সবিতার ইচ্ছা ছিল মুক্তিযোদ্ধা হবার

 Posted on

বিধান সরকার, অতিথি প্রতিবেদক, বরিশাল : মিলিটারীর ভয়ে বাবা মা পরিবারের অন্য সদস্যরা কে কোথায় গেছেন জানিনে। বিলে তখন গলা সমান জল। প্রাণ বাঁচাতে দুই বছর বয়সী ছোট ভাইকে কাঁধে নিয়ে বিলেই নেমে পড়ি। কিছুদূর যেতেই জল বেশী হওয়াতে ভাই বোন দুজনে মিলে জলে হাবুডুবু খাচ্ছি। মরন যন্ত্রণা কেমন ছিল আজো মনে পড়লে ভড়কে উঠি। এই অবস্থা দেখে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করেন ডুমুরিয়া গ্রামের নিশিকান্ত হালদার। এছাড়াও আরো দুবার মার খেয়েছেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে। তবে শিশু বলে দুবারই নিশ্চিত নির্যাতন আর মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন। ঘরে অগ্নি সংযোগ, বাড়ি ছাড়া, মায়ের সহযোগি শ্রমিক হয়ে এক সের খুদ মজুরী পাওয়া আর তাই দিয়ে ১৭ জনের আহার করা, এক বস্ত্রে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেয়া, এমন কষ্টের জীবন পাড় করতে হয়েছে দেশ স্বাধীনের যুদ্ধের সময়। মৃত্যুপুরি থেকে বেঁচে যাওয়ায় সেদিনগুলোর কথা বললেন ঝালকাঠি জেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের খাজুরা গ্রামের বিমল চন্দ্র মিস্ত্রীর কন্যা সবিতা মিস্ত্রী।

বাবা, মা আর ৪ বোন ও ২ ভাই মিলে তাদের সংসার। ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধে সবিতা ছিলেন ৭ বছরের শিশু। বাড়ন্ত গড়ন বলে বুদ্ধি বিবেচনা আর কাজের বেলায়ও এগিয়ে ছিলেন সমবয়সী শিশুদের চেয়ে অনেকটা। অবস্থাসম্পন্ন পরিবার। দোতলা বিশাল ঘর। ঝালকাঠীতে পাকিস্তানী সেনাদের ক্যাম্প বসানো হলে পরিবার নিয়ে চিন্তায় পড়েন সবিতার বাবা বিমল মিস্ত্রী। বড় বোন কানন বালা তখন সোমত্ত বলে তাকে নিয়েই ছিল পরিবারের বড় দুশ্চিন্তা। প্রথম দিকে কীর্তিপাশা বাজারের লোকজন তাদের এলাকায় আশ্রয় নিলেও পরবর্তীতে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে তাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত। তখন ৭ বছরের সবিতা আজ ৪৫ বছর পর স্মৃতিচারণ করলেও মনে আছে তাদের বাড়ি তখনো পোড়ায়নি পাকিস্তানী সেনারা। কোন এক বিকেল ৪টার দিকে তাদের বাড়ি পাশে গুলি হয়। মিলিটারী দেখে দরজা থেকে দৌড়ে বাড়িতে খবর দেয়। এসময় তারা বাবা বিমল চন্দ্র এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা বাড়ির পিছনে বিলে পড়ে সাঁতরে বাঁচেন। ২৫ জন নারী তখন বাড়ির জঙ্গলে পালিয়ে। সবিতাকে অনুসরণ করে পাকিস্তানী সেনারা বাড়িতে ঢুকে পড়ে। বুদ্ধির জোরে সবিতা পালিয়ে থাকা নারীদের জঙ্গলের পানে না গিয়ে অন্য পথ ধরেন। পাকিস্তানী সেনারাও তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে দৌড়ে গিয়ে সবিতার পেছন থেকে ঘাড় চেপে ধরে। ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠেন। আত্মা যেন খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায় তবুও চিৎকার দেননি পাছে মা সন্তানের কষ্ট দেখে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পড়েন। তাহলে নারীদের নিশ্চিত নির্যাতনের শিকার হতে হতো সেদিন। এমন সময় এটা মুসলমান বাড়ি বলে পরিচয় দিলে ৫ পাকিস্তানী সেনা তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

আষাঢ় মাসের প্রথম দিকে তাদের বড়িতে আগুন লাগানো হয়। পুকুরে ভেজানো কয়েক বস্তা ধান আর মুড়ির টিনে করে মাটির নীচে পুতে রাখা কিছু চাল ব্যাতীত সব পুড়ে ছাই হয়। আশ্রয়হীন হয়ে আশুলিয়ার বিলে গিয়ে আশ্রয় নেন পরিবার সমেত। তখন মা সুমা মিস্ত্রী আর দিদিমা সন্তোষ বালাকে দেখেছেন ৩টি কাপড় দুজনে মিলে পড়ে দিন পাড় করেছেন। সে বছর বৃষ্টি ছিল বেশ। কোনদিন মা স্নান সেরে কোন রকম শুকানো কাপড় পরেছেন, কোনদিন আবার ভিজে কাপড়েই থাকতে হয়েছে। ওসময় সবিতা একটি প্যান্ট পরেই মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। মিলিটারীদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় আবার খাবার ফুরিয়ে আসায় ডুমুরিয়ার ঢালি বাড়িতে ধান ভানতে যান মায়ের সাথে। পারিশ্রমিক পান এক সের খুদেচাল। তাদের ৯ সদস্যের পরিবার। খাবারের সময় অভুক্ত ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা এসে যোগ হলে ১৭ জন মিলে ১ সের খুদের জাউভাত খেয়েছেন। সবিতার বর্ণনায় ভাত ছিলনা যেন, কেবল থালা দেখা যাচ্ছিল। তার বড় ভাই বোনেরা ক্ষুধার জ্বালায় কান্নাকাটি করলেও তিনি ছিলেন অনেকটা নির্বাক। বাবা অবস্থা সম্পন্ন গেরস্ত, এর আগে কখনো অভাবের সম্মুখিন হতে হয়নি। এরপর জীবন বাজি রেখে বাবা বিমল চন্দ্র মিস্ত্রী বাড়ির পুকুরে ভিজানো ধানের বস্তা নিয়ে আসেন। ডোঙ্গায় ভেঁজে চাল বের করে জঠর জ্বালা প্রশমন করেন।

পালিয়ে জীবন ধারণ করার কোন একদিন খবর মেলে পাকিস্তানী হানাদারা আসছে। বাবা, মা, ভাই, বোন অন্য স্বজনরা কে কোথায় পালিয়েছেন কোন হদিস নেই। দুই বছর বয়সী ছোট ভাই বিনয় মিস্ত্রী তার সঙ্গী। পাশের প্রিয়নাথ মন্ডলের বাড়িতে আগুন দিয়েছে মিলিটারীরা। আগুনের ফুলকি এসে পড়ছে তাদের গায়ে। কি করবেন ভেবে কিনারা করতে না পেয়ে ছোট ভাইকে কাঁধে নিয়ে বিলের জলে নেমে পড়েন। কিছু দূর যেতেই জল বাড়ায় দু ভাই বোনই ডুবে যেতে থাকেন। তাদের হাবুডুবু অবস্থায় দেখে নিশিকান্ত হালদার জল থেকে তুলে জীবনে বাঁচান। মাকে নাপেয়ে ছোট ভাই কান্না জুড়ে দেয়। অবশেষে সেদিন রাত ৯টায় বাবা মার সন্ধান পান। এমন কষ্টের দিন পেরোনোর একদিন ছোট ভাইকে নিয়ে পালাতে গিয়ে দেখেন মাথার ওপরের জঙ্গলে সাপ ঝুলে আছে। ফোঁস ফোঁস করে নিচে নামছে আবার ওপরে ওঠছে এমনি ভাবে দোল খাচ্ছে। ঠান্ডায় শরীর হিম হওয়া অবস্থা সাপের ভয়ে। চিৎকার দিতে পারছেন না পাছে মিলিটারী ও দেশীয় রাজাকারদের কানে পৌঁছলে পালিয়ে থাকা লোকদের হত্যা করবে যে। এছাড়াও জীবন বাঁচাতে বেসাইনখান গ্রামের হাতেম আলি মোল্লাবাড়িতে আশ্রয় নিলে কালেমা শিখিয়ে দেন তারা। এক সকালে ওই বাড়ির বৃদ্ধা নানিমার সাথে মরিচ বাছাই করছিলেন সবিতা মিস্ত্রী। এক পাকিস্তানী সেনা ঘরে ঢুকেই সবিতার বাবড়ি চুল ধরে টেনে তুলে। মুখ থেকে মা বলে চিৎকার বেড়িয়ে এলেই পরক্ষণে মনে পড়ে আম্মা বলতে হবে যে, নতুবা হিন্দু বলে ধরে নিবে। সবিতা আম্মা বলে চিৎকার করতে থাকায় উঠোনে দাড়িয়ে থাকা আরেক পাকিস্তানী সেনা ছেড়ে দেয়ার জন্য ধমকে দিলে সে যাত্রায় রক্ষা পান সবিতা মিস্ত্রী।

সবিতার বর্ণনায় ওই কষ্টের দিনে শুনলেন, ঝালকাঠিতে পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্প থেকে প্রতি সপ্তাহে চাল ও গম দেয়া হয়। তখন দিদিমা সন্তোষ বালাকে নিয়ে মুসলমান পরিচয়ে ভাদ্র ও আশ্বিন এই দুই মাস রীতিমত চাল গম এনেছেন সবিতা মিস্ত্রী। আর যুদ্ধের সময় বাঁচার তাগিদে হিন্দু নারীরা শাঁখা আর সিঁদুর পড়া বাদ রেখেছিলেন। দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেতে যুদ্ধ থামার আগে বড় বোন কানন বালাকে বাবা ভারতে পাঠিয়ে দেন। দীর্ঘ ৯ মাস বর্ণনার বাইরেও অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তাদের। কথা বলার সময় পাশে থাকা বড় বোন কানন বালাকে দেখিয়ে বলেন, বাঁচার তাগিদে দিদি আমাকে আর ছোট ভাইকে ছেড়ে পালিয়েছিল। সবিতা অরো বলেন, যুদ্ধের শুরুর দিকে দু জন মুক্তিযোদ্ধা তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। পাকিস্তানী সেনাদের ভয়ে মা সমেত অন্য নারীরা পালানো ছিলেন। তাদের জন্য ভাত চাপিয়ে ছিলেন বটে, তবে ছোট বলে বাবা এসে ভাতের হাড়ি গড় দিয়েছিলেন। একটুকুন মেয়ের এমন আতিথেয়তা আর কর্মপটু দেখে এক মুক্তিযোদ্ধা বলেছিলেন-মনু তুমি আরেকটু বড় হইলেই তোমারে মুক্তিযুদ্ধে নিয়া যাইতাম। এই উক্তি সবিতার মনে প্রভাব বেশ ফেলেছিল। বহমান ওই রেশ ধরেই আমার সাথে কথা বলার সময় বয়সের কারণে মুক্তিযুদ্ধে যেতে না পারার অক্ষেপ ফুটে উঠেছিল সবিতা মিস্ত্রীর কথনে।

লেখকঃ বিধান সরকার, গল্পকার

Facebook Comments