শেরপুরের দলিত শিশুরা শিক্ষার্জনে এগিয়ে যাচ্ছে

 Posted on

মোঃ শরিফুর রহমান :: বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি -পেশা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তথা নির্বিশেষে সবার অধিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই সরকার সার্বজনীন শিক্ষানীতি গ্রহণ করে সমগ্র জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নি¤œ শ্রেণি র নি¤œআয়ের মানুষের সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলতে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে উপবৃত্তি চালু করেছে।
জাতীয় পর্যায়ে সবার জন্য শিক্ষায় দলিত জনগোষ্ঠীর ভাবনা শীর্ষক আলোচ্য নিবন্ধে দলিতেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে অবশ্যই শিক্ষার প্রযোজন রয়েছে। দেশ সমান তালে এগিয়ে যাক, দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষের জীবন মানের ও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটুক এটা এখন সময়ের দাবী। এ দাবীকে সামনে রেখে বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে। দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণে এখন নানা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলিতদের শিশুরা ক্রমান্বয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে, দেশের উন্নয়নে অংশ নিবে এ ক্ষেত্রে এখন আর কোন দ্বিমত নেই বটে।
পূর্বে দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের লেখাপড়া করার মতো কাছে বা নিকটে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলনা। থাকলেও সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলিত সম্প্রদায়ের সন্তান বলে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের সাথে মিশতে চাইতো না। যে কারণে অতীতে দলিতদের মাঝে শিক্ষার প্রচলন ছিলনা বললেই চলে। কিন্তু বর্তমানে দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন ঘটায় এবং সরকারী ও এনজিও গুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় দলিত জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক শিক্ষায় অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে। এই সম্প্রদায়ের পিতা-মাতারাও তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। যে কোন ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পেশায় কাজ করতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া সরকার দলিত বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের চাকরিতে কোটার ব্যবস্থা করেছে। কাজেই দলিত জনগোষ্ঠীর শুধু প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ করলেই চলবেনা- তাদের উচ্চ শিক্ষায়ও অংশগ্রহণ করতে হবে।
দেশে বর্তমানে যে হারে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তাতে দলিতদের বসবাস সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব মাত্র আধা কিলোমিটার থেকে সর্বোচ্চ এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। বলা যায় দলিত সংশ্লিষ্ট এলাকার চারদিকেই একই দূরত্বে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সুতরাং দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষা গ্রহণে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকার কথা নয়। যেহেতু সরকার বিনামূল্যে পুস্তক সরবরাহ, উপবৃত্তি প্রদান এবং শিশুদের স্কুলগামী করার ক্ষেত্রেও উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। কাজেই তাদের এই অবারিত সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষানীতিতে সকল শ্রেণি পেশা, বর্ণ-গোত্র বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন বৈষম্যের কথা বলা হয়নি। একই শিক্ষা কারিকুলামে সকল শিশুই শিক্ষা গ্রহণে সমান সুযোগ গ্রহণ করে থাকে। বিনামূল্যে পাঠ্য পুস্তক ও উপবৃত্তি দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্যও সমান প্রযোজ্য। তবে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যদি কোন দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে তাহলে তাকে সমাজ কল্যাণ বিভাগ শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করে থাকে।
তাছাড়া বিভিন্ন এনজিও থেকেও দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য দলিত সংশ্লিষ্ট এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দলিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। শেরপুর সদর উপজেলার বেতমারী, বলাইরচর, ভাটপাড়া, হাতি আলগা, নন্দীরবাজার, নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী, নকলা উপজেলার চন্দ্রকোণা, রামপুর, গৌড়দ্বার, নারায়নখোলা ও ধনাকুশাসহ অনেক এলাকতে দলিত জনগোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। উল্লেখিত এলাকা গুলোর সন্তানরাও বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখা পড়া করছে। শুধু তা-ই নয় এসব শিক্ষার্থীদের মাঝে নিকট অতীতে ম্যাজিস্ট্রেট, পল্লী চিকিৎসক, সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষকসহ স্থানীয় রাজনীতিতেও নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা দেখিয়েছে।
কাজেই উপসংহারে বলা যায়, জাতীয় পর্যায়ে সবার জন্য শিক্ষায় দলিত জনগোষ্ঠীর ভাবনা পূর্বের তুলনায় এখন আরও প্রখর হয়েছে। তারা শিক্ষায়, সভ্যতায়, অর্থনীতিতে, সামাজিকতায় এবং মানবতায় আরও সমৃদ্ধ হতে চায়, উন্নত হতে চায়। দেশ ও জাতির সেবায় নিবেদিত হতে চায়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে।
– মোঃ শরিফুর রহমান, দৈনিক সংবাদ ও একুশে টেলিভিশনের শেরপুর জেলা প্রতিনিধি ও শারি’র দলিত অ্যান্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সহ সভাপতি।

 

Facebook Comments