স্বাধীনতা সংগ্রামে কাউখালীর দলিত জনগোষ্ঠী অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও পাননি স্বীকৃতি

 Posted on

রবিউল হাসান মনির, পিরোজপুরঃ বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ১৯৪৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর পাকিস্তান পর্বটির ঘটনা ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষের দুইটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করা হয়। তখন পূর্ব বাংলা হয় পাকিস্তানের অংশ তথা পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পকিস্তানের জনগণ তখন আশা করেছিল এবার তাদের আশা আকাঙ্খা পূরণ হবে। তাদের স্বাধীন নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। উন্নত জীবনের অধীকারী হবেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বুঝতে পারলেন তাদের আশা প্রত্যাশা পূরণ হবার নয়। তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শোষণ, নীপিড়ন, অত্যাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি ধারাবাহিকভাবে স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে আসছিল। মূলত বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্টের বিজয়, ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৭এর গণঅভ্যূত্থান এবং ১৯৭০ এর নির্বাচন জাতীয় জাগরণে ব্যপক ভূমিকা পালন করে। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, অত্যাচার, জুলুমের প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের ৭মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। দীর্ঘ নয় মাস স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশে ও জাতির সার্বিক মুক্তি অর্জন করে। আর এই বাংলার স্বাধীনতা এসেছে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, পেশাসহ সকল শ্রেণির মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। এই সংগ্রামে সবার আগে এগিয়ে আসেন নিম্ন আয়ের মানুষ ও দলিত সমাজের মানুষ। যাদেরকে নিচু শ্রেণির মানুষ মনে করে তারাই দেশকে স্বাধীন করার জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। স্বাধীন সংগ্রামে কাউখালীর দলিত জনগোষ্ঠী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলেও এই সম্প্রদায়ের রমেশ চন্দ্র দাস ও নারায়ণ চন্দ্র দাস মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভূক্ত হন। দলিত জনগোষ্ঠীর অনেকেই বিশেষ করে পাল ও জেলেরা নিজেদের জীবন বাজী রেখে যুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছেন। কিন্তু তাদর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আজও ওঠেনি। এদের মধ্যে অনেকে দেশ স্বাধীনের পরে উঁচু শ্রেণীর মানুষের নির্যাতন ও অত্যাচারে কারণে এ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।

এ ব্যাপারে কাউখালী উপজেলা মুক্তযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন তালুকদার দালিতকণ্ঠকে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কাউখালীর দলিত জনযোষ্ঠী বিশেষ করে পাল ও জেলেরা যুদ্ধের সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কাউখালী উপজেলা একটি নদী বেষ্টিত এলাকা। এখানকার এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে হলে নদী পার হয়ে যেতে হতো। যুদ্ধের সময় এই সব নদী পারাপারের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত পাল ও জেলেরা সহায়তা করেছেন। বলতে গেলে তাদের সহযোগিতা আমরা তখন না পেলে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা সম্ভব হতো না। তারা পাকবাহিনীর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য আমাদেরকে দিতেন। তিনি আরো বলেন, এইসকল দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখ যুদ্ধে হয়ত অংশ গ্রহণ করেন নি বা যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণও নেন নি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে সম্মূখ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য সহযোগিতা করেছেন। তারা নিজের জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচাতে আশ্রয় দিয়েছেন তাদের বাড়িতে। অনেকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সহায়ক যোদ্ধা হিসেবে দিন রাত কাজ করেছেন। আজ সরকারের উচিত আমাদের সাথে এই সকল দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষদেরকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

মোঃ রবিউল হাসান মনির, পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি, পূর্ব-পশ্চিম বিডি, ডেইলি আওয়ার টাইম, দৈনিক তৃতীয় মাত্রা, বরিশালবানী ডট কম, সময় নিউজ ২৪ ডটকম। কাউখালী উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ, দৈনিক শিক্ষা ডট কম এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments