স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনা সংক্রমণ থামছে না

 Posted on

\ দলিত কন্ঠ ডেস্ক \

করোনা রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রতিদিন কোন না কোন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীর করোনা সংক্রমিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যকর্মীরা শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় পড়ছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনা সংক্রমিত হওয়া নিয়ে কোন গবেষণা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে দুই হাজার ৫৯১ চিকিৎসক, এক হাজার ৯২০ নার্স এবং তিন হাজার ১৪৯ জন অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট সাত হাজার ৬৬০ স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। সারাদেশে করোনা সংক্রমিত হয়ে মোট ৭৮ জন চিকিৎসক, ৮ জন নার্স ও অন্যান্য ৭ স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকায় ৮৬০ চিকিৎসক, ৭৭৫ নার্স এবং ৪৪০ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, যা সারাদেশের মোট স্বাস্থ্যকর্মীর ২৬ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, মানহীন পিপিই, হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক, প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা একাধিকবার বলেছে, করোনা মহামারী প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সামনের সারির যোদ্ধা স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে অন্য সবার সুরক্ষা ঝুঁকিতে থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনে করোনাভাইরাস প্রথম শুরু হলেও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু আমাদের দেশে আজও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এর মূল কারণ- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের যথাযথ পদক্ষেপের অভাব। যেসব দেশ করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, তারা যে কাজগুলো সঠিকভাবে করেছে আমরা সেই কাজগুলো সঠিকভাবে করতে না পারার কারণেই আমাদের দেশে করোনাভাইরাস দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও নিম্নগামী হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সংবাদকে বলেন, করোনা রোগীদের একটি বদ্ধ ঘরে চিকিৎসা দেয়া হয়, সেখানে করোনাভাইরাসের লোড বেশি থাকায় চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। কারণ তারা প্রতিদিন আট থেকে দশ ঘণ্টা ভাইরাসের কাছে থাকেন। এটাই তো চিকিৎসকদের করোনা সংক্রমিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের সুরক্ষাসামগ্রী একবার পরে টয়লেটে গেলে পরে সেই সুরক্ষাসামগ্রী আর পরিধান করা যাবে না। কিন্তু আমাদের সেই আর্থিক সক্ষমতা নেই। কারণ একটা পিপিই’র দাম কমবেশি এক হাজার টাকা, সেখানে একজন চিকিৎসক দিনে তিনবার টয়লেটে গেলে তিনবারই পিপিই পরিবর্তন করতে হবে। এতে দিনে একজন চিকিৎসকের পেছনে তিন হাজার টাকার মতো ব্যয় হবে। এটি স্বাস্থ্যখাতে কখন সম্ভব নয়। আর চিকিৎসা দিতে গিয়ে যেসব স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন তাদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ সংবাদকে বলেন, করোনা প্রতিরোধের জন্য করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ চর্চা না থাকার কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন করোনা সংক্রমণ হচ্ছেন। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ চর্চা একটি প্যাকেজ। এই প্যাকেজের মধ্যে প্রথমত, হাসপাতালে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গাইডলাইন থাকতে হবে। প্রতিটি হাসপাতাল সেই গাইডলাইন অনুযায়ী চলবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে মানসম্মত করোনা সুরক্ষাসামগ্রী প্রদান এবং স্বাস্থ্যকর্মী কিভাবে সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করবেন তার প্রশিক্ষণ দরকার। তৃতীয়, প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধে একটি বিশেষজ্ঞ দল দরকার। বিশেষজ্ঞের দল হাসপাতালের সব চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেবে। চতুর্থ, করোনা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর তা সঠিক প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করা। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ চর্চা চালুর পর স্বাস্থ্যকর্মী ঠিকমত এসব গাইডলাইন নেমে চলছেন কিনা তার মনিটরিংয়ের দরকার।

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের অযোগ্যতার কারণে গত ৫ মাসেও করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্যতা রাখে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অযোগ্য রয়ে গেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ্বের অন্যসব দেশ যা করেছে আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। করোনা সংক্রমণ কেন কমছে না সেটি অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ, সেটি করা হচ্ছে না। আইসোলেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে না। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নানা কিছুর ঘাটতি আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগ অযোগ্য। সারাদেশে করোনা সংক্রমিত ও উপসর্গ নিয়ে ৭৮ জন চিকিৎসক মারা গেছেন অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোনদিন দুঃখ প্রকাশ করেননি, ক্ষতিপূরণ দেননি এবং সমবেদনা জানাতে চিকিৎসকদের পরিবারের কাছে যানি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সারোয়ার আলী সংবাদকে বলেন, বিশ্বের সব দেশেই স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু আমাদের দেশে আক্রান্তের হার বেশি। কারণ প্রথমদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনা সুরক্ষাসামগ্রীর মান যথার্থ ছিল না, সেখানে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, করোনা আক্রান্ত রোগী নন-করোনা বলে চিকিৎসকদের সংস্পর্শে আসেন। তখন করোনা রোগীর জন্য চিকিৎসক যে সুরক্ষা সামগ্রী নেন, সাধারণ রোগীর ক্ষেত্রে সেসব সুরক্ষা নেন না, ফলে চিকিৎসক নিজের অজান্তেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনা সংক্রমণ কমাতে মানসম্মত সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ কাশেম সংবাদকে বলেন, করোনা মহামারীতে চিকিৎসকদের সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে মূল্যায়ন না করে সচিব, পুলিশ ও প্রশাসনের ইউএনও, ডিসি এবং এসপিদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। চিকিৎসক রোগীর সেবা দিতে গিয়ে মারা গেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রণোদনা পাচ্ছেনা। যদিও চিকিৎসক প্রণোদনার উদ্দেশ্যে রোগীর চিকিৎসা দেয় না।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সংবাদকে বলেন, বিশ্বের সবদেশে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছে। তবে আমাদের দেশে তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মী বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত হচ্ছে কেন- এর একটা গবেষণা দরকার। গবেষণা করলে বের হয়ে আসবে যে, করোনার জন্য সরবরাহকৃত সুরক্ষাসামগ্রীর দোষ নাকি সুরক্ষাসামগ্রী ঠিকই আছে, পরিধান করা বা খোলার দোষ নাকি অন্য কোন কারণ রয়েছে। গবেষণা করে এটি যতদিন পর্যন্ত প্রমাণ করা না যায় ততদিন পর্যন্ত আমরা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়বো। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন রকম ধারণা করবেন। কিন্তু কেন যে এই বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে না প্রতিটি বিষয়ে গবেষণা হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারীতে সম্মুখ সারির সব কর্মীর পিপিই, কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, থাকা খাওয়া, যাতায়াতসহ সব বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরও মনোযোগী হতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উল্টো স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য হোটেল সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে। এতে স্বাস্থ্যকর্মীর কাজের ক্ষেত্রে আরও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের তথ্য প্রথম প্রকাশ করে ৮ মার্চ। আর প্রথম মৃত্যুর খবর জানা যায় ১৮ মার্চ। করোনায় প্রথম মৃত্যু হয়েছিল বেসরকারি হাসপাতালে। মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংক্রমণের বিষয় প্রকাশ পেতে থাকে।

বিএমএর মহাসচিব মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সংবাদকে বলেন, করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী আক্রান্ত হতেই পারে। চিকিৎসক যখন রোগীর কাছে যাবে তখন করোনা সংক্রমিত হওয়ার অনেক উপকরণ রয়েছে। আগের তুলনায় এখন চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনা সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা কমছে। এরপরও কিছু স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হচ্ছেন, এটি হতেই থাকবে। চিকিৎসক যখন মাস্ক পড়ছেন তখন বিন্দুমাত্র ত্রুটি হলেই করোনা সংক্রমিত হবেন।

তিনি আরও বলেন, মহামারীর সময় সব রোগীকে করোনা রোগী ধরতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনা সংক্রমণের প্রধান কারণ তিনটি। প্রথমত কে কে সংক্রমণমুক্ত, কে সম্ভাব্য করোনা রোগী এবং কে প্রকৃত রোগী এটা বাছাই করার কোন ব্যবস্থা হাসপাতালে নেই। দ্বিতীয়ত, শুরু থেকেই পিপিইর মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল। আবার সবাই পিপিই পাননি। যখন পেলেন, তখন তাদের ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। তৃতীয়ত, অনেক ব্যক্তি করোনার লক্ষণ গোপন করে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে প্রথম অবস্থায় যে হারে স্বাস্থ্যকর্মী করোনা সংক্রমিত হয়েছেন এখন তা কমে এসেছে।

Facebook Comments