প্রয়োজন যথাযথ পদক্ষেপ : তাড়াশ-রায়গঞ্জে আদিবাসীদের সাদরি ভাষার প্রসার নেই

 Posted on

স্বপন মির্জা, সিরাজগঞ্জ :
উত্তরাঞ্চলের সমতলের আদিবাসী অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ-রায়গঞ্জে আদিবাসীদের সাদরি ভাষায় প্রসার নেই। যদিও সরকার মাতৃভাষা বাংলাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ভাষাভাষী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গোত্রের মাতৃভাষার প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাথমিকে শিশু শ্রেণী হতে ৩য় শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে নিজ মাতৃভাষা সাদরি বই সংযুক্ত করা হলেও এই ভাষার জন্য আলাদা শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তাই দায়িত্বশীল মহল এ বিষয়ে যথাযথ কার্যকরী ভূমিকা রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে।

উত্তরের সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে চলনবিল অধুষ্যিত সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম, মাধাইনগর, তালোম, বারুহাঁস, তাড়াশ সদর, মাগুরা বিনোদ, দিঘী সগুনা, নওগা এবং রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া, ধামাইনগর ও ধুবিল ইউনিয়নে প্রায় ৬০/৭০ হাজারের মতো বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। এদের মধ্যে ওড়াঁও, মাহাতো, তেলী, তুরি, রবিদাস, কনকদাস, সাঁওতাল, বড়াইক, সিং, সরকারসহ একাধিক সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী বংশ পরম্পরায় কৃষি, বাঁশ-বেতের কুটির শিল্প ও কৃষি শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।

উত্তরবঙ্গের শস্যভান্ডার খ্যাত সিরাজগঞ্জের এই চলনবিল অঞ্চলে ১৮৮৬ সালের দিকে ভারতের বিহারের নাগপুর ও ঝাড়খন্ড থেকে এসকল আদিবাসী সম্প্রদয়ের মানুষের আগমন ঘটে। তখন তাড়াশ, রায়গঞ্জ এলাকার জমিদাররা তাদের অনাবাদী বন জঙ্গল ঘেরা ভূমিতে শস্য উৎপাদনের জন্য সন ওয়ারী লিজ প্রদান করে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অধিকতর পরিশ্রমী হওয়ায় আশাতীত ফলন ফলিয়ে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হতে থাকে। যে কারণে সম্পদশালী এই আদিবাসীরা তখন সুখেই ছিল। তবে বর্তমানে তাদের সে অবস্থা আর নেই। লিজ নেয়া জমিগুলো কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে প্রভাবশালী জোতদাররা। জমির মালিক থেকে আদিবাসীরা হয়ে যাচ্ছে কৃষিশ্রমিক। তাই তাদের সাংস্কৃতিক উৎসব বর্ণাঢ্যতা হারিয়েছে। নিজেদের আদি মাতৃভাষা সাদরি ভাষার প্রচলনও দিন-দিন হ্রাস পাচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকার এ ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে আদিবাসী অধ্যুষিত রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার অন্তত ২৫/৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু থেকে ৩য় শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে সাদারি ভাষার বই অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে এতে সমস্যা রয়েই গেছে। এখানে ইংরেজী, বাংলা, অংক, ধর্ম শিক্ষায় অভিজ্ঞ শিক্ষকগণ পাঠদান করেন। সাদারি ভাষায় অভিজ্ঞদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না দেয়ায় তা রপ্ত করতে পারছে না কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

এ ব্যাপারে দেশীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বপন চন্দ্র সরকার ও মাধাইনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোকুল চন্দ্র মাহাতো জানান, আমরা আমাদের ভাষার প্রতি যতœশীল। তবে স্কুলে সাদরি ভাষার যে পাঠ্যপুস্তক রয়েছে তা পড়ানোর জন্য আলাদা শিক্ষক নেই। এ অবস্থায় যেমন প্রথমত সাদরি ভাষার বই পড়ানোর জন্য শিক্ষক দরকার। তেমনি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত তা প্রসারে উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে তাদের নিজস্ব ভাষার প্রসার ঘটবে।

এদিকে যেহেতু মাতৃভাষা বাংলা জাতীয় ও দাপ্তরিক ভাষা। বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিয়ে বাংলাকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। তাই অন্য ভাষার প্রতিও মর্যাদাবান হওয়া বাংলা ভাষাভাষীদের দায়িত্ব। অর্থাৎ পূর্ব প্রজন্ম মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছে, তাই ভাষা আন্দোলনের সুফল পাওয়া পরবর্তী প্রজন্ম সব ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সেসব ভাষা রক্ষায় সক্রিয় হবে এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরেও আমরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। বরং আমরা বাংলা ভাষা আদিবাসীদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছি। যা ভাষা আন্দোলনের মহত্বকে গৌণ করে তুলছে বলে মনে করে দায়িত্বশীল মহল।

স্বপন মির্জা, একুশে টেলিভিশনের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments