সাতক্ষীরায় জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষায় দলিতদের অবস্থান এগিয়ে চলেছে

 Posted on

সাতক্ষীরায় জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষায় দলিতদের অবস্থান এগিয়ে চলেছে
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা :: জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষায় সাতক্ষীরার দলিতরা অনেকাংশে এগিয়ে গেছে। অনেক বাড়িতেই এখন কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি মেধা তালিকায়ও তারা পিছিয়ে নেই।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বরাত গ্রামের চায়না দাস। বাবা ভ্যান চালক হলেও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ নিয়ে স্নাতক সম্মান পরীক্ষায় পাশ করে সে। বর্তমানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স করছে। তার পাশাপাশি ছোট বোন কৃষ্ণা দাস, পড়ে তালা উপজেলার কুমিরা ডিগ্রী কলেজে, ছোট ভাই কার্তিক দাস পড়াশুনা করে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে। একইভাবে ওই গ্রামের ৬৩টি দলিত পরিবারের মধ্যে জগন্নাথ দাস, রঞ্জিতা দাস, শ্যামলী দাসসহ ১৯জন স্নাতক পড়ছে। তবে এদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই কলা ও বাণিজ্যিক বিভাগে। তবে তালা উপজেলার খানপুর, নারায়ণপুর, সুজনশাহ, জিয়ালা নলতায় দলিত স¤প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছে।
তবে সাতক্ষীরা পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের ঝুটিতলার চিত্র একটু আলাদা। সিটি ক্লিনিকের ওয়ার্ড বয় রাম প্রসাদ দাস জানান, তিনিসহ জীবন দাস, রমেশ দাস সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে স¤প্রতি স্নাতক করেছেন। সংসারের হাল ধরতে যেয়ে তিনি শহরের সিটি ক্লিনিকে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। উচ্চ শিক্ষার আকাঙ্খা থাকলেও অভাবের তাড়নায় সম্ভব হয়নি। তাছাড়া উচ্চ শিক্ষিত হয়েও কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ সুবিধা না থাকায় ইচ্ছা থাকার পরও লেখাপড়া করতে পরিবার প্রধানরা আগ্রহ প্রকাশ করেন না। একই কথা বলেন শহরের পার কুকরালির অনিমেষ দাস, বিজলী দাস ও হারান সরকার। পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের ডোম পাড়ার প্রতি ঘরে ঘরে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এমন পরিবার নেই যেখানে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পার হয়নি এমন ছেলে মেয়ে পাওয়া যাবে না। তবে সদর উপজেলার আগরদাড়ি গ্রামের পতিত পাবন দাস জানালেন, একজন দলিত হিসেবে নয়, দেশের সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের এলাকাও ২০১৩ এর ২৮ ফেব্রæয়ারি পরবর্তী দেড় বছরে নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তাই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সাত জন ছেলে পার্শ্ববর্তী দেশে চলে গেছে। তবে বর্তমানে তাদের এলাকার নয়জন পলিটেকনিক কলেজে পড়াশুনা করছে। তবে মেয়েদের পড়াশুনার হার ছেলেদের চেয়ে অর্ধেকেরও কম।
কালীগঞ্জ উপজেলার চাঁচাই গ্রামের নিমাই দাস জানান, কালীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ থেকে তিনি গতবার স্নাতক করেছেন কলা বিভাগে। তার প্রতিবেশী হৃদয় দাস ও স্বপন দাস এখন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে স্নাতক পড়ছে। এ গ্রামে মেয়েরাও মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছে কয়েকজন। তবে অভাবের তাড়নায় পৈতৃক পেশায় জড়িয়ে পড়ায় পড়াশুনা ছেড়েছে অনেকেই। তবে বিষ্ণুপুর গ্রামের সুভাষ দাস ও সুবল দাস জানালেন, তাদের পাড়ায় ২৯টি দলিত পরিবার রয়েছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারের ছেলে মেয়েরা মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও অভাবের তাড়নায় মাধ্যমিক পাশ করার পরপরই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। তবে একজন ব্যতীত মাস্টার্স পড়ুয়া ছাত্র নেই এখানে। একই অবস্থা উপজেলার নারায়ণপুর, কুশলিয়া, নলতাসহ কয়েকটি এলাকায়। বেসরকারি কলেজগুলোতে যে ভর্তি ফি ও মাসিক বেতন নেয়া হয় তা যোগাড় করতে যেয়ে অনেকেই শিক্ষা জীবন থেকে ঝড়ে পড়ে। তাছাড়া অনেক কলেজে কোচিং না করলে তাদের বিমাতা সুলভ আচরণের মধ্যে পড়তে হয়।
কলারোয়া উপজেলার পৌরসভা সদরে দলিত স¤প্রদায়ের একটি পাড়া রয়েছে। সেখানে মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে অনেকেই ঝরে পড়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন ডিগ্রী পড়ছে। একই অবস্থা ক্ষেত্রপাড়া, কয়লা ও গয়ড়া চন্দনপুরে।
তবে আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের দুর্গাপুর, কার্পাসডাঙ্গা এলাকার দলিতদের মধ্যে শিক্ষার হার খুবই কম। শ্রীউলার নাকতাড়া, হাড়িভাঙা, আশাশুনি সদরের গাইয়াখালির অনেকে মাধ্যমিকের গন্ডি পার হলেও তারা বেশিদূর এগোতে পারেনি। শ্যামনগরের নকীপুর, কৈখালি, ঈশ্বরীপুর, দেবহাটা উপজেলার সখীপুর, কামটা, দেবহাটা সদর, টিকেটসহ কয়েকটি এলাকায় অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে অনেকেই মাধ্যমিকের গন্ডি পার হতে পারেনি। তবে অনেকেই স্নাতক পাশ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা ছাড়াও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা অফিসার কিশোরী মোহন সরকার জানান, দলিত স¤প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তবে সাংসারিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকেই মাঝ পথে পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। তবে দলিত স¤প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা যাতে ভালভাবে পড়াশুনা করতে পারে সেজন্য সরকার যথেষ্ট আন্তরিক।
– রঘুনাথ খাঁ, দীপ্ত টেলিভিশনের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি এবং শারি’র দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments