সাতক্ষীরায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোক কমে যাওয়া বাঙালী সংস্কৃতি রক্ষায় প্রধান অন্তরায় : কুটির শিল্প রক্ষায় দরকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

 Posted on

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা :: বাংলাদেশের কুটির শিল্প ও বাঙালী সংস্কৃতির বিকাশে দলিত জনগোষ্টির বিশেষ অবদান রয়েছে। কালের আবর্তনে বিদেশী শিল্প ও বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে কুটির শিল্প ও বাঙালী সংস্কৃতি।  এছাড়া অসাম্প্রদায়িক চেতনার লোক কমে যাওয়া বাঙালী সংস্কৃতি রক্ষায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ না নিলে এসবের পূনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

জেলার প্রবীণরা জানান, অবিভক্ত বাংলাদেশে জমিদার আমল থেকেই সংখ্যালঘুদের একাংশের সঙ্গে দলিত জনগোষ্টি বাঁশ, বেত, চামড়া, কাঠ ও মাটির তৈরি জিনিসপত্র তৈরি করে বাঙালী সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। দলিত জনগোষ্টির তৈরি ধানের গোলা, ঢোল, খোল, খঞ্জনী, ঢোলক, জুতা, চামড়ার ব্যাগ, কোমরের বেল্ট, ঝুঁড়ি, কুলো, ধামা, চেঙারী, চাঁচ, পালকি, দাঁড়িপাল্লা, মাদুর, চাটাই, শীতলপার্টি, তাল পাখা, পেকে, টোকা, দোলনা, শোফা, আঁটল, পাটা, ফুলদানি, লক্ষীর-হাঁড়ি, চেয়ার, টেবিল, ঢেঁকি, গরুর গাড়ি, কলস, ভাঁড়, নাদা, খোপ,শানুক, থালা, গ্লাস, চায়ের ভাড়, মাটির মুর্তি, দা, বটি, ছুরি, কাঁচি, কার্পেট, চটের ব্যাগ, শপিং ব্যাগসহ বিভিন্ন কুটির শিল্প  যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে মেলা প্রাঙ্গণকে আলোকিত করতো। গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন হাট ও বাজারে বিক্রি হতো এসব পণ্য। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত মানের রঙবাহারী পণ্য  কোলকাতা ও ঢাকা শহর ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতো।

জমিদাররা দলিত জনগোষ্টির তৈরি পাদুকা ব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতেন।  তাদের তৈরি গোলা, লক্ষীর হাঁড়ি  ঘরে ঘরে শোভা পেতো। পুজা-পার্বন ছাড়াও যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ঢাক ও ঢোলের ব্যবহার ছিল যথেষ্ট। ঢোল ও  বেঞ্জু বাজতো বিয়েতে। তারা জানান, পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি, দোলউৎসব, রাসমেলা, বনবিবি-পূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজা, শারদীয় দুর্গাপূজা, বাসন্তী পূজা, বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা, গঙ্গাস্নান উপলক্ষে বারুণি মেলা, নবান্ন উৎসব, ঘুড়ি উড়ানো উৎসব, মনসা পূজা, গুড় পুকুরের মেলা, ভাসান গান, ধর্মীয় যাত্রাপালা, বালক কীর্তন, শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা, শ্রী শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী ও কার্তিক পূজা, বাঙালী সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। এসব অনুষ্ঠানে দলিতদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হতো। দেশীয় ছাড়াও বিদেশের অতিথিরা  মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজিত স্টল থেকে এসব পণ্য কিনতেন।  এসব পণ্য তৈরিতে যেসব উপাদানের প্রয়োজন হতো তার অধিকাংশই প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যেতো।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পতিত জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে নির্মাণ সামগ্রীর উৎপাদন কমতে শুরু করে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, সিডোর, আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে নদী ও সুন্দরবন উপকূলবর্তি এলাকার বনভূমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কুটির শিল্পে ব্যবহৃত বাঁশ, বেত, মেলে, শন, এঁটেল মাটি ও পাটের উৎপাদন কমতে থাকে। একইসাথে কম উৎপাদিত এসব উপাদানের বাজার দামও বাড়তে থাকে। বেশি দাম দিয়ে নির্মাণ সামগ্রী কিনে বাজারে ন্যায্যদাম না পাওয়ায় অনেকেই হতাশ হয়ে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। এ সুযোগে চটকদারি প্লাস্টিক, নাইলন ও স্টীলের পণ্য সামগ্রী বাজার দখল করে নেয়। বাঁশ ও বেতের তৈরি দীর্ঘস্থায়ী জিনিসের চেয়ে ওইসব পণ্যের দাম অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় ক্রেতারাও বেশি করে উৎসাহিত হয়। ফলে কালের বিবর্তনে প্লাষ্টিক সামগ্রী, চিনা মাটি, কড়ি, স্টীল, পলিথিন, ফাইবার গøাসনির্মিত সামগ্রী বাজারে আসতে শুরু করায় ঐতিহ্যবাহি বাঙালী কুটির শিল্পের কদর কমতে শুরু করে। অসম এ প্রতিযোগিতায় একদিন হারিয়ে যাবে প্রাচীন কুটির শিল্প ও শিল্পীরা।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুকুমার দাস মনে করেন, বাঙালী সংস্কৃতি, দলিত জনগোষ্টি ও তাদের নির্মিত কুটির শিল্প অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাঙালী সংস্কৃতি না থাকলে থাকবে না কুটির শিল্প ও দলিত জনগোষ্টি। তাই কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িত দলিত শিল্পীদের সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহজ ও সরল সুদে বা বিনাসুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের সুব্যবস্থা করতে হবে। দলিতদের উৎপাদিত কুটির শিল্প বাজারজাতকরণের জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। বিপনন ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় ও জেলায় ওইসব পণ্য কেনাবেচার জন্য বাজার বা হাট সৃষ্টি করতে হবে। বিভিন্ন মেলায় স্টল দেওয়ার ক্ষেত্রে দলিত জনগোষ্টিকে সহজ শর্তে সুযোগ দিতে হবে। হাট, বাজার ও মেলায় দলিত জনগোষ্টির উৎপাদিত কুটির শিল্পের ন্যয্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যক্ষ প্রফেসর সুকুমার দাস আরো বলেন, ধমীয় কুসংস্কারের কারণে দলিত জনগোষ্টিকে কোথাও কোথাও ধমীয় অনুষ্ঠানে অচ্ছুৎ ঘোষণা করা হয়। ঢাক ও ঢোল বাজানো ছাড়া তাদেরকে মূল অনুষ্ঠানে শরীক হতে  দেওয়া হয় না। তাই মানব সভ্যতা রক্ষায় ধমীয় কুসংস্কার ভুলে দলিত জনগোষ্ঠিকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি যেমন বনবিবি পুজা, ভাষান গান, ধমীয় যাত্রাপালা, দোল উৎসব, নামযজ্ঞসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারি পৃষ্টপোষকতা থাকতে হবে। থাকতে হবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।  বিদেশীদের কুটির শিল্প কিনতে আগ্রহী করতে সরকারিভাবে প্রদর্শণীর আয়োজন করতে হবে। এ ছাড়া তাদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিগুলোতে পুনরুদ্ধারে দল, মত নির্বিশেষে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদেরকে সহায়তা করতে হবে।  বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত করে বিদেশী পণ্য বর্জন করতে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে দলিতরা যাতে মৌলবাদিদের দারা ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেজন্য তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সম্পদ ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নইলে ন্যয়বিচার বঞ্চিত  দলিত জনগোষ্ঠি পেশা পরিবর্তন করে জন্মভুমি ছেড়ে ভিন্নস্থানে বা দেশত্যাগে বাধ্য হবে। বিপন্ন হবে কুটির শিল্প ও বাঙালী সংস্কৃতি। ২০০৫ সালে গুড়পুকুরের মেলা চলাকালিন জেএমবি’র বোমা হামলা চালানোর পর ওই মেলাসহ বৈশাখীমেলার জৌলুস হারিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরী ও শিল্প সহায়ক কেন্দ্রের উপ-ব্যবস্থাপক গোলাম সাকলাইন বলেন, এক সময় বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়ে দলিত জনগোষ্ঠিকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হলেও তারা পরবর্তীতে আর পরিশোধ করেনি। এসব কারণে চলতি বছরে দলিত জনগোষ্ঠির কুটির শিল্প উৎপাদনে কোনো সরকারি বাজেট বা প্রকল্প নেই। তবে যে সমস্ত এলাকায় দলিতদের নির্মিত কুটিরশিল্প পাওয়া যায় সেখান থেকে তা সংগ্রহ করে সরকারিভাবে বাজারজাত করণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিল্পের মান উন্নয়নে সরকারিভাবে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এ জন্য দলিত জনগোষ্ঠির বসতি খুঁজে তাদের সঙ্গে কথা বলা একান্ত প্রয়োজন ।

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি। দৈনিক প্রজন্মের ভাবনা, দৈনিক বাংলা’৭১, পোর্টাল নিউজ উত্তরাধিকার’৭১, সদস্য এইচআরডিএফ, সদস্য ‘সুনাম’ সাতক্ষীরা জেলা শাখা, সভাপতি ‘ বাংলাদেশ দলিত মাইনরিটি মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম’।

Facebook Comments