শ্রমের ন্যায্য মূল্য বঞ্চিত চা-শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

 Posted on


মঈন উদ্দিন আহমেদ, হবিগঞ্জ : সমঅধিকারের কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হলেও আজও পুরুষ শাষিত সমাজে নারীদের বিশেষ করে দলিত নারীদের সামাজিক অবস্থান উপেক্ষিত। তারা সমাজে সমান মর্যাদা পাচ্ছেন না। পাচ্ছেন না তাদের শ্রমের ন্যায্য মজুরী। ফলে একজন নারী পুরুষের সমান শ্রম বিক্রি করেও শ্রমের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় তাকে সংসারে গøানির পাশাপাশি মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়।
এ ব্যাপারে বাহুবল উপজেলার মধুপুর চা-বাগানের শ্রমিক অনিতা মুন্ডা বলেন, “বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বিশেষ করে দলিত নারীদের অবস্থা নি¤œ পর্যায়ে। তারা পুরুষের সমান শ্রম দিয়েও মজুরী পান কম। ফলে নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে তাদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। তাছাড়া সমাজ ব্যবস্থায়ও দলিত নারীরা বৈষম্যের শিকার হন। শুধু তাই নয় নিজের স্বামীর কাছ থেকেও তারা নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতিনিয়িত।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। স্বপ্ন ছিল তাদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাগানে তিনি ও তার স্বামী চা পাতা চয়ন করে যে মজুরী পান তা দিয়ে সংসার চলে না। কোন রকম কষ্টে দিনাতিপাত করতে হয়। তার পরও সন্তানদের লেখাপড়া করানোর স্বপ্ন তাকে দমিয়ে রাখতে পারে নি। তিনি মনে করেন যদি তার শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করা হতো অর্থাৎ তিনি যদি তার শ্রমের সঠিক মূল্য পেতেন তাহলে হয়তো তাদের এত অভাব অনটন থাকতো না। তিনি তার এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অন্য মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। তিনি স্বপ্ন দেখেন তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন।

গণমাধ্যম কর্মী কাজী মাহমুদুল হক সুজন বলেন, বাংলাদেশের একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল চা। বিদেশে চা রপ্তানী করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। আর এ চা-শিল্পের সাথে যারা জড়িত তাদের প্রায় ৯৫ ভাগ দলিত সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়ের নারী পুরুষ বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই বাগানে কর্মব্যস্ত সময় পার করেন। কিন্তু তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। বিশেষ করে দলিত নারীরা বৈষম্যের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। বাগান এলাকায় মাদক গ্রহণের প্রবণতা বেশি। বাগানে বসবাসকারী শ্রমিকের পুরুষরা অনেকেই মাদক সেবনের সাথে জড়িত। এতে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পুরুষরা সারাদিন কাজ করে যা উপার্জন করে মাদক সেবনের পেছনে এর অধিকাংশই ব্যয় করে ফেলে। ফলে এর প্রভাব গিয়ে পড়ে নারীর উপর। সন্তানাদি নিয়ে সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়।

বাহুবল উপজেলার মধুপুর চা-বাগানের বড়গুল (সাতপাড়িয়া) বস্তির মতিলাল ভৌমিজ বলেন, “আদিম যুগের কৃষিকাজ থেকে শুরু করে বর্তমানের নির্মাণ সভ্যতার গড়ে ওঠার পেছনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অক্লান্ত শ্রম ও সাধনা রয়েছে। সংসার ও সন্তান পালনের পাশাপাশি এসকল নারী সভ্যতা নির্মাণে অংশগ্রহণ করলেও পুরুষের সমমর্যাদা তারা কখনোই পায় নি। শুধু নীরবে জাতিকে দিয়ে যায় তার শ্রমের ফসল। আর এ ক্ষেত্রে দলিত নারীদের অবস্থান সবথেকে নি¤েœ।”

গণমাধ্যম কর্মী আলাউদ্দিন আল রনি বলেন, “দলিত নারীদের জীবন সংগ্রাম আমাদের আন্দোলিত করে। বিশেষ করে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় ৫টি চা-বাগানে প্রতিদিন সকাল হলেই চোখে পড়ে শত শত নারী শ্রমিক দল বেঁধে চা-বাগানে যাচ্ছেন। কঠোর পরিশ্রমে এসকল নারীরা সকাল সন্ধ্যা বাগানে কাজ করেন। কিন্তু তারা বেশির ভাগই অপুষ্টিতে ভুগছেন। বাগানে ছোট্ট কুঁেড়ঘরে স্বামী সন্তান নিয়ে কোনো রকমে জীবন যাপন করেন নারী শ্রমিকরা। কোন নারী শ্রমিকই বাগানে অলস সময় কাটান না। যাদের বাগানে কাজ রয়েছে তারা ঘুম থেকে উঠে বাড়ির কাজ শেষে চলে যান বাগানে। দুটি পাতা একটি কুঁঁড়ি উত্তোলন করে উত্তোলিত পাতা মাথায় করে কারখানা অথবা ট্রাক্টরে করে পৌঁছান ফ্যাক্টরীতে। দুপুরের খাবারও সারতে হয় বাগানে। কিন্তু তারা যে খাবার খান তাতে কি পরিমাণ খাদ্যপ্রাণ অথবা পুষ্টিগুণ রয়েছে এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। ক্ষুধা মেটাতেই তারা খাবার গ্রহণ করে থাকেন। কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেন এসব নারী শ্রমিকরা। ক্লান্ত শরীর মলিন মুখ ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার দেহখানা নিয়ে ঘরে ফেরার পর আবারও শুরু হয় পারিবারিক কাজ। রাতের খাবার শেষে অন্ধকার ঘরে ঠাসাঠাসি করে ঘুমিয়ে পড়েন তারা। তার পরও অভাব অনটন তাদের নিত্য সঙ্গী।

মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া, সুরমা, জগদীশপুর, বৈকুণ্ঠপুর, নোয়াপাড়া চা-বাগানের নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা সকাল সন্ধ্যা রোদ বৃষ্টিতে চা-বাগানের ভিতরে কাজ করেন। কিন্তু স্বল্প মজুরীতে তাদের জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। চা বাগানের মালিক পক্ষ থেকে যেটুকু স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয় তা পর্যাপ্ত নয়। নারী শ্রমিকরা জটিল রোগে আক্রান্ত হলেও অর্থাভাবে তারা সুচিকিৎসা করাতে পারেন না। নারী শ্রমিকদের শুধু বাগানের কাজই নয় ঘরে এসে গৃহস্থালির কাজ রান্না বান্না সহ অন্যান্য কাজও করতে হয়। অনেকেই অনুযোগ করে বলেন- চা বাগানের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হয় এবং সরকারিভাবেও তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।

চা শ্রমিক নেতা নিমাই গোয়ালা বলেন- “বাগানের সবুজ বুকে নারী শ্রমিকদের চা পাতা তোলার ছবির সৌন্দর্য্যরে আড়ালে লুকিয়ে আছে যন্ত্রণা। বাংলাদেশের চা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের অর্ধেকের বেশি নারী। পাতা বা কুঁড়ি তোলার প্রধান কাজটিই করেন নারী চা-শ্রমিকরা। এর বাইরে নার্সারিতে চারা কলমের কাজ করেন তারা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারী শ্রমিকরা এই কাজ করে গেলেও কাজের ক্ষেত্রে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তার অনেক কিছুই তারা ভোগ করতে পারেন না। এই নারীরা অর্থ উপার্জন করলেও পরিবারে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই। কাজে পুরুষের সমান শ্রম দিলেও পারিশ্রমিক পান তাদের থেকে কম।”

চা-শ্রমিক অবিরত বাকতি জানান, সাতসকালে ঘুম থেকে তাদের উঠতে হয়। সংসারের কাজ করতে হয়। তারপর বাগান কাজে যেতে হয়। কেউ সকালে খেয়ে বের হন। আবার অনেকে বাটিতে খাবার নিয়েই ছুটতে হয় বাগানে। লাইনে (শ্রমিকদের বসতি) ফিরতে ফিরতে কারও রাত হয়ে যায়। ঘরে ফিরে আবার সংসারের কাজ। কাজের স্থানে নারী শ্রমিকদের জন্য কোনো শৌচাগারও নেই। বাধ্য হয়েই নারীরা খোলা জায়গা ব্যবহার করেন। পিরিয়ড বা মাসিকের সময় অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করেন বা অনেকে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর উপায় অবলম্বন করেন। বাগান নির্ধারিত মজুরি পেতে ২০ থেকে ২৫ কেজি পাতা তুলতে হয় একজন নারী শ্রমিককে। বাড়তি পাতা তুললে সামান্য কিছু টাকা বেশি পাওয়ার যায়। অনেক নারী চা-শ্রমিককে কাজের স্থান থেকে উত্তোলিত পাতা ওজন করে জমা দেওয়ার জন্য পাতার গাট্টি পিঠে করে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত দূরে যেতে হয়। রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে এ কাজ করতে হয়। এত বড় চা-শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন নারীরা। তা সত্তে¡ও চা-বাগানের নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত। চা-শিল্পের অগ্রগতি ঘটাতে হলে নারী চা-শ্রমিকের প্রতি সুদৃষ্টি দিতে হবে। তাঁদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কাজের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। নারীর সমঅধিকার, মর্যাদা, শ্রম-মজুরির বৈষম্য দূরীকরণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধান, কর্মযাত্রায় সম্মান ও ন্যূনতম বাঁচার অধিকার নারী শ্রমিকদের হয়রানি ও তাঁদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে।

মঈন উদ্দিন আহমেদ, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক হবিগঞ্জের মুখ। সহ-সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলা শাখা। কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন হবিগঞ্জ জেলা শাখা। সদস্য, বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments