শাহজাদপুরে রাজাকার পুত্র মুক্তিযোদ্ধা তালিকা হতে বাদ, সরকারি ভাতা ও সুবিধা গ্রহণ করায় শাস্তি দাবি

 Posted on


সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার এনায়েতপুরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শান্তি কমিটির নেতার ছেলে এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ বজলুর রশিদ ৭১-এ স্বশস্ত্র সংগ্রামে অংশ না নিয়ে হঠাৎ হয়ে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এ নিয়ে চরম বিতর্ক থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হবার সুবাদে নিয়েছিলেন সরকারি ভাতা ও রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা। অবশেষে এই আওয়ামী লীগ নেতা এলাকাবাসী তথা সকল মহলের জোরালো দাবী ও সর্বশেষ যাচাই-বাছাই কমিটির অনুসন্ধানে প্রকাশিত তথ্যে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। বাদ পড়েছেন তালিকা হতে। এ নিয়ে পুরো শাহজাদপুর ও এনায়েতপুর জুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। হচ্ছে মিষ্টি বিতরন। ধিক্কার জানিয়ে এলাকাবাসী দাবী তুলেছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করায় বজলুর রশিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের।

স্থানীয়রা এবং ১৯৭১ সালের নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১২ মে শাহজাদপুর উপজেলার এনায়েতপুর থানার জালালপুর ইউনিয়নে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট ইউনিয়ন পিস কমিটি গঠন করা হয়। ঐ কমিটির ১১ নম্বর সদস্য হচ্ছে বজলুর রশিদের বাবা জয়নাল আবেদিন। তিনি এলাকায় পাক বাহিনীর দালাল হিসেবে প্রত্যক্ষ ভাবে সহযোগিতা করেছেন। বজলুর রশিদ পরিবারের ৪ ভাই ৫ বোনের মধ্যে ছিল দ্বিতীয়। জালালপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে বজলুর রশিদের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১০ অক্টোবর। ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তখন ১৫ বছরের বজলুর রশিদ মূলত ছিল পার্শ্ববর্তী পাকড়াশী ইন্সটিটিউটের ৯ম শ্রেনীর ছাত্র। স্বাধীকার আন্দোলন সময় বাড়িতেই অবস্থান ছিল তার। বাবাকেই কাজে সহযোগিতা করতো সে। এলাকার কেউ তাকে কখনো মুক্তিযুদ্ধে যোদ্ধা হিসেবে দেখেনি। ৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান তালিকা মুক্তিবার্তায় (লাল বই) নেই কোন তার নাম। প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত সনদও নেই। তবে অসৎ উপায়ে ২০০৪ সালে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেট ভুক্ত হয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের সনদ নম্বর-ম ৭৬২৩, স্মারক নম্বর-১৫৫, তারিখ-২৭/১১/২০০২। ভাতা বই নম্বর-৩২৮।

তার নিজ গ্রাম সৈয়দপুর গিয়ে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বজলুর রশিদের বাবার বিতর্কিত কর্মকান্ডের কথা। তবে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে তার বাবা একটি গরু জবাই করে এলাকার সবাইকে খাওয়াইয়ে রক্ষা পান বলে জানা গেছে। দেশ স্বাধীনের পর অবস্থা বুঝে এরপর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজেকে আবদ্ধ করেন বজলুল রশিদ। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজে কর্মজীবন শুরু করে অধ্যক্ষ হিসেবে শেষ করেন। তিনি এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের বর্তমানে সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। কৌশলী এই মানুষটি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও অসামাজিকতার কারণে নিজের ব্যক্তিগত কর্মী গোছাতে পারেননি। এর আগে তার ভায়রা প্রয়াত এমপি অধ্যাপক শাহজাহানের সহযোগিতায় হয়েছিলেন এলাকার চেয়ারম্যান। মানুষের জন্য খুব একটা কাজ করেননি বলে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। ২০০৪ সালে হঠাৎ তার মুক্তিযোদ্ধা হবার বিষয়টি এলাকা জুড়ে বেশ সমালোচনার ঝড় বয়। এর মধ্যেই ২০১৩-১৪ অর্থ বছর হতে তিনি সরকারী ভাবে মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতা সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। সরকারি চাকরি কোটায় সন্তানের চাকরি নিয়েছেন। ভুয়া হিসেবে তার মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিলের জন্য এলাকার লোকজন এবং মুক্তিযোদ্ধারা ছিল প্রতিবাদী। কেন্দ্র, জেলা, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সহ প্রশাসনের কাছে প্রমাণপত্র সম্বলিত লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। গত ১ ফেব্রæয়ারি আবার মুক্তিযোদ্ধার যাচাই-বাছাই শুরু হলে বিষয়টি আবারো সবার সামনে উঠে আসে। বাছাই কালে বজলুর রশিদ তার যথাযথ মুক্তিযোদ্ধার প্রমাণপত্র দেখাতে না পারায় সে সহ শাহজাদপুরের ৭ জনকে বাতিল করে।

এ ব্যাপারে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মোহাম্মদ শামচুজ্জোহা জানান, বজলুর রশিদ সহ ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের তালিকা হতে বাদ দেয়া হয়েছে।
এদিকে বেআইনী ভাবে রাষ্ট্রীয় এসব সুযোগ-সুবিধা নেয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তি দাবী করেছেন ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার ও সৈয়দপুর গ্রামের বৃদ্ধ সমাজ-সেবক মজিবর রহমান, হাজী আবুল কালাম জানান, বজলুর রশিদ সহ তার পরিবারের কেউ মুক্তিযোদ্ধা তো দূরের কথা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেও কাজ করেনি। আমরা বার-বার বলে আসছি। এবার তা সত্যি প্রমাণ হলো। রাজাকার পুত্র মুক্তিযোদ্ধার তালিকা হতে বাদ পড়েছে। কলংক মুক্ত হয়েছি আমরা। তারা দাবী করে জানান, অন্যায় ভাবে সে রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিয়েছে এজন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করার পাশাপাশি এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের পদ থেকেও তাকে বহিঃস্কার করতে হবে।

এ ব্যাপারে বজলুর রশিদ জানান, আমি শুনেছি আমাকে তালিকা হতে বাদ দিয়েছে। তবে এখনো চিঠি পাইনি।

Facebook Comments