সমাজে নিচু জাত হিসেবে গণ্য হওয়ায় যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও দলিতরা কাঙ্খিত কর্মক্ষেত্র না পেয়ে মজুরী বৈষম্যের শিকার হয়

 Posted on

দলিত পেশাজীবী । ছবি: আজহারুল আজাদ জুয়েল

মঈন উদ্দিন আহমেদ, হবিগঞ্জ : দলিত সম্প্রদায় জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্যের শিকার। সমাজে নিচু জাত হিসেবে গণ্য হওয়ায় যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও দলিতরা তাদের কাঙ্খিত কর্মক্ষেত্র না পেয়ে মজুরী বৈষম্যের শিকার হয়। বাংলাদেশে দুই ধরনের দলিত জনগোষ্ঠির বসবাস। বাঙালি দলিত ও অবাঙালি দলিত। বাঙালি দলিত বলতে সমাজে যারা অস্পৃশ্য তাদের বোঝায়। যেমন ঃ চর্মকার, মালাকার, কামার, কুমার, জেলে, পাটনী, কায়পুত্র, কৈবর্ত, কলু, কোল, কাহার, ক্ষৌরকার, নিকারী, পাত্র, বাউলিয়া, ভগবানীয়া, মানতা, মালো, মৌয়াল, মাহাতো, রজদাস, রাজবংশী, রানা কর্মকার, রায়, শব্দকর, শবর, সন্ন্যাসী, কর্তাভজা, হাজরা প্রভৃতি। আর অবাঙালি দলিত বলতে ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝি (১৮৩৮-১৮৫০) বিভিন্ন সময়ে পূর্ববঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী, চা-বাগানের শ্রমিক, জঙ্গল কাটা, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাচি, মাদ্রাজ ও আসাম থেকে হিন্দি, উড়িষ্যা, দেশওয়ালী ও তেলেগু ভাষাভাষী মানুষের পূর্ব-পুরুষদের বুঝায় যাদের এদেশে নিয়ে আসা হয়েছিল। অভাবি এই অভিবাসীরা বাংলাদেশের সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং সিলেটে চা-শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ভূমিহীন ও নিজস্ব বসতভিটাহীন এসকল সম্প্রদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সরকার প্রদত্ত জমি, রেলস্টেশনসহ সরকারি খাস জমিতে বসবাস করছেন। তারা সমাজে অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের শিকার।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব রায় চৌধুরী বলেন- বাংলাদেশের একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠির নাম দলিত সম্প্রদায়। দলিত সম্প্রদায়ের লোকজনদের নির্দিষ্ট কিছু কাছে নিয়োগ করা হয়। তাদেরকে মূলত ঝাড়– দেয়া, বাথরুম পরিস্কার করানো, জুতা সেলাই এ ধরনের কাজে বেশি নিয়োগ দেয়া হয়। এই সম্প্রদায়ের লোকজন লেখাপড়া করলেও সম্প্রদায়গত কারণে তারা ভাল চাকুরি পায় না। তাদের দ্বারা যে কাজ করানো হয় অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনকে দিয়ে সে কাজ করানো হলে তাকে অনেক বেশি পারিশ্রমিক দেয়া হয়। কিন্তু দলিত সম্প্রদায়ের শ্রমিককে সেই অনুপাতে পারিশ্রমিক দেয়া হয় না। অর্থাৎ সমমর্যাদা তারা কখনোই পায়না। সমাজের লোকজন তাদের নিচু জাত হিসেবে গণ্য করে থাকে। যে কারণে অনেক সময় যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও তারা তাদের কাঙ্খিত কর্মক্ষেত্র পায় না।
তিনি আরো বলেন- বাংলাদেশ সরকার বৈষম্য কমিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু তার পরও সমতা আসেনি। সরকার চেষ্টা করলেও সবাই আন্তরিক না হলে বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তন আসবে। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি আমাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমাদেরও সহযোগিতার মনোভাব থাকতে হবে। তৃণমূল পর্যায় অর্থাৎ ইউনিয়ন পর্যায় থেকে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আর সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে বৈষম্য কমে আসবে।
নালুয়া চা বাগানের অধিবাসী আদিবাসী নেতা কপিল উড়াং বলেন- দলিত সম্প্রদায় বাংলাদেশের একটি অবহেলিত সম্প্রদায়। তারা শুধু নিরবে জাতিকে তাদের শ্রমের ফসল দিয়ে যায়। কিন্তু কাঙ্খিত মজুরী পায় না। তারা সব সময়ই বেতন বৈষম্যের শিকার হয়। এর মূল কারণ, অনেকের ধারণা স্বল্প বেতনে এদের দিয়ে কাজ করানো সম্ভব। এমন একটি মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী হয়েছে যে, দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন সমাজের উচ্চ শ্রেণির লোকজনের সাথে কখনোই খাপ খাইয়ে চলতে পারে না এবং অনেকে এদের সাথে সামাজিকভাবে চলাচলও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কটু বলে মনে করেন। তাই দলিত সম্প্রদায়ের সাথে মজুরী বৈষম্য কমাতে হলে সমাজের উপর মহলের লোকজনকে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। তাছাড়া দলিতদেরও তাদের দাবির প্রতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বোচ্চার হতে হবে। নতুবা তারা আজীবনই বৈষম্যের শিকার হবে।
মঈন উদ্দিন আহমেদ, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক হবিগঞ্জের মুখ, কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন হবিগঞ্জ জেলা শাখা, সহ-সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ সদর উপজেলা শাখা, ক্রীড়া সম্পাদক, হবিগঞ্জ প্রেসক্লাব, সদস্য, বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস্ মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments