সুনাম থাকা সত্ত্বেও দিনাজপুরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হস্তশিল্প বিলুপ্তির পথে

 Posted on

আজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুর : রসনা বিলাস যারা করেন দিনাজপুরের পাঁপড় তারা খান নাই, এমনটি হতেই পারে না। এই জেলার পাঁপড়ের নাম আছে সারা দেশে। মুগডাল ও খেসারী ডাল দিয়ে রুটি বেলার মতো করে এই পাঁপড় তৈরি হয়। পাঁপড় তৈরির সাথে জড়িত পশ্চিমা হিসেবে পরিচিত এক শ্রেণির মানুষ, যাদের বেশিরভাগ নারী। প্রধানত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই পাঁপড় তৈরির সাথে জড়িত। তবে সাম্প্রতিককালে মুসলমান মহিলাদের অনেকে পাঁপড় বেলানোর কাজ করে কিছু টাকা কামিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন।

বাংলাদেশের পশ্চিম দিক হতে যারা দিনাজপুরে এসেছেন তারা ‘পশ্চিমা’ নামে অভিহিত। তাদের একটি অংশ পাঁপড় তৈরি ও বিপননের সাথে জড়িত। দিনাজপুর শহরের চকবাজার, বড়বন্দর, গুঞ্জাবাড়ি, রাজবাটি জগেনবাবুর মাঠ, ফকিরপাড়া, মালদহপট্টি এলাকার হিন্দু ধর্মের মানুষেরা পাঁপড় তৈরি করেন। এই পাঁপড় বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই যায়। সবখানেই দিনাজপুরের পাঁপড়ের সুনাম রয়েছে। তবে পাপড় ব্যবসায়ী ওমপ্রকাশ জানান, আমরা এখন এই ব্যবসায় খুব একটা সুবিধা করতে পারছি না।

পাঁপড়ের মত হস্ত শিল্প ভিত্তিক বিভিন্ন পেশার সাথে যারা জড়িত তাদের অবস্থা ওমপ্রকাশদের মতই অনেকটা। ব্যবসায় সুবিধা করতে পারছেন না তারা। ‘আমরা কাজ করি। কাজ করেই খেতে চাই। কিন্তু সময়টা এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কাজ করে খাওয়ার সুযোগও হারিয়ে যেতে বসেছে।’ দিনাজপুরের কুমার সম্প্রদায়ের একজন, যার নাম জগন্নাথ পাল, পিতা শিবু পাল খুব আক্ষেপ, দুঃখ ও হতাশা থেকে বললেন কথাগুলো। তার মতে, মানুষের টাকা বাড়ছে, টাকার সাথে বাড়ছে শিল্প কল কারখানা। শিল্প-কারখানা বেড়ে যাওয়ায় কুটির শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে, আর কুটির শিল্পের সাথে জড়িতদের অর্থনৈতিক জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে।

দিনাজপুর শহরের মহারাজা স্কুলের কাছে বাড়ি জগন্নাথ পালের। বাড়ির সাথেই রয়েছে তার মাটির তৈরি তৈজসপত্র বিক্রির দোকান। এখানেই তিনি মাটির জিনিস তৈরি ও বিক্রি করেন। বললেন, ২০ বছর আগেও হাড়ি, গ্লাসসহ মাটির তৈরি তৈজসপত্র প্রচুর পরিমাণে বিক্রি করতাম। তখন বেশ আয় হতো। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালই চলতে পারতাম। এখন সিলভার, মেলামাইন, স্টিলের পাশাপাশি প্লাস্টিকের তৈজসপত্র বের হয়েছে। মানুষ এখন এগুলো বেশি ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে প্লাস্টিক সামগ্রী পুরো দেশ খেয়ে ফেলেছে। প্লাস্টিক এসে মাটির জিনিস অচল হয়ে গেছে। মানুষের মাঝে মাটির তৈরি কোন কিছুর প্রতি আকর্ষণ নেই। এখন মানুষ হাড়ি নেয় না, মাটির গ্লাসে পানি খায় না। মানুষ এখন ওয়ানটাইম জিনিস খুঁজছে। ফুলের টব কিছু বিক্রি হলেও তার পরিমাণ আহামরি কিছু নয়। আড়াই-তিনশ’ টাকার মালামাল বিক্রি করতে সারা দিন লেগে যায়। কোন কোন দিন ১০০ টাকাও বিক্রি থাকে না। ফলে এই পেশার বাইরে আমরা যারা আর কিছু করতে পারি না তারা কষ্টে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছি।’

একটা সময় মাটির সামগ্রী দিনাজপুরের প্রতিটি ঘরে ঘরে ছিল। ভাত রান্না হতো মাটির হাঁড়িতে। জিয়াফত বাড়িতে লোককে পানি খাওয়ানো হতো মাটির গ্লাসে। মাটির পুতুল তৈরি করে বিভিন্ন মেলায় বিক্রি করা হতো। পুনর্ভবা নদীর সাধুর ঘাটের দুর্গা মেলা, আনন্দ সাগর সংলগ্ন গোষ্ঠের ডাঙ্গা মেলা, রামসাগরের নিকটবর্তী চেরাডাঙ্গি মেলা, ঐতিহ্যবাহী কান্তজীউ মন্দিরের রাসমেলা, ঘোড়াঘাটের বিখ্যাত চৌধুরী মেলা, রানীশংকৈলের বিখ্যাত নেকমর্দ মেলাসহ বিভিন্ন মেলায় মাটির তৈরি পুতুল বিক্রি হতো। যার মধ্যে থাকত হাতী, ঘোড়া, ব্যাঙ, মানব মূর্তি, গনেশসহ বিভিন্ন দেব, দেবীর মূর্তি। স্বল্প মূল্যের সেইসব পুতুল সামগ্রী দরিদ্র পিতা-মাতারা তাদের সন্তানদের কিনে দিতেন আনন্দের সাথে। মাটির পুতুল, মাটির হাড়ি, গ্লাসসহ নিত্য প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র বাঙালির লোকজ সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছিল। এছাড়াও নক্সাযুক্ত মাটির বিভিন্ন সামগ্রী ঘরবাড়ির সৌন্ধর্য বৃদ্ধির কাজেও ব্যবহ্র করা হতো। সব মিলিয়ে দিনাজপুরে পাল সম্প্রদায়ের উৎপাদিত মাটির পণ্য এই অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। একইভাবে দিনাজপুরের কর্মকার সম্প্রদায়ের উৎপাদিত লৌহ সামগ্রী, যেমন দা, কুড়াল, বাসিলা, কোদাল, চাকু, হাসুয়া, বর্শা, ফলক ইত্যাদি পন্য মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাত এবং লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

দিনাজপুরের পাটনী, কলু সম্পদায়সহ আরও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যারা হস্তশিল্পভিত্তিক পেশার সাথে যুক্ত আধুনিকতার হাওয়ায় এসে তাদের অবস্থা এখন করুণ হয়ে পড়েছে। ডোমপাড়ার মন্টু চন্দ্র দাস পাটনী সম্প্রদায়ভুক্ত কারিগর। এখন তার বয়স ৫৫ বছর। তিনি জানালেন, বাঁশের কাজ করে আর পোষায় না। তাই সবাই এই কাজ ছেড়ে দিয়েছে। আমি ছাড়িনি অন্য কিছু জানিনা বলে।

মন্টু জানালেন, তিনি সাধারণত রিক্সার হুড তৈরি করেন। তার বাবা মৃত দেবেন্দ্র নাথ দাস, কাকা মৃত গোপাল চন্দ্র দাস, মৃত যোগেন চন্দ্র দাস, মৃত খগেন চন্দ্র দাস তারা রিক্সার হুড ছাড়াও ডালি, কুলা, খৈ চালা ইত্যাদি তৈরি করতেন। এখন বাঁশের চড়া দাম আর উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় তিনি ছাড়া পাটনীদের কেউ আর বাঁশ শিল্পে যুক্ত নেই।

দিনাজপুর সদর উপজেলার রানীগঞ্জের আনন্দ বৈশ্য প্রতি বছর বৈশাখী মেলা, বাণিজ্য মেলাসহ বিভিন্ন মেলায় নিজের উৎপাদিত বাঁশ পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। তিনি বলেন, এই ব্যবসার উপরে মোটামুটি ভালই চলি।

দিনাজপুর সদরের চুনিয়াপাড়ার চুনিয়ারা চুন তৈরি করে পেশাজীবী হিসেবে ভাল থাকতে পারছেন না। সাহেব বাবু দেবনাথ, নিতাই চন্দ্র দেবনাথ সহ আরও অনেকেই জানালেন যে, বংশ পরম্পরায় তারা এই পেশায় যুক্ত আছেন। কিন্তু এই পেশায় এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নাই, শুধুমাত্র কোন রকমে খাওয়া-পরা চলে।

দিনাজপুরের পাঁপড়সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোন কোন কুটির শিল্প, কোন কোন হস্তশিল্পের সুনাম দেশজুড়ে। কিন্তু সময়ের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে এই সব শিল্প এখন দুরবস্থার শিকার।

আজহারুল আজাদ জুয়েল, সিনিয়র রিপোর্টার- আজকের দেশবার্তা, এবং বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনরিটি মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম এর সভাপতি।

Facebook Comments