সার্বজনীন শিক্ষায় পিছিয়ে খুলনার দলিত সমাজ

 Posted on

তপন কুমার দাস, খুলনা :: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ অগ্রগতি লাভ করেছে। জনসাধারণের সার্বিক কর্মোদ্যোগ, সরকারি প্রচেষ্টা আর উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত কর্মপ্রয়াসে এই অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব হয়েছে। তা সত্তে¡ও, স্বাধীনতার চার দশক পর ব্যাপক সংখ্যক মানুষের দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস এবং সুযোগ ও সম্পদের অসম বণ্টন বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবতা এবং যারা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে, তারা হলেন দলিত স¤প্রদায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দলিত কারা? জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার মানুষরাই ‘দলিত’ নামে পরিচিত। আর ঔপন্যাসিকের ভাষায় আমাদের সমাজের দৃষ্টিতে এরা ‘গরিবের মধ্যে গরিব, ছোটলোকের মধ্যে ছোটলোক’। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো; ঋশি, ডোম, বাল্মিকী, রবিদাস, ডোমার, ডালু, মালা, হেলা, বাঁশফোর, পাহান, লালবেগী, সাচ্চারি প্রভৃতি। এরা সাধারণভাবে ‘হরিজন’ ও ‘দলিত’ নামে পরিচিত। ভূমিহীন ও নিজস্ব বসত ভিটাহীন এসব মানুষ বংশানুক্রমে সরকার প্রদত্ত খাসজমি, বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন প্রদত্ত জমি ও রেলস্টেশনে বসবাস করছেন। আর কামার, কুমার, চর্মকার, জেলে, রজকদাস, ক্ষৌরকার প্রভৃতি স¤প্রদায়ের মানুষকে বাঙালি দলিত আখ্যা দেয়া হয়। সমাজে তাদেরকে সাধারণভাবে ‘অচ্ছ্যুৎ’ বা ‘অস্পৃশ্য’ মনে করা হয়।
উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষা প্রধান ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা উন্নয়নের বিবিধ দিক ও বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতি ব্যাপক ও আশাব্যঞ্জক। সার্বিক অগ্রগতি সত্তে¡ও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, শিক্ষাক্ষেত্রে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে খুলনার দলিত পরিবারগুলো। যদিও সা¤প্রতিক সময়ে শিক্ষার হার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। দলিত পরিবারের অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে ঝরে পড়ে প্রাথমিক স্তর না পেরোতেই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিতামাতার অসচেতনতাই দায়ী করা হলেও এর পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। যেমন এ অঞ্চলের অধিকাংশ দলিত পরিবারগুলো দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে, তাই ছেলেরা একটু বড় হলেই তাদের দিয়ে কাজ করানোর কথা চিন্তা করা হয়। সাধারণভাবে অন্যান্য শিশুদের তুলনায় দলিত শিশুরা স্কুলে ভর্তি হয় দেরিতে, আবার আগাম ঝরে পড়ার হারও তাদের মধ্যে বেশি। যেখানে বাংলাদেশের ছয় বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৬৫%-৭০% স্কুলে ভর্তি হয়, সেখানে দলিত পরিবারের একই বয়সী শিশুদের মধ্যে এই হার পাওয়া গেছে মাত্র ৪০%-৫০%। অনেক অভিভাবক বলেছেন যে, শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানোর বয়স সম্পর্কে তারা অবহিত নন।
বেশ কয়েকটা প্রাথমিক স্কুল এ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে দলিত শিশুরা স্কুল এ নিয়মিত আসে না। আর আসলেও পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসে। এর জন্য মুল কারন হচ্ছে দলিত শিশুরা সাধারণত হীনমন্যতায় ভোগে। যেমন যখন সে একটি ছেড়া জামা-প্যান্ট পরে স্কুলে যায়, তখন সে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করে, স্কুল বন্ধ করে, বন্ধুদের সাথে খেলতে ইতস্তত বোধ করে ও সামনের বেঞ্চে বসতে চায় না। এভাবে ধীরে ধীরে সে স্কুল বিমুখ হয়ে উঠে। আবার এ অঞ্চলে বেশকিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে যা সাধারণত দলিত পাড়া থেকে একটু দূরে অবস্থিত। যার কারণে পিতামাতারা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। যেমন খুলনার ফুলতলা উপজেলার ধোপাখোলা দাস পাড়া নামে যে দলিত পাড়াটি রয়েছে সেখান থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দূরে, যার ফলে অনেক ছেলে-মেয়ে স্কুলে যেতে চায় না। কয়রার হড্ডা এলাকাতেও একই অবস্থা।
আমাদের সমাজটা এমনই যে পিছিয়ে রয়েছে, সে পিছিয়েই থাকবে তার দিকে কেউ তাকাবে না। এখানকার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সরকার প্রদত্ত উপবৃত্তি খুব কম সংখ্যক দলিত ছাত্র/ছাত্রীরা পেয়ে থাকে। কারণ তারা ঠিকমত স্কুল যায় না, পড়ালেখায় খুব ভালো না। কিন্তু কেন এমন হয় আমরা সেটা চিন্তাও করি না। তাদের দিকে নজর দেওয়ারও কেউ নেই। এখানকার প্রায় প্রত্যেকটি দলিত পরিবারের মাসিক আয় ৩০০০-৪০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সে টাকা দিয়ে সংসার চালাবে, নাকি ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা করাবে? এমন প্রশ্ন অনেকেই করেছেন। যেমন ধোপাখোলা দাস পাড়ার বিধান দাস বলেন, “আমার তিন ছেলেমেয়ে। আমি জুতা সেলাই করে দিনে ১০০-১৫০ টাকা আয় করি। যা আয় করি তাতে ঠিকমত সংসার চলে না, তারপরে সমিতির কিস্তি আছে। এর পরে ছেলেমেয়েদের পড়ানোর টাকা কোথায় পাবো?” আবার এখানকার অনেক দরিদ্র দলিত পিতামাতা মনে করেন স্কুল, কলেজের শিক্ষা তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য নয়, এসব হচ্ছে বড়লোকদের জন্য, তাই তারা ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চায় না।
– তপন কুমার দাস, সংবাদকর্মী, খুলনা এবং শারি’র দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments