স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝালকাঠির দলিত সম্প্রদায় : গণহত্যায় হাজারো শহীদের নেই সঠিক পরিসংখ্যান

 Posted on


পলাশ রায়, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝালকাঠির পেয়ারা অঞ্চল একটি বিশেষ নাম। শোক আর গর্বের বিশেষ স্থান। আর এই অঞ্চলের দলিত সম্প্রদায়ের ত্যাগ চির স্মরণীয়। একাত্তরের ন’মাস ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনী নির্মম গণহত্যা চালায়। এরমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজেলার পেয়ারা বাগান এলাকার বিলাঞ্চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এসব বিলাঞ্চলের বিভিন্নস্থানে। স্থানীয় দলিতসহ নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ গণহত্যায় শহীদ হন। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন লগ্নেও এখানের বধ্যভূমিগুলো আজ সংরক্ষিত হয়নি। শহীদের মর্যাদা পাননি অনেকে।

মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়রা জানান, ১৯৭১ সালের ৩ জুন সিরাজ সিকদার ভীমরুলি স্কুলে এক সভা করে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন পার্টি বিলুপ্ত করে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি গঠন করেন। এ সভায় হুমায়ুন কবীর, সেলিম শাহ নেওয়াজ, বিপ্লব, মজিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ অঞ্চলে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা প্রবল প্রতিরোধ ও দুর্গ গড়ে তোলেন। ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলি, শতদশকাঠী, আতা, জগদীশপুরসহ ১৫টি গ্রামে পেয়ারার ঘন অরণ্যে ছিলো তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। সেই সাথে বরিশাল বিভাগের হাজার হাজার মানুষ এ বাগানে আশ্রয় নেয়। গ্রামের ভীমরুলি খালে পাক বাহিনীর সাথে সিরাজ সিকদারের বাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয় পাকবাহিনী। সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ভীমরুলিসহ আশপাশের গ্রামে পাক বাহিনী পরে গণহত্যা চালায়, ধর্ষণ, লুট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। গণহত্যায় শহীদ হন স্থানীয় দলিত ও নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ। কেবল যে এই অঞ্চলের মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন তা নয়। মুক্তিযোদ্ধা এবং বরিশাল বিভাগের হাজারো মানুষকে পেয়ারা বাগানে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিলাঞ্চলের নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ।

স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ভবেন্দ্রনাথ হালদার, শ্যামলকৃষ্ণ মন্ডল, হরিবর হালদারসহ গ্রামবাসী জানান, কীর্তিপাশা ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে ৮/১০টি বধ্যভূমিতে গণহত্যা চলে একাত্তরের দীর্ঘ ন’মাস। গণহত্যার বেশির ভাগ স্থান আজ অনাদর আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। অধিকাংশ স্থানেই শহীদের স্মৃতি রক্ষায় গড়ে ওঠেনি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। স্থানীয় গ্রামবাসী এবং মুক্তিযোদ্ধারা যেসব বধ্যভূমির কথা উল্লেখ করেছেন সেগুলো হলো:

ডুমুরিয়া বধ্যভূমি

ডুমুরিয়া বধ্যভূমি: এ জেলার ৮/১০টি গ্রামে বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে পেয়ারার গহীন বাগান। শত বছর ধরে বাণিজ্যিক ভাবে স্থানীয়রা এখানে পেয়ারা চাষ করে আসছেন। স্থানীয় ভাষায় গ্রামগুলোকে বিলাঞ্চল বা পেয়ারা বিল বলা হয়। সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নটির হিন্দু অধ্যুষিত এমন একটি গ্রাম ডুমুরিয়া। একাত্তরের ১০ জুন এ গ্রামের পেয়ারা বাগান থেকে মোট ১৯ জনকে ধরে এনে ওই গ্রামেরই স্থানীয় একটি ক্লাবের কাছে খাল পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মানিক বাহিনীর সদস্য। ক্লাবটি এখনও আছে। কয়েক বছর আগে ক্লাব কর্তৃপক্ষ এখানে একটি শহীদ স্মৃতি ফলক নির্মাণ করেছেন। স্থানীয় বীরেন রায়, শ্যামল হালদারসহ আরো কয়েকজন গ্রামবাসী জানিয়েছেন, এখানকার পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেয়া আরো অসংখ্য মানুষকে এ জায়গায় বিভিন্ন সময় হত্যা করা হয়।

ভীমরুলি বধ্যভূমি

ভীমরুলি বধ্যভূমি: কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের পেয়ারা বাগান ঘেরা ভীমরুলি গ্রাম। একাত্তরের ৭ জুন এ গ্রামের পেয়ারা বাগান থেকে স্থানীয় অনেককে ধরে এনে গ্রামের ভীমরুলি স্কুলের পিছনে খালের পাড়ে হত্যা করা হয়। যুদ্ধের ন’মাসে অসংখ্য নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে এখানে এনে হত্যা করা হয়। এখানেও কোন স্মৃতি চিহ্ন রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকায় এ জায়গাটির নাম রয়েছে।

শতদশকাঠী সতীলক্ষ্মী বালিকা বিদ্যালয় বধ্যভূমি

শতদশকাঠী বধ্যভূমি: একাত্তরের গণহত্যার নির্মম স্বাক্ষী শতদশকাঠী বধ্যভূমি। গ্রামের শতদশকাঠী সতীল²ী বালিকা বিদ্যালয়ে পাক বাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পেয়ারা বাগানে পালিয়ে আসা অসংখ্য সাধারণ মানুষকে ধরে এনে বাংলা জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে বিদ্যালয়টির পিছনের পুকুর ও খাল পাড়ে হত্যা করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালটির পুরাতন কূপ এবং পুকুরের মধ্যে অসংখ্য মানুষের হাড় ও মাথার খুলি পাওয়া যায়। এখানে আজও কোন স্মৃতি স্তম্ভ কিংবা শহীদের তালিকা তৈরি হয়নি। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকায় এ বধ্যভূমির নাম রয়েছে।

জগদীশপুর বধ্যভূমি

জগদীশপুর বধ্যভূমি: জগদীশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনে একাত্তরের বাংলা জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে গণহত্যা চালায় পাক বাহিনী। এখানেও স্থানীয়দের সাথে পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য মানুষকে হাত বেঁধে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিনের পর দিন হত্যা করা হয়। স্কুলের দেয়ালে সেই হত্যা চিহ্ন স্বাধীনতার পরও অনেকদিন ছিল। এ গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা হিরালাল সমাদ্দার এ বধ্যভূমির কথা বলেন। ১৯৯৬ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে এখানে একটি শহীদ বেদি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটে সংস্কারের অভাবে আজ তা ভেঙে গেছে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকাও এ স্থানটির নাম রয়েছে।

এ ব্যাপারে কথা হয় ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলীর সাথে। তিনি বলেন, একাত্তরে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন ঝালকাঠির পেয়ারা অঞ্চলের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধে এ অঞ্চের মানুষের সীমাহীন ত্যাগ এবং অবদান রয়েছে। তিনি আরও জানান, ঝালকাঠি জেলায় মোট ২২টি বধ্যভূমি ও দু’টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে বেশির ভাগ স্থান ব্যক্তি মালিকানাধীন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিরক্ষা এবং শহীদের প্রতি শ্রদ্ধায় পেয়ারা অঞ্চলসহ ঝালকাঠির সবগুলো বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। খুব শীঘ্রই বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা সম্ভব হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী।

পলাশ রায়, জেলা প্রতিনিধি, সময় টিভি ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments