অপরে কথা বলেন বেদেরা। তবে অন্য স¤প্রদায়ের মানুষের সাথে স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় (বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা) কথা বলছেন। এমনকি এ প্রতিবেদকের সাথেও অন্য দশজনের মতো কথা বলছেন। তবে নিজেদের মধ্যে তারা কোন ভাষায় কথা বলছেন তা বলতে পারে নি বেদে পল্লির কেউ।

এ ব্যাপারে কথা হয় ঝালকাঠি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মাসুম বিল্লার সাথে। তিনি জানান, বেদে সাধারণভাবে বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সাথে এরা ঢাকায় আসে। পরবর্তীকালে তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়। এরা প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে এবং পরে সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও তারা ছড়িয়ে পড়ে। বেদের আদি নাম মনতং। বেদে নামটি অবজ্ঞাসূচক বাইদ্যা (হাতুড়ে ডাক্তার), পরিমার্জিত ‘বৈদ্য’ (চিকিৎসক) থেকে উদ্ভূত। অধিকাংশ বেদেই চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনতংরা কালক্রমে বেদে নামে অভিহিত হয়।

বেদেদের ভাষার প্রসঙ্গে মাসুম বিল্লাহ বলেন, বেদেদের নিজস্ব ভাষার নাম ঠেট বা ঠার। তাদের ভাষা তিব্বতি-বর্মি (সাক-লুইশ) ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তবে এ ভাষার কোনো লিপি নেই। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ী ঠারভাষী বাংলাদেশী বেদের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার বলেও জানান বাংলার শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ।

ঝালকাঠির বেদে স¤প্রদায় জানায়, তারা দিন দিন নিজেদের ভাষা ভুলতে বসেছে। সবার সাথে মিশতে গিয়ে নিজেদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আর পূর্ব-পুরুষের আমল থেকেই তাদের ভাষায় কোন বই পুস্তক না থাকায় নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের কাছে এখন বাংলাই মাতৃভাষায় পরিণত হয়েছে।

বৃটিশ আমল থেকেই ঝালকাঠিতে দলিত হরিজন স¤প্রদায়ের বসবাস। হরিজন শব্দটির অর্থ ঈশ্বরের সন্তান (হরির জন) হলেও আসলে আজও তারা অবহেলিত। যুগের পর যুগ অস্পৃশ্যতার বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে প্রতিবেশী বাঙালিদের সঙ্গে আজও ওঠাবসার সম্পর্ক স্থাপন হয় নি। দলিত এ স¤প্রদায় সবার কাছে ‘মেথর’ নামে পরিচিত। মেথর ছাড়া এই জাতিসত্তাকে দলিত, অস্পৃশ্য, অচ্ছুৎ ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়।
জানাগেছে, এরা বাংলাদেশে (পূর্ববঙ্গে) আসে আঠারো শতকের প্রথম দিকে। তৎকালের জমিদার ও ব্রিটিশ প্রধিনিধিরা তাদের অন্ন ও বাসস্থানের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসেন। এরপর তারা ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। এখানে তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় সুইপারের চাকরি। বাংলাদেশে বসবাসকারী হরিজনের ১৯৯১ সালের আদমশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় প্রথম হরিজন নামটি পাওয়া যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হরিজনদের আছে নানা গোত্র- বাঁশফোড়, হেলা, হাড়ি, ডোম, বাগদি, ডোমার, তেলেগু, রাউত, লালবেগি, বাল্মীকি, টাঁক, রবিদাস ইত্যাদি। হরিজনদের আলাদা ভাষা রয়েছে। হরিজনদের ভাষায় সপ্তাহের সাত দিন ক্রমানুসারে সনি, আয়তয়ার, সম, মংগার, বুধ, বিসুদ, সুক্কুর। এ ছাড়া সংখ্যা গণনা, মাসের নাম, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অলংকার-প্রসাধনীর নাম, ধর্মীয়-আচার, বাদ্যযন্ত্র, আসবাব, খাদ্যদ্রব্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে হরিজনদের রয়েছে আলাদা শব্দভাÐার। হরিজনরা মূলত তেলেগু, ভোজপুরী, জোবালপুরী, হিন্দি, সাচ্চারী ও দেশওয়ালি ভাষায় কথা বলে। তবে বর্তমানে হারিয়ে যাচ্ছে হরিজনদের মাতৃভাষা। বাড়িতে নিজেরা এ ভাষায় কথা বললেও কাজে কর্মে তারা অন্য সবার মতোই বাংলায় কথা বলে।

এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠি হরিজন পল্লির শিক্ষিত যুবক অজয় ভক্ত বলেন, একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে আমরা নিজেদের ভাষায় কথা বলি। বাইরে একবারেই না। কারণ মাতৃভাষায় কথা বললেই মানুষ আমাদের দিকে আড় চোখে তাকায়। সামাজিক বৈষম্যে এড়াতে আমরা সব জায়গায় নিজেদের পরিচয় গোপন করে রাখতেই মাতৃভাষায় কথা বলি না।

পলাশ রায়, জেলা প্রতিনিধি, সময় টিভি ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments