শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারের আন্তরিকতা চায় ভোলায় দলিত জনগোষ্ঠী

 Posted on

অচিন্ত্য মজুমদার ভোলা :: ভোলার দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুরা আগের চেয়ে অধিক হারে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দারিদ্র্য, সামাজিক অবজ্ঞা ও উপেক্ষার কারণে তাদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার অত্যাধিক। ফলে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত মানুষ খুবই নগন্য। গত ১০ বছরে দলিত জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৫জন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন ভোলা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার দে। তিনি আরও জানান, দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দলিত জনগোষ্ঠীর শতকরা ৮০জন ছেলেমেয়েই এখন স্কুলে যাচ্ছে। এটি আনন্দের সংবাদ হলেও ভীষণ হতাশার ব্যাপার হচ্ছে দলিত শিক্ষার্থীরা স্কুলে ভর্তির পর একটা পর্যায়ে এসে শতকরা ৭০ ভাগই ঝরে পড়ে। এর মূল কারণ হচ্ছে দরিদ্রতা। আর এ ঝরে পড়ার হার দলিতদের মাঝে উচ্চ শিক্ষার্থী কম থাকার অন্যতম কারণ। আবার যারা নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা পার করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়, তারা কেবল দলিত হওয়ার কারণে উপযুক্ত চাকরি পায়না। বিএ, এমএ পাশ করেও জাতিগত বৈষম্যের শিকার এসব তরুণ তরুণীদের বেকার থাকতে হচ্ছে। তাদের এই বেকারত্ব শিক্ষা গ্রহণের প্রতি দলিতদের নিরুৎসাহিত করছে। তিনি আরও জানান, ২০১৪ সাল থেকে দলিত হরিজনদের জন্য সরকার শিক্ষা বৃত্তি দেয়া শুরু করেছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ভোলা জেলার ৭ উপজেলায় অন্তত ৪০ হাজার দলিত পরিবার বয়েছে। এসব পরিবারের অন্তত ৫০ হাজার শিশু স্কুলগামী। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে সরকার থেকে প্রতিবছর জেলায় মাত্র ৬৪ জনকে শিক্ষা বৃত্তি দেয়া হলেও বাকিরা বঞ্চিত হয়েছে। এছাড়া সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে দলিত শিক্ষার্থীদের কোটা ভিত্তিক ভর্তির ব্যাপারে সরকারের নির্দেশ থাকলেও পরিপত্র না আসার অজুহাতে দলিতদের কোন ছাড় থাকে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে যুদ্ধ করে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা এসব সরকারি স্কুলগুলো থেকে সরকারের বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি এমন কোন কিছু আছে এটাও জানানো হয় না তাদের।
সরেজমিনে ভোলার বিভিন্ন দলিত ও হরিজন পল্লী ঘুরে জানা গেছে, এখানকার দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে দরিদ্রতা অত্যন্ত প্রকট। আর্থিক অসামর্থ্যেরে কারণে তারা ছেলেমেয়েদের শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারে না। ফলে ওই সন্তানেরাও দারিদ্রের চক্র থেকে বের হতে পারে না। বিভিন্ন এনজিওর ঋণ ও চড়া সুদের চক্রে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক দলিত স¤প্রদায়ের সদস্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলিত জনগোষ্ঠীর সন্তানরা ভর্তি হতে গিয়ে নানাবিধ তিক্ত অভিজ্ঞতাসহ অধিকার বঞ্চনার শিকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান দলিত জনগোষ্ঠীর সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে গিয়ে গোষ্ঠীর পদবী কিংবা নামের শেষ অংশ পরিবর্তন করতে উৎসাহিত করেন বা নাম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এমনভাবে পদবী পরিবর্তন করে দেয় যে, ঐ শিশুটিকে আর দলিত বলে চেনাই যায় না। এ কারণে পূর্ব অভিজ্ঞতার জের ধরে দলিত সম্প্রদায়ের অনেকে বাধ্য হয়ে আগে থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পদবি যেমন রায়, দাস ইত্যাদি গ্রহণ করছে। এছাড়া ভোলার দলিত সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। শহরের ডোম কলোনীতে দলিত শিশুদের জন্য একটি প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বেসরকারি একটি সংস্থার অর্থায়নে বিদ্যালয়টি তৈরি হয়েছে। তাদের অর্থায়নেই শিশুদের বই, খাতা, কলমসহ লেখা-পড়ার সকল খরচ চলে। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক জীবন চন্দ্র দে জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে ওই বিদ্যালয়ে দলিত শিশুদের শিক্ষার প্রথম স্তরটা তৈরি করে দেয়া হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৩৩জন শিশু অধ্যায়নরত রয়েছে। এর মধ্যে ২০জন ছাত্রী ও ১৩জন ছাত্র।
বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মানিক লাল ডোম জানান, জেলার ৭টি উপজেলায় প্রায় প্রতিটিতেই রয়েছে দলিত জনগোষ্ঠীর বসবাস। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দলিত জনগোষ্ঠীর পরিবারের পুরুষ ও নারীরা বেশির ভাগই অজ্ঞ। দরিদ্রতা আর শিক্ষার আলো না থাকায় দলিত স¤প্রদায়ের শিশুদের পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক নেই পরিবার প্রধানদের। তাই এই জনগোষ্ঠীর শিশুদের স্কুলমুখি করতে সরকারের আরও বেশি আন্তরিক হওয়া দরকার বলে তিনি জানান।
অচিন্ত্য মজুমদার, ডেইলি দি অবজারভার পত্রিকার ভোলা জেলা প্রতিনিধি এবং শারি’র দলিত ও মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments