হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান সঞ্জীব চৌধুরী : বাংলাদেশের দৈনিক সংবাদপত্রসমূহে ফিচার বিভাগ চালুতে যার অবদান অনস্বীকার্য

 Posted on


মঈন উদ্দিন আহমেদ, হবিগঞ্জ :: হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান সঞ্জীব চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন গুণী সংগীতশিল্পী ও প্রথিতযশা সাংবাদিক। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর বাইলেটারেল সেরিব্রাল স্কিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার মাকালকান্দি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহন করেন। ৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৭ম। পিতা গোপাল চৌধুরী এবং মাতা প্রভাষিণী চৌধুরী। তাদের মূল বাড়ি সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার দশঘর গ্রামে। সেখানকার জমিদার শরৎ রায় চৌধুরী ছিলেন তার পিতামহ। ছাত্রজীবনে বেশ মেধাবী ছিলেন তিনি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধার পরিচয় দিয়ে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে তিনি সেই বিভাগ ত্যাগ করে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। সাংবাদিকতায় পড়ার কারণে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে গ্রহণ করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে আশির দশকের শুরুর দিকে তিনি পেশাগতভাবে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হন। প্রথমেই দৈনিক উত্তরণে কাজ করা শুরু করেন। এরপর ‘ভোরের কাগজ’, ‘আজকের কাগজ’, ‘যায় যায় দিন’ প্রভৃতি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে ফিচার বিভাগ চালু করার ক্ষেত্রে সঞ্জীব চৌধুরী বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নব্বই দশকের আগে সকল সংবাদপত্রে ছিলো শুধু সংবাদ আর সংবাদ। ভোরের কাগজে কাজ করার সময় সঞ্জীব চৌধুরী প্রথমবার ফিচার লেখা শুরু করেন। তার এই পদক্ষেপে সংবাদপত্রের কাটতি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। ১৯৮৩ সালে একুশে বইমেলায় তিনি ‘মৈনাক’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন।
‘আগুনের কথা বন্ধুকে বলি, দু’হাতে আগুন তারও
কার মালা থেকে খসে পড়া ফুল, রক্তের চেয়ে গাঢ়?’
প্রেমের সাথে বিপ্লবের মেলবন্ধন সমরেশের কালবেলায় ঘটে, ঘটে সঞ্জীবের গানেও। ডানাভাঙা একটি শালিক তাই হৃদয়ের দাবি রেখেই যায়, গেয়েই যায় গানে গানে তার হাহাকার।
ফরহাদ মজহারের কবিতা থেকে করা গানে সঞ্জীব চৌধুরীর কন্ঠের মোহময়তা আমাদের উপহার দিয়েছে এক ব্যর্থ গভীর প্রেমের গান, ‘এই নষ্ট শহরে নাম না জানা যেকোনো মাস্তান!’ এছাড়াও টোকন ঠাকুর, সাজ্জাদ শরিফ, জাফর আহমেদ রাশেদ ও কামরুজ্জামান কামুর কবিতাতেও সুরারোপ করে গান গেয়েছেন সঞ্জীব চৌধুরী। কবিতাপ্রেমী এই গায়ক জানতেন কি করে প্রিয় কবিতাগুলোকে রূপ দেয়া যায় প্রিয় গানে। তার গানের বেশিরভাগই ছিলো নিজের কবিতা থেকে করা। ২০১০ সালের একুশে বইমেলায় মোট ৪৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘সঞ্জীব চৌধুরীর গানের কবিতা’।

সুগভীর পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি তৈরী করতেন একেকটি গান। ২০০৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে ইয়াসমিন নামে এক মেয়েকে একদল পুলিশ দ্বারা ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। তার স্মৃতিতে সঞ্জীব গেয়েছিলেন ‘আহ্ ইয়াসমিন’ গানটি। এই গানের মাধ্যমে সঠিক বিচারের পক্ষে জনমনে জেগে ওঠে সচেতনতা। ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষা সংগীত’ এবং ‘চল বুবাইজান’- এগুলো তার করা প্যারোডি। এর মধ্য দিয়েও তিনি সমাজে মানুষের জন্য প্রেরণ করেছেন কিছু শক্তিশালী বার্তা।
ছাত্রাবস্থায় এবং পরবর্তীকালেও সঞ্জীব চৌধুরীর রাজনৈতিক বোধ অনেক গভীর ছিলো। স্কুলে থাকাকালীনই তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং এই সংযুক্তি আরো প্রবল হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে তিনি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংগঠনও গড়ে তোলেন। হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটির চিন্তাভাবনার গভীরতা ছিল, ছিল সবার সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা। খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন মানুষের সঙ্গে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার কলম ছুটে চলে ক্ষুরধার লেখনীতে, রাজপথ বহুবার আলোড়িত হয়েছে তার কন্ঠের কবিতা ও বক্তৃতায়।
অনন্য প্রতিভা ছিলো তার গান লেখা এবং গাওয়ার। নব্বইয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। তাৎক্ষণিক গান লেখার পর তাতে তখনই সুর বসিয়ে তিনি রাজপথ কাঁপাতেন স্বৈরাচার পতনের গানে। তার রাজনৈতিক সচেতনতা ও কন্ঠের মহিমা এ দুয়ে মিলে যেন আন্দোলনের ভাষায় কথা বলতো সমন্বিত সুরে। ক্লান্তি তাকে থামায়নি সেদিন। সুরের ঝঙ্কারে মেতে উঠেছেন ছাত্রবিপ্লবী এক গায়ক তরুণ সঞ্জীব চৌধুরী।
পেশার তাগিদে এবং নেশার প্রেষণায় তিনি বহু কাজই করেছেন। কিন্তু কখনোই সমঝোতা করেননি নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে। তিনি বিশ্বাস করতেন সাম্যবাদে। একদিন সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে এই সমাজে এ আশাবাদ ছিল তার। মানবতার ভোগান্তির কারণ হিসেবে বিদ্যমান সকল সা¤্রাজ্যবাদ, সা¤প্রদায়িকতা ও ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে কুন্ঠাবোধ করেননি তিনি।
শ্রেণিসচেতন এই সমাজে সঞ্জীব চৌধুরী এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি এক নিমেষেই নিজেকে শ্রেণিচ্যুত করে ফেলতে পারতেন। তিনি সব শ্রেণির মানুষের সাথে কথা বলতে পারতেন, মিশতে পারতেন তাদের মতো করে। জমিদার বংশের ছেলে হয়েও তার মধ্যে কোনোদিন ফুটে উঠেনি উচুশ্রেণি সম্পর্কে অনুকম্পা।
প্রচন্ড সংবেদনশীল সঞ্জীব স্বভাবে ছিলেন বোহেমিয়ান। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন ভীষণ প্রাণোচ্ছ¡ল ও আড্ডা প্রিয়। তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি আলাদা। প্রথাবিরোধী এবং স্বপ্রতিভায় তিনি উজ্জ্বলতম। সঞ্জীব তার গানের কথাগুলোর জন্য বহুদিন ভক্ত-অনুরাগীদের হৃদয়ে অবস্থান করবেন, আরো অনেক অনেকদিন মানুষ সঞ্জীব চৌধুরীর ভিন্ন ধারার গানের কথায় প্রভাবিত হতে থাকবেন। তার প্রতিটি গানের সুরে দ্রোহ, প্রেম, প্রতিবাদ, যন্ত্রণা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ পরিলক্ষিত। তার গানের সেই সুর, সে কথা এসে আঘাত করে আমাদের একাকী জীবনের নিঃসঙ্গবোধে।
তিনি যখন সুর তুলেছেন- ‘ঘরে ফিরবোনা, ঘরে ফেরার কিছু নেই, রাখবো না ধরে যে আর, ধরে রাখার কিছু নেই’ কিংবা ‘গল্প ভাঙে তবু গল্প জমে, এই চোখে রাত্রি নিঝুম, একলা এ ঘর একলা প্রহর থমকে দাঁড়ায়’, মনে হয়েছে একজন বিষন্ন, নিঃসঙ্গ মানুষের চিত্রই তিনি অবাকভাবে গানে নয় তুলিতে এঁকে দেখিয়েছেন। ভীষণ বোহেমিয়ান জীবন-যাপনে অভ্যস্ত সঞ্জীব যখন গেয়ে উঠেছেন- ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন, ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও, সমুদ্র কি তোমার ছেলে, আদর দিয়ে চোখে মাখাও’- এ যেন জন্ম হতে এক দহনে পুড়তে থাকা মানুষের আত্মকথন!
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালিন সময়ই ‘শঙ্খচিল’ নামের একটি গানের দলে সংগীত চর্চা শুরু করেন সঞ্জীব চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে তিনি এবং বাপ্পা মজুমদার মিলে প্রতিষ্ঠা করেন জনপ্রিয় গানের ব্যান্ড ‘দলছুট’। ‘দলছুট’ এ তার ও বাপ্পার যৌথ প্রয়াসে যে সকল গানের জন্ম, এ প্রজন্মের নবীনদের জন্য তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস। শিল্পী হিসাবে সঞ্জীব চৌধুরী যতটুকু জনপ্রিয় ছিলেন, তারচেয়ে অধিক জনপ্রিয় ছিলেন গীতিকার ও সুরকার হিসাবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তার পরবর্তী অনেক গীতিকারই সঞ্জীব চৌধুরীর গানের কথা দ্বারা প্রভাবিত।
সংগীতশিল্পী ছাড়া ও তিনি একাধারে ছিলেন কবি, গীতিকার, সুরকার এবং একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক। দেশের প্রায় সব জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হতো সঞ্জীব চৌধুরীর কবিতা। কবিতার পাশাপাশি তিনি লিখতেন ছোট গল্প এবং নাটকের স্ক্রিপ্ট। তার একমাত্র কাব্যগ্রন্থের নাম ‘রাশপ্রিন্ট’। ‘সুখের লাগিয়া’ নামক একটি নাটকেও তিনি অভিনয় করেছিলেন।
বাংলাদেশের লোকসংগীত, সুফীবাদ ও সুফী গানের প্রতি তার ছিলো এক অন্যরকম টান। তাদের যে সুরসাধনার জায়গা, সেটিকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। সাধনার সে স্তরে পৌঁছুতে হলে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে বলে তিনি মনে করতেন। সিলেটের মরমী গায়ক হাসন রাজার গান ছিলো সঞ্জীবের খুব প্রিয়। বাউল শাহ আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না’ গানটি তার অনুমতি নিয়ে সঞ্জীব গেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সংগীত অনুরাগী ছিলেন তিনি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উভয় সংগীতের সাথেই ছিলো তার পরিচিতি। তার প্রিয় গায়কের তালিকায় ছিলেন বব ডিলান, পিংক ফ্লয়েড, অ্যাল স্টুয়ার্ট প্রমূখ। মরক্কো ও স্পেনের সংগীতও বাদ যায়নি তার তালিকা থেকে।
‘আমি তোমাকেই বলে দেবো’, ‘সাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে’, ‘হাতের উপর হাতের পরশ’, ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘নৌকা ভ্রমণ’, ‘হৃদয়ের দাবি’, ‘কোন মেস্তরি বানাইয়াছে নাও’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’ সহ বহু গান আজ জনপ্রিয় সঞ্জীব চৌধুরীর যাদুকরী কন্ঠের জন্য।
সঞ্জীবের গানে গানে ভেসে উঠতো এক স্বপ্নসন্ধানের অনুভূতি। তিনি স্বপ্নের পাখি ধরবার এক অভিলাষ ব্যক্ত করতেন এভাবেই
‘আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া সন্ধান করিয়া,
স্বপ্নের অই পাখি ধরতে চাই,
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই’
সোডিয়াম বাতির নিচে মাঝরাতে গীটার হাতে কোনো তরুণ হয়তো হঠাৎ গেয়ে ওঠে, ‘আমি তোমাকেই বলে দেবো আমি তোমাকেই বলে দেবো সেই ভুলে ভরা গল্প, কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়/ ছুঁয়ে কান্নার রং, ছুঁয়ে জ্যোছনার ছায়া।’ প্রথম প্রেমের স্মৃতি ভুলতে চেয়েও মনে পড়ে যায় বায়োস্কোপের নেশা, সুরে সুরে মদিরতা বাড়ে, ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ, সেই ভাবনায় বয়স আমার বাড়ে না!ৎ
অসম্ভব গুণী সঞ্জীব চৌধুরী ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাইলেটারেল সেরিব্রাল স্কিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওই দিন আকস্মিক অসুস্থ বোধ করার কারণে তাকে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়। আইসিইউতে থাকাকালীন সেখানেই ১৯ নভেম্বর ২০০৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন খন্দকার আলেমা নাসরিন শিল্পীর সাথে। ২০০৪ সালে তাদের কোল আলো করে আসে এক কন্যা সন্তান। সঞ্জীব চৌধুরী তার মেয়ের নাম দিয়েছিলেন কিংবদন্তী। একজন কিংবদন্তীর পিতা হয়ে আজও রয়ে গেছেন তিনি।
একজন মানুষ তার নিজস্ব গন্ডি নিজে তৈরি করে। সঞ্জীব চৌধুরী তার সে গন্ডিকে বারবার ছাড়িয়ে গিয়েছেন। সাংবাদিক থেকে সহ-সম্পাদক, গীতিকার থেকে গায়ক, কাব্য থেকে গল্প, গল্প থেকে নাটক। অতঃপর রাজপথে বিপ্লব। যত দিক দিয়ে পেরেছেন তিনি শুধু কাজ করে গেছেন। সত্যিকার কর্মীব্যক্তি ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। ‘মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নয়।’ সঞ্জীব চৌধুরীর ৪৩ বছরের জীবনের ক্ষেত্রে উক্তিটি অনেক বেশি মানানসই। বাংলাদেশের বিপ্লবী তরুণ সমাজের কণ্ঠে দলছুটের দলনেতা হয়ে আজও বেঁচে আছেন তিনি।

Facebook Comments