হারিয়ে যাচ্ছে নওগাঁর সংস্কৃতি

 Posted on

নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী আলকাবের গানের একটি দৃশ্য।

মো. আতাউর রহমান, নওগাঁ :: নওগাঁর লোকজ সংস্কৃতির মধ্যে অন্যতম ছিলো- যাত্রা, পালাগান, জারী গান, সাইদুরের কিচ্চা, মঙ্গলচন্ডি ও আলকাবের গান। তবে নওগাঁর লোকজ সংস্কৃতির অংশ না হলেও পার্শ^বর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরা নওগাঁর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। আলকাবের গান হলো এমন একটি সাংস্কৃতিক মাধ্যম যা হাস্যরসের মাধ্যমে মানুষকে বিভিন্ন বিষয়ে বার্তা প্রদান করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আলকাবের সাথে গম্ভীরা কিছুটা মিল রয়েছে। অমিলের জায়গা হলো গম্ভীরায় মুলত ২ জন অভিনেতা থাকেন কিন্তু আলকাবের ক্ষেত্রে একাধিক অভিনেতার প্রয়োজন হয়। আমার এই উদাহারনটি উপস্থাপনের উদ্দেশ্য হলো নওগাঁর আনাচে-কানাচে যে সকল লোকজ সংস্কৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সে বিষয়ে কার্যত কোন কাজ না থাকায় সেগুলো অন্তরালেই রয়ে যাচ্ছে এবং আধুনিক সংস্কৃতির নীচে তা চাপা পড়ে যাচ্ছে। যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলার লোকজ সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও পৃষ্ঠপোষক হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। এরাই মুলতঃ দেশের লোকজ সংস্কৃতির চর্চা ও তা বাঁচিয়ে রেখেছে। লোকজ সংস্কৃতির সাথে মুলধারার মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ জড়িত থাকলেও তা উল্লেখ করার মতো নয়। বরং মুষ্টিমেয় যে সকল মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সহিত নিজেদের জড়িত করেছে তাঁরা পরিবার ও সমাজ কর্তৃক অবহেলা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। আমার জানা মতে এ দোষে সমাজচ্যুতও হতে হয়েছে অনেককে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যদি বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে আঁকড়ে না ধরতো তবে আজ পর্যন্ত লোকজ সংস্কৃতির যতটুকু অবশিষ্ট আছে সেটিও অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে যেতো। ২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী নওগাঁয় প্রায় ৫ লাখ বিভিন্ন গোত্রের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাস। এরাই মুলতঃ লোকজ সংস্কৃতির ধারা বহন করে চলছে যুগ যুগ ধরে। কোন কিছু পাওয়ার আশায় নয়। নিঃস্বার্থভাবে, দেশের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। তবে এ কথা সত্য যে, দেশের লোকজ সংস্কৃতির সাথে যে সকল শিল্পী ও কলাকুশলী জড়িয়ে আছে তাঁরা আজ ভালো নেই। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট কাজে টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির বিস্তার এবং মুক্ত সংস্কৃতির চর্চার নামে বিদেশী চ্যানেলের দৌরাতেœ দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি আজ হাবুডুবু খাচ্ছে। নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ না করে অবাধে বিদেশী চ্যানেল চালানোর অনুমোদন দেওয়ায় মারাতœক প্রভাব পড়েছে দেশের লোকজ সংস্কৃতি এবং এর সাথে জড়িত কলাকুশলীদের জীবনের উপর। মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম হলো রং-চং এবং রাখ-ঢাকের দিকে ধাবিত হওয়া। আগের দিনে যেখানে বিভিন্ন উৎসব ও পার্বনের সময় লোকজ সংস্কৃতির আয়োজন করা হতো এখন সেখানে আধুনিক সংগীতের নামে গলা ফাটানো ঝাঁকানাকা নামক ব্যান্ড সংগীতের আয়োজন করা হচ্ছে। ক্ষণিকের আনন্দ লাভের জন্য মানুষ ছুটে যাচ্ছে এ সকল অপসংস্কৃতি দেখার জন্য এবং কোন কিছুই না বুঝে, কোন শিক্ষা না নিয়ে নেচে গেয়ে বাড়ি ফিরে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে মৌলবাদীদের হামলার আশংকায় সরকারিভাবেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিশেষ দিনের লোকজ সংস্কৃতির উৎসব। যা আর পরে আয়োজনের মুখ দেখেনি।

বাঙ্গালী লোকজ সংস্কৃতির চর্চাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের বিদেশী অপসংস্কৃতির প্রভাব হতে মুক্ত হতে হবে। সরকারিভাবে বন্ধ করে দিতে হবে মুক্ত সংস্কৃতির নামে চলমান বিতর্কিত কতিপয় টিভি চ্যানেল। সকল টিভি চ্যানেলে লোকজ সংস্কৃতির অনুষ্ঠান বাধ্যতামুলক করতে হবে যাতে নতুন প্রজন্ম বাংলার লোকজ সংস্কৃতি বিষয়ে ধারণা লাভ করতে পারে এবং চর্চায় উৎসাহিত হয়। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নতুন প্রজন্মকে লোকজ সংস্কৃতির ধারণা দিতে হবে, পাঠ্যপুস্তকে লোকজ সংস্কৃতির বিষয় অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। সর্বোপরি বাংলার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উৎসব তথা-পৌষমেলা, পিঠা উৎসব, নবান্ন উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষ উদযাপনের সময় লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হবে এবং ব্যাপক প্রচারনা চালাতে হবে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে অগ্রগামি ভুমিকা পালন করতে হবে।

মো. আতাউর রহমান, উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সকালের খবর ও শারি’র দলিত ও মাইনোরিটি হিউম্যান রাইটস্ মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য

Facebook Comments