স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনে পিছিয়ে দলিতরা, প্রয়োজন সচেতনতা

 Posted on

গোপাল অধিকারী, জেলা প্রতিনিধি, পাবনা : সমাজের বিভিন্ন দিক থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নাম দলিত সম্প্রদায়। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনগ্রসর এই সম্প্রদায়কে এগিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন প্রদক্ষেপ নিলেও বাস্তবায়নে তার চিত্র ভিন্ন। পাবনা জেলার সাতটি উপজেলা সুজানগর, সাঁথিয়া, বেড়া, ঈশ্বরদী, চাটমোহর, আটঘড়িয়া, ভাঙ্গুড়াতে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও দলিতদের সাথে কথা বলে জানা যায় তাঁরা মূল জনগোষ্ঠীর থেকে অনেক পিছিয়ে। পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় পাল্টাপাল্টি তথ্য। প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসূত্রে জানা যায় দলিতরা অফিসমুখী না। তাদের বিভিন্ন কাজে-কর্মে ডাকলে সাড়া মেলে না। এছাড়াও দলিতরা বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন না। তারা অনেক কিছুতেই অসচেতন। না জানার কারণে তারা পিছিয়ে রয়েছে। অন্য দিকে দলিতরা বলে তারা সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পায় না। তারা বলেন, প্রশাসনের আইন-শৃঙ্খলা মিটিং এ দলিতদের কোন উপস্থিতি নেই। ফলে সরকার কর্তৃক কোন নিরাপত্তার কোন তথ্য তারা জানেও না জানাতেও পারে না। বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা সভায় উপস্থিত থাকলে সরকারি তথ্য জেনে ও জানিয়ে সচেতন হওয়া যেত। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে তথ্য নিয়ে জানা যায়, ঈশ্বরদীর কোন ইউনিয়নে কোন স্ট্যান্ডিং কমিটি কার্যকর নেই। পূর্বের যে কমিটি ছিল তাতে দলিতদের তেমন অবস্থান নেই। এই বিষয়ে কথা বলতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা জানান, স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং এ তেমন কেউ উপস্থিত থাকে না। তেমন ভূমিকা পালন করে না স্ট্যান্ডিং কমিটি যে কারণে কমিটির কার্যকারিতা নেই। অপরদিকে দলিতরা বলেন, স্ট্যান্ডিং কমিটির ব্যাপারে তাদের কোন মতামত বা সিদ্ধান্ত নেয় না স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা। ফলে স্থানীয় সরকারের জবাবদিহিতার জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়ছে দলিতরা। সুজানগরের বিভিন্ন দলিতদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুজানগরের দলিতরা তাদের সংখ্যা অনুপাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায় না। সরকার ইউনিয়ন পরিষদে যে ভিজিএফ বা অন্যান্য সুবিধা দেয় তা পর্যাপ্ত অনুসারে নগন্য। দলিতদের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকলে দলিতদের ভাগ্যোন্নয়ন হতো বলে মনে করেন তারা। চাটমোহর উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের দলিতদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী চলমান ৫ বছরে বাস্তবায়নযোগ্য দলিতদের জন্য স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের পদক্ষেপ বিষয়ে বর্তমান অবস্থা শোচনীয়। সরকার দলিতদের জন্য অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে তবে তা প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়। তারা বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসবে যে পরিমাণ সরকারি অনুদান দেওয়া হয় তাতে জাকজমকপূর্ণভাবে পূজা করা সম্ভব হয় না। অনুদানের পরিমাণ বাড়ালে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি। ভাঙ্গুড়া উপজেলার বিভিন্ন দলিত নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দলিতরা অনেক দিক থেকেই সচেতন না। তারা তথ্যগত দিক থেকে পিছিয়ে যে কারণে মূলধারার জনগোষ্ঠীর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে তারা পিছিয়ে।

ঈশ্বরদী উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সন্তোষ সরকার বলেন, জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী চলমান ৫ বছরে বাস্তবায়নযোগ্য দলিতদের জন্য স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের পদক্ষেপ বিষয়ে বর্তমান অবস্থা মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে দলিতদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনের আরও গঠনমূলক ভূমিকা থাকলে মূল জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি পেত।
চাটমোহর উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি জয়দেব জানান, চাটমোহরে অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ী রয়েছে। বর্তমানে তারা ভাল ও নিরাপদে ব্যবসা করছেন। তবে তাদের নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিত্বে একটি সংরক্ষিত আসন প্রয়োজন।

সুজানগর উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রঞ্জিত রায় জানান, সুজানগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে স্ট্যান্ডিং কমিটির কার্যকারিতা নেই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলিতদের কোটা থাকলে সহ-অবস্থান সম্ভব।

পাবনা জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিনয় জ্যোতি কুন্ডু বলেন, দলিত জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কোথাও পাচ্ছে কোথাও তা বঞ্চিত হচ্ছে। এর জন্য যেমন স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার দায়ী তেমনি দলিতদের অবস্থানও দায়ী। দলিতদের মধ্যে নেতৃত্ব তৈরি করে, রাজনৈতিক সচেতন করে এবং সরকারি কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারি প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারে দলিতদের অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব।

গোপাল অধিকারী, নির্বাহী সম্পাদক ইতিহাস২৪, উপজেলা প্রতিনিধি-বাংলাদেশের খবর ও র্বাতা সম্পাদক সাপ্তাহিক সময়ের ইতিহাস, সদস্য, বাংলাদেশ মাইনরিটি’স হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments