স্বাধীনতা সংগ্রামে সিরাজগঞ্জের গোপিনাথপুরের দলিত সম্প্রদায়ের অবদান

 Posted on

স্বপন মির্জা, সিরাজগঞ্জ :
৭১-এ পাকিস্তানিদের দোসর তাদের এদেশীয় ধর্মান্ধ রাজাকার, আলবদর, আলসাম্শ ব্যতীত সারা বাংলার মানুষ স্বাধীনতা অর্জনে নানা ভাবে ভূমিকা রেখেছে। দলিত সম্প্রদায়ের মানুষগুলো ছিল এক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ ও সোচ্চার। সিরাজগঞ্জের কৃষক পরিবারের সনাতন ধর্মাবলম্বী দলিত সম্প্রদায়ও সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কেউবা আবার জুগিয়েছে সাহস। কেউবা দিয়েছে অর্থ সহায়তা। কেউ আবার মুক্তিযোদ্ধাদের আহারের ব্যবস্থা করেছে। তেমনি এক ব্যতিক্রমী গ্রাম হচ্ছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলাধীন এনায়েতপুর থানার গোপিনাথপুর গ্রাম। নমশূদ্র সম্প্রদায়ের গ্রামটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল গোপন ঘাঁটি। গ্রামের হিন্দুরা হানাদারদের ভয়ে না পালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পেটের ক্ষুধা মেটেতে রেখেছেন অপরিসীম ভূমিকা। সেখানে আশ্রিত সূর্যসন্তানদের জন্য তারা প্রত্যেক বাড়ি থেকে চাল-ডাল তুলে রান্না করে আহার জোগাতেন। এদিকে একাত্তরে সিরাজগঞ্জের লাখো সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের অধিকাংশই শরণার্থী হয়ে সেই অসহায়ত্বের জীবনদশায় পা বাড়ায়নি। তাদের মহা বিপদের সময় পাশে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মুসলমানরা ও সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা। গ্রামের মুসলিম মাতব্বর, জনপ্রতিনিধিসহ যে যার মতো পারে তাদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তবে ভয়ে সে সময় ভারতে পাড়ি দিলেও তার সংখ্যা কম।

স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সময় এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় যা ঐতিহাসিক বিবেচনায় অভূতপূর্ব। ১৯৭০ সালের নির্বাচন শেষ হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। ২৫শে মার্চের রাত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান। বস্তুত নিজ দেশের বেসামরিক জনগণের ওপর এ জাতীয় সামরিক অভিযানের নজির উপমহাদেশের ইতিহাসে নেই। ১৯৭১ সালের ফেব্রæয়ারি মাস পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নির্বাচন পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু মার্চ মাসে এসে পরিস্থিতি দ্রæত এমন ভাবে পরিবর্তিত হয়, যার ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের কাছে এই যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাছে তা ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। এজন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তারা এই আন্দোলন স্তব্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই সামরিক অভিযান ছিল বহুলাংশে অদূরদর্শী এবং পরিকল্পনার দিক দিয়ে এলোমেলো। এই অভিযানের একটি প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববাংলার সকল স্বাধীনতাকামী রাজনীতিবিদদের বন্দী করা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া সব নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। কার্যত এই অভিযান পরিণত হয় বেসামরিক জনগণের ওপর গণহত্যা ও নির্যাতনের অভিযানে। এরপর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে প্রায় নয় মাস এই গণহত্যা ও নির্যাতন চলে। তখন এই অঞ্চলের লক্ষাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ মানুষ জীবন বাঁচাতে ঘর-বাড়ি ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায় শরণার্থী হিসেবে বলে ধারনা করছে সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ। বিশেষ করে রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, বেলকুচি, চৌহালী এবং সিরাজগঞ্জ সদর এলাকার হিন্দুরা অন্যতম। তবে যুদ্ধের পরে তাদের অধিকাংশ আর নিজ দেশে ফিরে আসেন নি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এনায়েতপুর থানার হিন্দু অধ্যুষিত গোপিনাথপুর গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার ছিল শ খানেক। আর আব্দুর রশিদের একমাত্র পরিবার ছিল মুসলমান। বর্তমান গ্রাম প্রধান সুধীর চন্দ্র সরকার তখন বেলকুচি কলেজের প্রথম বর্ষের ইন্টার মেডিয়েটের ছাত্র। তিনি জানান, আমাদের গ্রামের কোন হিন্দু পরিবার হানাদারদের ভয়ে দেশ ত্যাগ করেনি। বরং যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের তারা লালন-পালন করেছে। আহারে ভূমিকা রেখেছে। তার সাথের ধর্মদাস সরকারের বাড়িতে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ৪০/৫০ জনের একটি গোপন ঘাঁটি। তারা এখানে অবস্থান নিয়ে হানাদার ক্যাম্পে হামলা চালাতো। আর তাদের আশ্রয় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতো গ্রামের সনাতন ধর্মালম্বীরা। কৃষিজীবি পরিবারের এই মানুষ গুলো স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সকল ভয়-ডর উপেক্ষা করে আশ্রিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য প্রদানে ছিল ঐক্যবদ্ধ। তাদের ভরণ পোষণে গ্রাম প্রধান ধর্মদাস সরকার, প্রাণবন্ধু সরকার, বাবুরাম সরকার, কলেজ ছাত্র সুধীর সরকার, রামপদ সরকার ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা বাড়ি-বাড়ি থেকে চাল-ডাল তুলে তা দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে অন্তত দু বেলা আহারের ব্যবস্থা করতো। কত দিন মুরগীর ব্যবস্থাও হতো। এ কাজে নিষ্ঠার সাথে রাধুনীর দায়িত্ব ছিল অন্তত ১০/১৫ জন সনাতন নারী। এর মধ্যে বেঁচে আছেন মৃত বেনী মাধব সরকারের স্ত্রী শতবর্ষী খুকী বালা সরকার (১০০), মৃত কমল সরকারের স্ত্রী সবিতা রানী সরকার (৭৫) এবং মৃত সূর্যকান্ত সরকারের স্ত্রী ল²ী রানী সরকার (৬৫)। তারা জানান, আমাদের স্বামী ও গ্রাম প্রধানদের দেশাত্ববোধে আমরাও জাগ্রত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পেরে হতাশা বোধ করতাম। তাই গোপন ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা প্রাণপনে সহযোগীতা করেছি। তারা ওখানে থাকা কালীন গ্রামের পুরুষরা খোঁজ-খবর রাখতো। আর আমরা ছিলাম রান্নার দায়িত্বে। প্রতিদিনই অন্তত ২০ কেজি চাল-ডাল বাড়ি-বাড়ি থেকে গুছিয়ে খিচুড়ি রান্না করে দিতাম ধর্মদাস সরকারের বাড়িতে (বর্তমানে মৃত হাজী ছদের ব্যাপারীর বাড়ি) আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের।

সেদিনের সেই অ¤øান স্মৃতিচারন করে তারা জানান, অনেক সময় তাড়া হুড়ো করে রান্না করা খিচুড়ি নিতে গিয়ে শরীরে পড়ে গরম ছেকা খেতাম। প্রচন্ড ব্যথা থাকতো কয়েক দিন। তার পরও আমরা দমতাম না।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা পালনকারী এই বিধবা নারীরা এক সময় জমি-জমা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটলেও, এখন তাদের নানা অভাব তাড়া করে প্রতিক্ষণ। বৃদ্ধ হাতে তাঁত শ্রমিকের কাজ করে দু বেলা খাবার জোটানোই মুশকিল। কোন রকমে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস। আর গায়ে জড়ানো স্বল্প মূল্যের একখানা সাদা শাড়ী দিয়েই চলে-বছরের পর বছর। কেউ খোঁজ নেয়না এই অসহায় বৃদ্ধাদের।

৭১-এ বোবা সেজে বেঁচে যান গৃহবধূ কালিদাসী মালী ঃ
মুক্তিযুদ্ধের সময় তখন জুলাই মাস। শাহজাদপুর উপজেলাধীন ঘাটাবাড়ি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তখন ভয়ে তটস্থ। মাঝে মাঝেই হানাদাররা বাড়ি-বাড়িতে হানা দিচ্ছে। যার যা পাচ্ছে নিয়ে যাচ্ছে। জ্বালিয়ে দিচ্ছে আশ পাশের গ্রামের ঘর-বাড়ি। পাক হানাদারদের মূলত টার্গেট ছিল সনাতন ধর্মালম্বীদের। এই অবস্থায় এলাকার হিন্দুরা আশ্রয় নিতো আড়কান্দি গ্রামের আবু মিঞার বাড়িতে। একদিন হঠাৎ করে ঘাটাবাড়িতে আসে পাকবাহিনী। দৌড়ে পালিয়েও রক্ষা পায়নি নিমাই মালীর স্ত্রী অবলা নারী কালিদাসী মালী। তখন সাথে থাকা আরেক নারীকে বলা হয় চার কালমা বলতা হায়? সে মুসলমান হওয়ায় বলে ফেলে রক্ষা পান। এবার কালিদাসীকে একই প্রশ্ন করে পাকবাহিনী। তখন বুঝে উঠতে পারেনা কি বলবে। সে সময় তার দিকে তাক করা হয় বন্দুক। সাথে-সাথে তার বুদ্ধি এঁটে হয়ে যান বোবা। বোবার মত আচরন করলে সাথে থাকে ঐ মুসলমান নারী বলেন সে মুসলমান হলেও বোবা হওয়ায় কালেমা বলতে পারবে না। এরপর হানাদাররা চলে যায়। আর জানে রক্ষা পান কালিদাসী মালী। তিনি গত ২০০৬ সালের দিয়ে মারা যান। মৃত্যুর আগে এ প্রতিনিধির কাছে পাক বাহিনীর নানা নির্যাতন অত্যাচারের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তার বেঁচে যাবার এই কাহিনীর কথা জানান।

এদিকে সিরাজগঞ্জ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা হিরোক গুন জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেশির ভাগ হিন্দুরাই নানা ভাবে হত্যা, নির্যাতন ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। লাখো সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে দশ শতাংশ ভয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। তবে নিজ এলাকায় যুদ্ধ অংশগ্রহণসহ অধিকাংশরাই মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ভূমিকা রেখেছিল। যা অনেকাটাই প্রশংসনীয়। এক্ষেত্রে অনেকে আবার শহীদ হয়েছেন। হারিয়েছেন সম্ভ্রম। বাড়ি-ঘর, সোনা-দানা খুইয়েছেন। তার পরও জন্মভূমি ছেড়ে যাননি। যুদ্ধ পরবর্তী তাদের সুদিন ফিরে আসলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর নানা ভাবে অত্যাচারিত হতে হয়। বর্তমানে দেশে আমরা অনেকটা শান্তিতে থাকলেও পুরোপুরী অধিকার পায়নি সর্বক্ষেত্রে।

স্বপন মির্জা, একুশে টেলিভিশনের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments