সরকারী সহযোগিতা ও প্রশাসনিক নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট : করোনার বাধা উপেক্ষা করে নির্দেশনা মেনে রাজবাড়ীতে ধর্মীয় উৎসব পালনে পিছিয়ে নেই দলিত জনগোষ্ঠী

 Posted on


সোহেল রানা, রাজবাড়ী ঃ বাংলাদেশে হাজং, কোচ, বানাই, মারমা, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, উঁরাও, মুন্ডা, খাসিয়া, মণিপুরী, খুমি, খিয়াং, লুসাই, বম, ¤্রাে, রাজবংশী, হরিজন, ডোম, সুইপার, ঋষিসহ বিভিন্ন নৃতান্ত্রিক জনগোষ্টি বসবাস করেন। তারা তাদের স্বকীয়তা, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ মুল্যেবোধ ও ঐতিহ্য দিয়ে আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে এসকল বর্নের মানুষের গৌরবোজ্জল অবদান রয়েছে। নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখে যাতে সকলের মত সমান মর্যাদা ভোগ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এসকল বর্ণের মানুষ আজ অবহেলিত। অবহেলার শিকারের মধ্যে অন্যতম দলিত জনগোষ্টি। তবে আগের চেয়ে এখন অনেকটাই সচেতন হচ্ছেন তারা। তারা রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে ধর্মীয় উৎসব পালনে পিছিয়ে নেই।
রাজবাড়ীতে দলিত জনগোষ্টি পিছিয়ে নেই ধর্মীয় উৎসব পালনে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা রয়েছে সার্বিক ভাবেই। তবে অন্যান্যে সম্প্রদায়ের চেয়ে দলিত শ্রেণীর ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিরা অনুউপস্থিত থাকার চেষ্টা করে। এর কারণ হিসেবে দলিত জনগোষ্টির জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ কম থাকাই প্রধান কারণ। হিন্দু অধ্যাষিত অঞ্চল হিসেবে রাজবাড়ী জেলার রয়েছে বিশাল ইতিহাস। এ জেলার ৫টি উপজেলা রাজবাড়ী সদর, বালিয়াকান্দি, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ। ৩টি পৌরসভা পাংশা, রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ। রয়েছে ৪২টি ইউনিয়ন। জেলার প্রতিটি ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের মধ্যে দলিত, হরিজন ও বেদে সম্প্রদায়ের সংখ্যা কম নয়। চরম অবহেলিত, বিচ্ছিন্ন, উপেক্ষিত জনগোষ্টি হিসেবে এরা সমাজে পরিচিত হলেও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অন্য সম্প্রদায়ের চেয়ে পিছিয়ে নেই। তাদের রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা। এ জেলায় জেলে, সন্যাসী, ঋষি, বেহারা, নাপিত, ধোপা, হাজাম, নিকারী, পাটনী, কাওড়া, তেলী, পাটিকর ইত্যাদী তথাকথিত নি¤œবর্ণের জনগোষ্টি এ সম্প্রদায়ও বসবাস করছে। সমাজে অন্যান্যে জনগোষ্টির সঙ্গে এদের সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি করা হয়ে থাকে।
রাজবাড়ী জেলাতে এ বছর শারদীয়া দুগোৎসবে মন্দিরে মন্দিরে পুজা অর্চনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরমধ্যে দলিত সম্প্রদায়ও তাদের ঐক্য অটুট রেখে শারদীয়া দুর্গোৎসব পালন করেছে। উৎসব মুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব হলেও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রতির কমতি ছিল না।
দলিত সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ পরিবার প্রধানরা পৌরসভা, হাট-বাজার ঝাড়–, বিভিন্ন সরকারী -বেসরকারী অফিসের কাজ, বাঁশ ও বেতের তৈরী তৈষশপত্র বিক্রি, সেলুন, জুতা সেলাই কাজ করে। এদেরকে সমাজের নি¤œবর্ণ ও ছোট জাত বলে অনেকেই গালি দিয়ে থাকে। পুজার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে রাজবাড়ীর দলিত জনগোষ্টির লোকজন গোয়ালন্দ রেলওয়ে ডোম পল্লী, রাজবাড়ী বিবেকান্দ পল্লী, পাংশা ঋষি পল্লী, বালিয়াকান্দি পুর্ব মৌকুড়ী ঋষি পল্লী, বহরপুর ঋষি পল্লী, কালুখালী , পুর্বমৌকুড়ী, হাড়ীখালীসহ তাদের নিজ নিজ পল্লীতে দুর্গা পুজার আয়োজন করে। এছাড়াও দলিত জনগোষ্টির লোকজন লক্ষীপুজা, কালিপুজা, স্বরসতি পুজা, শিবপুজা, বাসন্তি পুজা, মনসা পুজাসহ ধর্মীয় পুজা অর্চনা করে থাকে। তবে এদের আয় কম হওয়ায় জাকজমকপুর্ন ভাবে পুজার আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারী যতসামান্য যে অনুদান দেওয়া হয় তাতে তাদের পর্যাপ্ত প্রদান করা হয়েছে। তারপরও তাদের আয় কম হওয়ার ফলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে দলিত সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবী তাদের। শারদীয়া দুগোৎসব পালন করলেও তারা বেশি জাকজমকপুর্ণ ভাবে করে মনসা পুজা । পুজা উপলক্ষে চলে আরতি, গ্রামীণ মেলাসহ নাটক, যাত্রা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
মিলন দাস, হরিপদ সরকার, বিপুল দাস, কৃষ্ণ দাস, অমল সরকার, সরস্বতী দাস প্রেম কুমার সরকার জানান, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে নানা ভাবে বঞ্চনার শিকার হতে হয়। ফলে নিজের পল্লীর লোকদেরকে সাথে নিয়ে একত্রে আনন্দ, উৎসব ভাগাভাগি করে নিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পুজার আয়োজন করা হয়। তাদের পুজা অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষ সহযোগিতা করে থাকে। তবে অনেকেই আছে যারা তাদেরকে ঘৃনার চোখে দেখে। দিন বদলের সাথে সাথে তাদের ভাগ্যেও বদলে যাচ্ছে। তবে তাদের ধর্মীয় উৎসবে সরকারী ভাবে আশানুরুপ সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তাদের দাবী দলিত সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠানে সরকারী ভাবে বরাদ্দ পর্যাপ্ত রাখার জন্য। সব মন্দিরের মতোই তাদেরকে সমান অনুদান প্রদান করা হয়ে থাকে।
শারদীয় দুর্গাপূজায় পুলিশের পক্ষ থেকে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক সুষ্টু ভাবে পুজা উৎযাপনের জন্য বিভিন্ন মন্দির পরিদর্শন করেন। সরকারী সহযোগিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনও সহযোগিতা করেন। প্রতিবছর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের গ্রাম জামালপুর সার্বজনিন দুর্গা মন্দিরে কমিটি বিভিন্ন কাহিনী দিয়ে তৈরী করেন দেব-দেবীর মূর্তি । যা উপ-মহাদেশের সর্ববৃহৎ ও ব্যায় বহুল দৃষ্টি নন্দন পানির উপর ৪র্থ তলা বিশিষ্ট দূর্গা পুজার আয়োজন করেন। তবে এ বছর সেই আয়োজন নেই। করোনা ভাইরাসের কারণে এ বছর ২৬টি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। নির্দেশনা মেনেই পূজা অর্চনা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের আন্তরিকতা ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় উৎসব মুখর পরিবেশেই দলিত জনগোষ্টি ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে বর্জন করে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ তাদের সহযোগিতা করা ছাড়াও আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। প্রশাসনও তাদের সব সময়ই খোঁজখবর রাখে। তবে এখন পিছিয়ে নেই দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে। তাই সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
বালিয়াকান্দি উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রাম গোপাল চ্যাটার্জী বলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির ২৬টি নির্দেশনা মেনে ১৪৯টি মন্দিরে এ বছর পুজা অনুষ্ঠিত হবে। সবাইকে নির্দেশনা পালন করেই পূজা অর্চনা পালনের জন্য আমরা প্রতিটি ইউনিয়নের পূজারীদের সাথে মিটিং করেছি।
বালিয়াকান্দি উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি সনজিৎ কুমার দাস বলেন, বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ বিপদে আপদে সব সময় সকলে পাশে দাড়ানোর চেষ্টা করে। জেলায় ৪০৮টি মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
রাজবাড়ী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রদীপ্ত চক্রবর্তী কান্ত বলেন, আমরা আমাদের ভাইদের যেখানে যে সমস্যা হয়েছে যেই মন্দিরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সাথে সাথে আমরা ছুটে গিয়েছি। এ কাজে রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান পিপিএম আমাদের সর্বাত্বক সহযোগিতা করেছেন। যখনই আমরা ফোন করেছে রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার এক গাড়ি পুলিশ আমাদের সাথে দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, করোনাকালীন এ সময় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম সব সময় আমাদের খোজ খবর নিয়েছেন। তার সাধ্যমতো আমাদের সহযোগিতা করেছে। আমারা তার চেয়ে যখন যে সহযোগিতা চেয়েছি সাথে সাথে পেয়েছি।

সোহেল রানা, দি নিউ নেশন, ইউটিভি, রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধি, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক রাজবাড়ী কন্ঠ ও বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সহ-সভাপতি।

Facebook Comments