লোকসানে সরকারকে চাল দিতে চাচ্ছেনা চালকল মালিকরা

 Posted on

রাজু আহমেদ:
আমন মৌসুমে সরকারি গোডাউনে চাল সরবরাহের জন্য খাদ্য বিভাগের সাথে মিলাদের চুক্তি শেষ দিন ছিল ২৬ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার)। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জেলার পাঁচ শতাধিক মিল মালিকের কেউই চুক্তি করেননি। এ অবস্থায় আমন চাল সংগ্রহ শুরু করার আগেই বড় ধাক্কা খেলো খাদ্য বিভাগ। কুষ্টিয়া জেলায় এ বছর আমন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছিল ২৯ হাজার মেট্রিক টন। আর ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার হাজার মেট্রিক টনের সামান্য বেশি। এর আগে শতাধিক মিল মালিক আগ্রহ দেখিয়ে আবেদন করলেও লোকসানের হাত থেকে বাঁচতে এবার চুক্তি থেকে সরে এসেছেন মিলাররা। তবে আগামী ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চুক্তির সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হয়তো চাল কল মালিকদের সাথে খাদ্য অফিসের চুক্তি সম্পন্ন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস এম তাহসিনুল হক।

এদিকে কুষ্টিয়ার চাল কল মালিকরা জানান, বাজারে ধানের মূল্যের সঙ্গে চালের মূল্য সামঞ্জস্য করতে হবে। ধানের সঙ্গে চালের বাজারমূল্য সমন্বয় করে দিলে তবেই সরকারের ঘরে চাল সরবরাহ করা হবে। ধানের বাজারে দাম ভালো। এবার কৃষক ভালো দাম পেয়েছেন। কিন্তু সরকার নির্ধারিত ৩৭ টাকা মূল্যে চাল সরবরাহ করব না। এজন্য কোনো চালকল মিল মালিক সরকারের সঙ্গে চুক্তিতে যাবে না, যেতে আগ্রহী নয়। সরকারকে সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনে লাভ না হলেও বর্তমান বাজার অনুযায়ী চালের দাম দিতে হবে।

জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বোরো মৌসুমে সময় বাড়িয়েও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। সে সময় ৩৪ হাজার মেট্রিকটন চাল কেনার জন্য মিল মালিকদের সাথে চুক্তি হলেও ২৬১ মিল মালিক চাল দিতে ব্যর্থ হয়। এর বাইরে আরও অনেক মিল মালিক চুক্তির পর ২০ থেকে ৪০ ভাগ চাল দিয়ে আর বাকি চাল দিতে পারেনি। বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সংগ্রহ কিছুটা কম হলেও এবার আমন মৌসুমে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।

কুষ্টিয়ার মিল মালিকরা জানান, বোরো মৌসুমে বেশিরভাগ মিল মালিক লোকসান দিয়ে চাল সরবরাহ করেছিলেন। অনেকেই পাঁচ থেকে দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লোকসান দেয়। আর আমন মৌসুমে দেশে মোটা ধানের অবাদ ও উৎপাদন বেশি হয় । অন্যান্য বছরে ধানের মণ প্রতি বিক্রি দর ৬৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। আর এবার বিক্রি হচ্ছে হাজার টাকার উপরে। নতুন ধান কিনে চাল উৎপাদন করতে খরচ পড়ছে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা। মিল মালিকদের দাবি অনুযায়ী সরকার প্রতিকেজি চালের দর নির্ধারণ করেছে ৩৭ টাকা। সেখানে ৪০ টাকা কেজি চাল উৎপাদন করে সরকারি গোডাউনে দিলে কর্তৃপক্ষকে তিন টাকা লোকসান গুনতে হবে। গতবার লোকসান দিয়ে সরকার থেকে কোন প্রণোদনা না পাওয়ায় এবার কেউ চাল দিতে চাচ্ছেন না। এ কারণেই মিল মালিককরা চুক্তি করেননি।

এবিষয়ে জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান বলেন, সরকারের সাথে মিল মালিকদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে বেশিরভাগই মিল মালিক চাল না দেওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন। আর চাল দিলে চুক্তি অনুযায়ী ২০ ভাগের বেশি চাল দিতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। এখন সরকার থেকে সিদ্ধান্ত আসলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মিল মালিক সমিতির নেতারা জানান, এক মৌসুমে লোকসান হলে অন্য পুষিয়ে যায়, তবে এবার তা হচ্ছে না। নতুন ধান উঠলেও বাজার কমার কোন সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় সরকার ধান ও চালের যে দর নির্ধারণ করেছে তাতে কোনো মিল মালিক চাল দিতে পারবে না। বাইরে খোলা বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজি দরে। সেখানে কি করে ৩৭ টাকায় সরকারকে কিভাবে চাল দিব।

বৃহস্পতিবার (২৬ নভেম্বর) সরকারের সাথে চুক্তির শেষ দিন ছিল। শেষ দিন পর্যন্ত একজন মিলন চুক্তি করেননি। এমন পরিস্থিতিতে গত পাঁচ বছরের মধ্যে পড়তে হয়নি খাদ্য বিভাগকে। কুষ্টিয়া জেলার ৬টি উপজেলায় খাদ্যগুদাম রয়েছে ৮টি। এর মধ্যে কুষ্টিয়া সদরে দুইটি এবং মিরপুরে দুইটি খাদ্যগুদাম আছে, বাকি উপজেলাগুলোতে একটি করে খাদ্যগুদাম আছে। গত বোরো মৌসুমে যে চাল কেনা হয়েছিল তার বেশিরভাগই এ জেলা থেকে অন্য জেলায় পাঠানো হয়েছে। যার ফলে খাদ্যগুদামগুলো এখন প্রায় ফাঁকা। আমন মৌসুমে চাল কিনতে না পারলে এসব গোডাউন ফাঁকাই পড়ে থাকবে। তাতে সরকারের যে সামাজিক কর্মসূচি চলছে তার উপরে ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে জানা গেছে।

লিয়াকত রাইস মিলের মালিক লিয়াকত হোসেন বলেন, আমরা এবার খোঁজ নিয়ে দেখব বরাদ্দ কত এসেছে। গত মৌসুমে অনেক লোকসান হওয়ায় এবার আগ্রহ নেই। আর সরকার নির্ধারিত মূল্য বাজার মূল্যের থেকে অনেক কম।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, তারা দফায় দফায় জেলার মিলাদের সাথে বৈঠক করেছেন। ফোনে অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছেন। তারপরও চুক্তি করতে রাজি হচ্ছেন না মিল মালিকরা। আগে শতাধিক মিল মালিক আবেদন নিলেও পরে আর কোন যোগাযোগ করেননি। তারা খাদ্য অফিসমূখী হচ্ছেন না। এই অবস্থায় আমাদের কিছু করার নেই।

তিনি আরও বলেন, জেলায় এবারের মৌসুমে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ৩১৫ মেট্রিক টন। আর সদরে ছিল ২২ হাজার ১২ মেট্রিক টন। একজন মিলার ও এখন পর্যন্ত চুক্তি করেন নাই। তাই চাল কেনা এবছর কোন অবস্থায় দাঁড়াবে তা বলা যাচ্ছে না।

কুষ্টিয়া চাল কল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সামাদ বলেন, মিল মালিকরা এবছর চুক্তি করতে আগ্রহী হচ্ছে না। তাদের সাথে নানাভাবে কথা বলেছি। তারপরও চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে মিল মালিকরা সরকারের পাশে দাঁড়াই।

এবিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম তাহসিনুল হক বলেন, মিল মালিকদের সাথে চুক্তির বিষয়ে যোগাযোগ হচ্ছে। প্রায় ৫০টি মিল মালিক আমাদের চাল ও ধান দিতে চেয়েছে। কিন্তু চুড়ান্তভাবে তাদের সাথে চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। আগামী ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চুক্তির সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হয়তো তাদের সাথে আমাদের চুক্তি হয়ে যাবে।

Facebook Comments