হারিয়ে যাচ্ছে চারশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী অভয়নগরের মৃৎশিল্প

 Posted on

সরোয়ার হোসেন, যশোর :: সামাজিক অসহযোগিতা ও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে যশোরের অভয়নগর উপজেলার মৃৎশিল্প। প্রায় চারশ’ বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই শিল্পটি আধুনিক প্রযুক্তির করালগ্রামে মুথ থুবড়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে এ পেশার সাথে যুক্তদের অনেকে জীবন ও জীবিকার তাগিতে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।

স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, অভয়নগর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের কুমোর পাড়ায় মৃৎশিল্পের উৎপত্তি প্রায় চারশ’ বছর আগে। পার্শ্ববর্তী পাইকপাড়া গ্রামে মোঘল আমলে প্রথম আবাস শুরু করে এখনকার কুমোরদের পূর্বপুরুষরা। পরবর্তীতে তাদেরই উত্তরপুরুষরা বাঘুটিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তারা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে শুরু করেন মাটির তৈজসপত্র তৈরি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো থালা, বাসন, হাড়ি, পাতিল, ঢাকনা, ঠিলা, কলসি, ঘটি, বাটি, বদনা, গরু-ছাগলের খাবারের নান্দা, চাড়ি, মালসা, দই-এর ভাড়, পুজোর ঘট এবং প্রদীপ। এখানকার কুমোরদের উৎপাদিত পণ্য ক্রমেই মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

মৃৎশিল্পীরা জানান, ১০/১২ পুরুষ ধরে তারা এই শিল্প উৎপাদন ও বিপণনের সাথে যুক্ত রয়েছেন। এটি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও দূরদূরান্তে রপ্তানি করা হতো। মানুষের কাছে বাঘুটিয়ার কুমোরদের উৎপাদিত মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা ছিলো ব্যাপক। ব্যবসা ভালো হওয়ার কারণে তারা যেমন পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বচ্ছল জীবন অতিবাহিত করতে পেরেছেন তেমনি এই শিল্পের ক্রমশ উৎকর্ষ সাধনে আত্মনিয়োগ করেছেন। তবে, বর্তমানে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার যাঁতাকলে পড়ে মানুষ প্লাস্টিকসহ ধাতব পণ্যের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েছে। সে কারণে তাদের উৎপাদিত মৃৎশিল্পটি আস্তে আস্তে আগের সেই ধারা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

স্থানীয় কুমোর হরিপদর ভাষায়, ‘এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক শ্রম, মেধা আর ভালোবাসা। এক একজন শিল্পী যখন এক একটি পণ্য উৎপাদন করেন তখন তার ভেতরের সকল শৈল্পিক মেধাকে তিনি নিংড়ে দেন। এর মধ্যে যে হৃদয়ের স্পন্দন পাওয়া যায় তা অন্য কোন পণ্যে নেই। অথচ, আজ আমাদেরকেই জীবিকার তাগিদে চৌদ্দগুষ্ঠির এই পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় ঝুঁকতে হচ্ছে!’ যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আশিকুর রহমানের মতে, ‘ধাতব পণ্য উৎপাদন নানা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়ে থাকে। সে কারণে এসব পণ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া অব্যাহত থাকা খুবই স্বাভাবিক-যার তারতম্য ঘটলে বা উৎপাদনের সময় সঠিক নিয়মপদ্ধতি মানা না হলে মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্যের যে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে। তাছাড়া, সাধারণ মানুষও এসব পণ্যের ব্যবহারবিধি সম্পর্কে যথেষ্ঠ সচেতন নন। সে কারণে ঝুঁকিটা সবসময়ই থেকে যায়। যা মাটির পণ্যে থাকে না। মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার করলে রোগ ও জীবাণুমুক্ত থাকা যায়, স্বাস্থ্যও থাকে ভালো।

কুমোরপাড়ার শিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয়রা আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০টি রসের ঠিলে তৈরি করতেন। এগুলো সব বাজারে বিক্রিও হয়ে যেতো। অনেকে বাড়িতে এসে এগুলো কিনে নিতেন। এখন সেটা আর হয় না। অন্যান্য পণ্যেরও একই অবস্থা। আগে একজন কুমোর দিনে প্রায় ৫শ’ টাকা রোজগার করলেও এখন তা দুইশ’র নিচে নেমে এসেছে। অনেকের তাও হয় না। বাধ্য হয়ে অনেকে স্মৃতিবিজড়িত এই পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন। সেখানেও প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অসহায় জীবনযাপন করছেন তারা।
মৃৎশিল্পী সনাতন পাল বলেন, ‘মাটির থালার স্থান দখল করেছে সিরামিক, এলুমিনিয়াম, কাঁচ বা অন্যান্য জিনিসের তৈরি থালা। মেয়ে-বউরা এখন রান্না করে বৈদ্যুতিক রাইজ (রাইচ কুকার) কুকারে। ইটভাটাগুলোতে খেঁজুরের গাছ পোড়ানোর কারণে রসের উৎপাদনও গেছে কমে। সে কারণে এখন আর গাছিদের ঠিলের দরকার পড়ে না। বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত প্রায় প্রতিটি জিনিসই এখন হয় কাঁচের, না হয় ম্যালামাইন বা অন্যান্য ধাতব দিয়ে তৈরি-কুমোরদের মাটির জিনিসের প্রতি আর মানুষের আগ্রহ নেই।’ ‘এসব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও মানুষ তা কেন বুঝে না বুঝার ভান করে থাকে’-তা বোধগম্য নয় ।

স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা বলছেন, ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এর সাথে যুক্ত মানুষগুলোকে রক্ষা করতে প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতা। সাধারণ মানুষকে মৃৎশিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যকে আশপাশের এলাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে নিতে হবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

যশোরের হস্তশিল্প প্রস্ততকারী ও বিপণন প্রতিষ্ঠান ফোঁড় হ্যান্ডিক্রাফটস-এর স্বত্ত¡াধিকারী ও চারুপীঠ যশোর-এর সাধারণ সম্পাদক মামুন উর রশীদ বলেছেন, ‘বিভিন্ন ব্যাংক সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দিয়ে থাকে। যারা ঋণ গ্রহণ করেন তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিপণনও অনেক সময় ব্যাংকগুলো নিজেরা নিয়ে নেন। মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলেও ব্যাংকগুলোকে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে।’

 

Facebook Comments