সাতক্ষীরার শ্যামনগরে রাতের আঁধারে হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি জবরদখল করে ঘর নির্মাণের চেষ্টা : বাধা দেওয়ায় নয়জনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম, গ্রেপ্তার-১

 Posted on

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা ঃ রাতের আঁধারে হিন্দু স¤প্রদায়ের জমি জবরদখল করে ঘর নির্মাণে বাঁধা দেওয়ায় দু’ নারীসহ একই পরিবারের নয়জনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখমের মামলায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। রোববার রাতে তাকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বাধঘাটা গ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতের নাম আব্দুল হামিদ। তিনি শ্যামনগর উপজেলার বাধঘাটা গ্রামের সামছুর রহমান দুলুর ছেলে।

কাছড়াহাটি গ্রামের রবীন্দ্র নাথ মণ্ডলের ছেলে উৎপল মণ্ডল জানান, তার বাবাসহ জ্যাঠামহাশয় রণজিৎ মণ্ডল, কাকা অভিমন্যু মণ্ডল পৈতৃক সূত্রে কাছড়াহাটি নন্দীগ্রামে দু’একর ২৯ শতক জমির এস এ রেকডীয় মালিক হন। ওই জমির খাজনা বকেয়া থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে ৯৮৮/৯৭-৯৮ নং সার্টিফিকেট কেস করা হয়। ১৯৯৯ সালে তিনি আট হাজার ৬৪০ টাকা পরিশোধ করলে মামলা নিষ্পত্তি হয়। এ সংক্রান্ত তথ্য শ্যামনগর সহকারি কমিশনারের (ভুমি) অফিস থেকে সেটেলমেন্ট অফিসে না যাওয়ায় বর্তমান মাপ জরিপে ওই জমির মধ্যে এক একর চার শতক খাস করা হয়। বাধ্য হয়ে তার বাবা রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল শ্যামনগর সহকারি জজ আদালতে (দেওয়ানী ৭৩/২০০৯ নং)রেকর্ড সংশোধনের জন্য মামলা করেন। ২০১১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর মামলাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে তিনিসহ কয়েকজন বাদি হয়ে ওই মামলা পূণঃরুজ্জীবিত করতে ছানি কেস করেন। পরবর্তীতে একটি মহল ভূমিহীন সেজে বহ্মশাসন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশীলদার তারক চন্দ্র মণ্ডলকে ম্যানেজ করে ওই জমি ডিসিআর নেওয়ার চেষ্টা করে। তারক মণ্ডল বদলী হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর শ্যামনগর সহকারি কমিশনার (ভূমি) সুজন সরকার খাস হওয়া এক একর চার শতক জমির মধ্যে ৫০ শতক জমি বাধঘাটা গ্রামের শাখাওয়াত হোসেন, নাজমা খাতুন, শফিকুল মোল­া, ফুলি বিবি, সামছুর রহমান ও কাছড়াহাঁটি গ্রামের আজিজ গাজীর নামে একসনা বন্দোবস্ত দেন। এরপরপরই পাঁচজন ওই জমিতে ঘর বেঁধে বসবাস শুরু করেন। জানতে পেরে তিনি ডিসআর বাতিলের জন্য ২০১৮ সালের ২৩ মার্চ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কাছে ১৮/১৮ নং খাস আপিল করেন। এছাড়া জমির খাজনা পরিশোধের বিষয়টি সহকারি ভূমি কমিশনার সুজন সরকারকে অবহিত করায় তিনি ওই বছরের ১০ এপ্রিল ঘটনার জন্য দূঃখ প্রকাশ করে ডিসিআর বাতিল করে দেন। ডিসিআর গ্রহীতারা সুজন সরকারের বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কাছে আপিল করেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিষয়টি শ্যামনগর সহকারি ভূমি কমিশনারের কাছে বিচারের জন্য পাঠালে ডিসিআর গ্রহীতারা ওই আদেশের বিরুদ্ধে খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের আদালতে আপিল করেন। খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার বিচারের জন্য সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখানে ২০১৯ সালের ২৮ মে ডিসিআর বহাল করা হলে বিষয়টি শ্যামনগর সহকারি জজকে অবহিত করলে তিনি ডিসিআর এর কার্যক্রম স্থগিত করেন। এর মধ্যে ডিসিআর গ্রহীতারা সরকারপক্ষে মামলার পক্ষভুক্ত হওয়ার আবেদন করলে বিচারক রোমানা আফরোজ তা মঞ্জুর করে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই জমি থেকে ডিসিআর গ্রহীতা ৫ জনকে বেদখল হতে, ভোগদখলে বাধা প্রদান হতে ও সরকারপক্ষকে অন্যত্র ইজারা দিতে বারিত করা হয়। একই সাথে খাস ১৮/১৮ মামলার ২০১৯ সালের ২৮ মে এর আদেশ দেওয়ানী ৭৩/০৯ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। এরপর থেকে ৫জন ডিসিআর গ্রহীতা ওই জমিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অবৈধভাবে তার সংযোগ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আসছেন।
উৎপল মণ্ডল আরো জানান, রোমানা আফরোজের আদেশের পর ওই ছয়জন ডিসিআর গ্রহীতা, বর্তমান সাংসদ এসএম জগলুল হায়দারের ছোট চাচা শ্বশুর বাড়ি আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরের বাসিন্দা মহসিন সরদারসহ ১৪জন শ্যামনগরের বর্তমান সহকারি ভূমি কমিনার আব্দুল হাইকে ম্যানেজ করে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ৫০ শতক জমিসহ খাস হওয়া মোট এক একর চার শতক জমি গত বছরের ১১ নভেম্বর একসনা বন্দোবস্ত দেন। এর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কাছে আপিল (৪৫/২০) করলে গত ৩০ ডিসেম্বর ডিসিআর এর কার্যক্রম চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।

উৎপল মণ্ডল অভিযোগ করে বলেন, তিনি ডিসিআর বাতিলের আবেদন শুনানী জানতে পেরে ওই ১৪জন ডিসিআর গ্রহীতাসহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা গত ২০ ডিসেম্বর ভোর তিনটার দিকে ওই জমিতে ঘরবাড়ি বানানো শুরু করে। জানতে পেরে বাধা দেওয়ায় তিনিসহ তার মা শিলা রানী মণ্ডল, কাকিমা ভূপেন্দ্রনাথ মণ্ডল, হিমাংশু মণ্ডল, প্রদীপ মণ্ডল, কানু মণ্ডল, অশোক মণ্ডল, সুধীর মণ্ডল ও বাপ্পি মণ্ডলকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করে। স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রদীপ, কানু ও অশোককে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে কানু মণ্ডল গত রোববার পঙ্গুত্ব নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। জমি দখলের চেষ্টার পর থেকে হামলাকারিরা তাদের পুকুরের মাছ লুটপাট করে চলেছে।

শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক রিপন মলি­ক জানান, এ ঘটনায় উৎপল মণ্ডল বাদি হয়ে ২০ ডিসেম্বর ১২জনের নাম উলে­খ করে অজ্ঞাতনামা ৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। রোববার রাতে আব্দুল হামিদকে গ্রেপ্তার করে পরদিন তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

Facebook Comments