স্বাধীনতা যুদ্ধ আধুনার দত্তদের করেছে নিঃস্ব

 Posted on

বিধান সরকার, অতিথি প্রতিবেদক, বরিশাল: একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ। কোন মা হারিয়েছেন তার স্বামী নতুবা সন্তান। কেউবা হারিয়েছেন স্বজন। শরণার্থী হয়ে পোড়া ভিটেয় আর ফেরেন নি, বিবাগী হয়েছেন এমন সংখ্যাও বহু। আধুনার দত্তরা পোড়া ভিটা ছাড়েনি বটে; তবে সময়ের ব্যাবধানে তালুকদারী হারিয়ে নেমেছেন ভৃত্যের পর্যায়ে। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানী সেনাদের রেশে শুরু হওয়া বিপর্যয় দেশ স্বাধীনের পর আজো বহমান। এজন্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য শংকর দত্তকে কখনো ভাগ চাষী, কখনোবা চায়ের দোকানী হতে হয়েছে। সেদিন রাতে গৌরনদী উপজেলার শরিকল বাজারে, তার চায়ের দোকানে বসে কথা হয় আমার সাথে।

আধুনা গ্রামটির বর্ণনায় মুক্তিযোদ্ধা আলী আকবর মোল্লা জানান, এটি ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। জমিদার তালুকদারদের বসতি ছিল। শিক্ষার হারও ছিল বেশ। এখানেই রাজাবাড়ি নামের স্থানটিতে আজো তিন থেকে চার হাত মাটি খুড়লে প্রাচীন আমলের ইটের দেখা মেলে। গ্রামের অনেক স্থানেই মাটির নীচে চাড়া পাওয়া যায়। পশ্চিমে ঘাগর নদী, পুবে ঘন্টেশ্বর আর দক্ষিণে সন্ধ্যা নদী, উত্তরে অড়িয়াল খাঁর শাখা এমন নিরাপত্তায় এই জনপদ সমৃদ্ধ হয়েছিল বলে বয়স্কদের ধারণা। তবে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের রেশে হিন্দু অধ্যুষিত আধুনার অনেক পরিবার ভারতে চলে যান। এই গ্রামে এক সময় ৯ খানা দুর্গা পূজা হতো বলে জানান আলী আকবর। সময়ের ব্যাবধানে এখন একখানিতে এসে ঠেকেছে। এই আধুনা গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ দত্তদের তালুকদারী ছিল। দুই একর নিয়ে বসত বাড়ি। অনেক লোক দত্ত বাড়ির অনুদান আর অনুকম্পা পেয়ে বড় হয়েছেন। আর সেই দত্তরা এখন কেবল ভিটের মাটি ব্যতীত সব হারিয়ে নিঃস্ব।

৩রা জৈষ্ঠ্য ২৪ এপ্রিল ১৯৭১ সালের মঙ্গলবার, সকাল সাড়ে ৮টা। পার্শ্ববর্তী মাহিলাড়া গ্রামের খাদেম হোসেন মিলিটারী ও বঙ্কুরা গ্রামের হায়দার আলী বেপারী এই দুই রাজাকারের নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জনের পাকিস্তানী সেনা আক্রমণ চালায় আধুনা গ্রামে। নিহত হন, বেলী বেগম, জগদীশ মন্ডল, মকবুল হাওলাদার, আ. করিম সিকদার, প্রভাত চন্দ্র ব্যানার্জী, দিলীপ চন্দ্র মন্ডল, কালাচাঁদ দাস, বিনোদ হালদার, কালাচাঁদ ধূপী, সুরেন হালদার, হারান চন্দ্র দাস, নলিনী মন্ডল এবং আক্কাস মিয়া মিলিয়ে ১৩ জন। আহত হয়েছেন বহু। যাদের কেউ যুদ্ধের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে আজো বেঁচে আছেন। ঘর বাড়িতে আগুন লাগানোর আগে মালামাল লুটে নেয় রাজাকাররা। এই হত্যাকান্ড ও লুটপাটের ঠিক দশ দিন পর ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি ও আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন মিয়ার বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানী সেনারা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ছেলে শংকর চন্দ্র দত্তের (৬৩) বর্ণনায়-পাকিস্তানী সেনারা সেদিন পশ্চিম দিক থেকে আসে। তাদের বাড়ির বসন্ত দত্ত, ধনঞ্জয় দত্ত, ভবরঞ্জন দত্ত এবং ভদ্র দত্তদের মিলিয়ে ৭টি ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। জীবন বাঁচাতে বুলু খানদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। চেয়ে চেয়ে দেখেছেন কেমন করে তাদের ঘরগুলো, দুর্গা পূজার মন্ডব সব জ্বলে ছাই হয়েছে। বিরাণ ভিটায় পোড়া টিনের ছাপরা আর নারিকেল পাতার বেড়া দিয়ে রাত যাপন করেছেন।

দিনের বেলায় পালিয়ে থাকতেন মান্নান মিয়ার বাড়িতে। স্বার্ধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন ৮ মাস দিনের বেলা বাড়ি ছেড়ে থাকায় তাদের কোন জমি আবাদ করতে পারেননি। আগুনে সব শেষ হয়ে যাওয়ায় খাবারের জোগান দিতে বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা নিজাম বাহিনী এলাকায় আসার পর রাজাকারদের উৎপাত কমে। এরপর ভিটায় ফেরেন স্থায়ী ভাবে। বুক বয়ে যাওয়া নিঃশ্বাস শেষে শংকর দত্ত বললেন, ওই যে ভাটার শুরু আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি তারা। দেশ স্বাধীনের বছর কয়েক পর স্থানীয় ভূমিদস্যূদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তাদের জমির প্রতি। জমি রক্ষার্থে আড়াই দশক ধরে চলমান মামলায় তাদের পুরোটা নিঃস্ব করেছে। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে জীবন টেনে নিয়ে যেতে শংকর দত্ত এক সময় হয়েছেন ভাগ চাষী। শরীর মানা করে তাই শরিকল বাজারে এখন ছোট্ট চায়ের দোকান পেতেছেন। তিন কনে, মাধ্যমিক পাশের পর টাকার অভাবে আর কলেজে ভর্তি করতে পারেননি। বিবাহ যোগ্য হলেও পাত্রস্থ করার চিন্তা কুড়ে কুড়ে বিনাশ করছে শংকর দত্তকে।

এই অবস্থা কেবল শংকরের বেলায় নয়; বাড়ির অন্য পরিবারগুলোর চিত্রও একই প্রায়। ‘দত্ত কারো ভৃত্য নয়; সঙ্গে এসেছে’, স্বাধীনতা যুদ্ধ এই দেমাগী বাত বদলে দিয়ে আধুনার দত্ত পরিবারকে নামিয়েছে সর্বহারার কাতারে। তালুকদারী হারিয়ে জীবন বাঁচাতে যাদের পরের কাজই করতে হচ্ছে।

বিধান সরকার, গল্পকার।

Facebook Comments