হত্যাকান্ড আর সম্ভ্রমহানির ক্ষমা নেই

 Posted on

মো. জালাল উদ্দিন মোল্লা

বিধান সরকার, অতিথি প্রতিদেক, বরিশাল ॥ প্রথমবার ধরা পড়ার পর শর্তে সায় দিয়ে মুক্তি পেয়েছিলাম। আনন্দে বিধবা মা আমার মানতের গরু লুটিয়েছিলেন সন্তান ফিরে পাওয়ায়। তবে দ্বিতীয়বার নির্যাতন শেষে পাকিস্তানী সেনারা বন্দি করে নিয়ে গেলে শোকে মা শয্যাশায়ী হয়েছিলেন। চার দিন পর বাড়ি ফিরলে আমাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের সে কি কান্না। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অবশেষে কাউখালী উপজেলার আস্পার্দী গ্রামে আমার শ্বশুড় বাড়িতে পাঠান। তিন সন্তান নিয়ে আমার মা কদবানু বিবি স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে যখন বিধবা হন তখন তার বয়স ৪০ হবে। আমাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানসিংহপুর গ্রামের পাটক্ষেতে পালানো নারীদের সম্ভ্রমহানির নারকীয় দৃশ্য আজো ব্যথিত করে। কুকুরের ন্যায় প্রকাশ্য দিবালোকে অমানবিক ঘটনা, মা-বোনদের আহাজারি দেখতে না পেয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। তাই ভাবি পাকিস্তানীদের এমন বরর্বর ঘটনায় যারা সহায়তা করলো সেই স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের ক্ষমা করার কোন সুযোগ আছে কি? নারীর সম্ভ্রমহানি আর হত্যা এর বিচার হতেই হবে। এমন কামনার পাশাপাশি আরো কত দুঃখ বেদনা, দুর্বিসহ ঘটনার বর্ণনা করলেন বেসাইখান গ্রামের মো. জালাল উদ্দিন মোল্লা (৭৪)।

ঝালকাঠি কলেজে ১৯৭১ সালে একাদশ শ্রেণীতে অধ্যায়ন করতেন জালাল উদ্দিন মোল্লা। এলাকায় সংগ্রাম পরিষদ গঠন হলে তিনি ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান। দুই আনসার কমান্ডার আ. হামিদ মোল্লা ও আইয়ূব আলী মোল্লার কাছে গ্রামের ৬০ যুবক প্রশিক্ষন নেন। এই খবর চলে যায় শান্তি কমিটির সভাপতি গোবিন্দধবল গ্রামের আজাহার মিয়া, সেক্রেটারী কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের জব্বার বেপারী, বারেক চেয়ারম্যানদের কাছে। ১১ জুন সকাল দশটার দিকে রাজাকারদের সহায়তায় ঝালকাঠি ও কুড়িয়ানা থেকে দুই থেকে আড়াই’শ পাকিস্তানী সেনা বেসাইনখান গ্রামে প্রবেশ করে। বাড়ি ঘরে তল্লাশী করে জালাল উদ্দিন সমেত ৬৫ জনকে সেদিন কুড়িয়ানা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে কুফ্ফর খতম, পেয়ারা বাগান কাটা আর রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়ার শর্তে পরদিন সকাল ১০টায় মুক্তি মেলে সবার। এদিকে প্রত্যেকের পরিবার ধরে নিয়েছিল তাদের হত্যা করা হবে। তবে তিন শর্তের একটিও মানা হয়নি বলে এর ঠিক দশ দিন পর ২১ জুন শেষ রাতে আক্রমন হয় বেসাইনখানে। ঝালকাঠি, কুড়িয়ানা আর বাউকাঠি ক্যাম্প থেকে আসা হাজারাধিক পাকিস্তানী সেনা শশীদের হাট ও বাউকাঠিতে গানবোট রেখে পায়ে হেঁটে বেসাইনখান গ্রামের চারিধারে এ্যাম্বুশ করে। এমন অবস্থা টের পেয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে পেয়ারা বাগান কাটতে যাচ্ছেন এমন বেশ ধরে দেড় শতাধিক ব্যক্তি পালিয়ে যাওয়ার ফন্দি আটলে ধরা পড়ে যান। সকাল সোয়া দশটার দিকে মেজর আজমল ও ক্যাপ্টেন তারেক এসে সবাইকে বেঁধে ফেলার নির্দেশ দেয়। দড়ি, কাচি কারোবা পরিধেয় জামা কাপড় দিয়ে পিছন করে দু’হাত বেঁধেই শুরু করে পেটানো। কিশোর আর বয়স্য নয়; সবাইকে নির্দয়ভাবে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে কাউকেবা অর্ধমৃত করে রাখে। কেউবা নেতিয়ে পড়েন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। তিন ঘন্টা ধরে চলে পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকারদের এমন নির্যাতন। জালাল উদ্দিন বলেন, লাথি খেয়ে রাস্তার পাশে পড়ে গেলে সেখানে জ্ঞান হারানোর ভান ধরে থাকেন নির্যাতন এড়াতে। ওসময় তারা বন্ধু ফজলুর রহমানকে গুলি দিয়ে হত্যা করলে সত্যিই চোখে ঝাপসা দেখতে পান। জীবনের মায়া ছেড়ে দেন। ডাকতে থাকেন খোদাকে। এরপর সেখানে ১৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে ফেলে দেয় গোপিনাথকাঠির খালে। রাশেদ মোল্লার হাতে পেয়ারা বাগান কাটার প্রক্সি দেয়ার দা থাকায় ওই দিয়ে এক কোপে দু চোয়াল আলাদা করে দিলে তিনি অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে তবেই মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু কালের কাতরা আর শরীর থেকে প্রাণ বের হয়ে যাওয়ায় ছটফটানি, ভয়ানক এই দৃশ্য আমাকে অনেক দিন তাড়িত করেছে।

তখন দুটা পেরিয়েছে, আহত ৬০ থেকে ৬৫ জনকে নিয়ে রওয়ানা হয় কুড়িয়ানা ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। নেয়ার পথেই ঘটে হৃদয়ে আমৃত্যু ক্ষত সৃষ্টি করে যাওয়া দুর্ঘটনাটি। কয়েক’শ নারী আশ্রয় নিয়েছিলেন স্থানসিংহপুর গ্রামের পাটখেতে। হায় আমাদের চোখের সামনেই অর্ধশত নারীর সম্ভ্রহানি ঘটায়। মা, মেয়ে কেউ রেহাই পায়নি। ছোটাছুটি, কান্নাকাটি। যে মা পেড়েছেন তো দৌড়ে পালিয়েছেন। কেউবা অস্ত্রের ভয়ে জীবন বাঁচাতে গিয়ে সব হারিয়েছেন। এদৃশ্য কল্পনায় এলে সাথে ঘৃণা জাগে মানুষ কিভাবে এমন পশু হতে পারে। মায়ের গর্ভে জন্মে ও তাঁর বুকের দুধ পান করে আর আদর, স্নেহ পেয়ে বেড়ে ওঠা কেউ নারীর প্রতি অমন বিভৎস উল্লাস তা আবার প্রকাশ্যে করতে পারে তা বোধগম্যের বাইরে। আমরা বন্দি অবস্থায় ছিলাম বলে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। তবে সেদিনের ঘটনায় নির্যাতিত কোন নারীর নাম পরিচয় আমরা আজ পর্যন্ত কারো কাছে প্রকাশ করিনি। দেশ স্বাধীনের পর বীরাঙ্গনা বলতে এক ধীবর কন্যার নাম প্রকাশ পেয়েছিল। অনিন্দ্য সুন্দরী ছিলেন ওই ষোড়শী। স্থানসিংহপুরের আগের এই দুর্ঘটনাটি। বীরাঙ্গনা বলায় ওই লজ্জাতে ১৯৭২ সালে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন ধীবর কন্যাটি। বাবা, মা, ভাই, বোন সবাই রইলেন পুরানো ভিটায় কেবল ওই কনেটি নেই। আর কোনদিন দেশে ফিরেননি তিনি। চিনতাম কনেটিকে। ভাবছি যুদ্ধ তার জীবনে কি অভিশাপ বয়ে এনেছিল। তার ভাইয়েরা আছেন, তবে কখনো জিজ্ঞাসা করিনি কোথায় আছেন বা কেমন আছেন স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো ওই বীরাঙ্গনা বোনটি। তারতো কোন দোষ ছিলনা, তাহলে কোন অপরাধে এমন জীবন, এজন্য নিজেকেও কখনো অপরাধী মনে হয়। পারিনি আমি বা আমরা ৬০ থেকে ৬৫ জন বন্দির কেউ নির্যাতিত নারীদের রক্ষা করতে। অবশ্য আমাদের সবার হাত বাঁধা ছিল, আর নিরস্ত্র বলে পাছে অসভ্য পাকিস্তানী সেনাদের হাতে জীবন তখনই খোয়ানোর ভয়ও ছিল বটে। যাকে বলে বাঁচার আশা। বেঁচে ফিরেছিলাম মায়ের কোলে তবে আমাদের প্রিয় কমান্ডার মো. রেজাউল করিম মানিক ও আরো অনেক সহযোদ্ধাদের পাকিস্তানী সেনাদের হাতে নিহত হবার পরে।

এই অধ্যায় নিয়ে বলতে গিয়ে জালাল উদ্দিন বলেন, কুড়িয়ানা ক্যাম্পে ২২ জুন রাতে বোরকা পরিহিত খাটোগোছের এক লোক আঙ্গুলের ইশারায় ৯ জনকে মুক্তিযোদ্ধা বলে চিহ্নিত করে। তাদের আলাদা করে রাখে এবং কথা বলতে নিষেধ করে। নিশ্চিত মৃত্যু ভেবে নিয়েই টগবগে তরুণ ঢাকা নগর ছাত্রইউনিয়ন নেতা, ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি মো. রেজাউল করিম মানিক বলেছিলেন-আমার রক্তে দেশ স্বাধীন হবে। বেঁচে থাকলে যুদ্ধ থেকে কেউ সরে যেওনা। ২৩ জুন ঝালকাঠি ক্যম্পে নিয়ে গেলে রাত সাড়ে ৪টার দিকে বাছাই করা মানিক ও তার ছেট ভাই রতনসহ ৮ জনকে নদীর পাড়ে নিয়ে গুলি করে পাকিস্তানী সেনারা। ওসময় বেলায়েত হোসেন মোল্লা বলতে একজন নদীতে আগেই ঝাঁপিয়ে পড়লে বেঁচে যান। বেলায়েত এখন মংলায় ব্যাবসা করেন। তবে জালাল উদ্দিনকে বন্দি অবস্থায় দেখে তার সহপাঠি শান্তি কমিটির নেতাদের দ্বারা তদবির করায়ে মুক্তি দেন। ২৩ জুন দুপুর আড়াইটা হবে তিনি মুক্ত হয়েও ঘোড়ের মধ্যে ছিলেন পিছন থেকে গুলি করা হতে পারে। এজন্য ঝালকাঠি থানা থেকে বের হয়ে জিন্দেগি হোটেল পর্যন্ত আসার পর আর হুস ছিলনা। দেহাতি আজম মোল্লা কাঠপট্টির বাসায় নিয়ে গোসল করায়ে খাওয়ানোর পর নৌকাযোগে বেসাইনখানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। রাতে বড়িতে পৌঁছে দেখেন তার চিন্তায় মা শয্যাশায়ী। হৃদয়ের টুকরা ছেলেকে ফিরে পেয়ে জালাল উদ্দিনকে বুক জড়িয়ে মা কদবানু বিবি কাঁদনে অনেকটা সময়। এরপর স্বাধীনত যুদ্ধ শুরুর ১৫ দিন আগে বিয়ে করা কাউখালির আস্পর্দী গ্রামের শ্বশুর বাড়িতে পাঠান। সেখান থেকে কেউন্দা গ্রামের হাবিব কমান্ডার, পনা বাহিনীর সাথে যুক্ত হন তিনি।

খাজুরা হালদার বাড়ির কাঙ্গাল হালদারকে (৪২) ধানক্ষেতে গুলি করলে মারলো পাকিস্তানী সেনারা। তার অসুস্থ স্ত্রী হামাগুড়ি দিয়ে তাদের বাড়ির খড়েরর গাঁদার পাশে সন্তান প্রসব করেছেন। তারা ওই সন্তানের নাম বিপ্লব রেখেছিলেন। বিপ্লব বেঁচে আছে, তবে বেড়ে উঠতে হয়েছে কেবল মাতৃস্নেহ নিয়ে। জন্মের কিছু সময় আগে বাবাকে হত্যা করায় জন্মদাতা পিতার স্নেহ বঞ্চিত হয়ে আজো আপ্লুত হতে দেখা যায় বিপ্লবকে। বেদনার এমন অনেক স্মৃতির মধ্যেও নারীর সম্ভ্রমহনি আর হত্যাকান্ডে সাথে জড়িতদের ক্ষমার কোন এখতিয়ার কারোর নেই বলে মনে করেন জালাল উদ্দিন মোল্লা।

লেখক: বিধান সরকার,গল্পকার।

Facebook Comments