রাজবাড়ীতে বেশির ভাগ দলিত শিক্ষার্থী আর্থিক অনটনের কারণে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোতে পারে না

 Posted on

সোহেল রানা :: দলিত জনগোষ্ঠীর আর্থিক অনটন, আবাসন সমস্যাসহ যেন লেগেই থাকে নানা সমস্যা। তবুও ইচ্ছা শক্তিতে সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার আশা বুক ভরা। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাতে দিলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোতে পারে না বেশির ভাগ শিক্ষার্থী।রাজবাড়ী পৌর শহরের দৌলৎদিয়া- পোড়াদাহ রেলওয়ে ষ্টেশন ঘেষে সরকারী জমিতে গড়ে ওঠা বিবেকান্দ্র হরিজন পল্লী। অনেকেই সরকারী কোয়াটারে মাসিক ভাড়া দিয়ে বসবাস করেন। আবার অনেকে এনজিও থেকে ঋন নিয়ে ও বিভিন্ন উপায়ে পাটকাঠি, টিনসেড ঘর উত্তোলন করে স্ত্রী, সন্তান, মাতা-পিতা নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। নিজের জমি না থাকার ফলে আবাসন সমস্যা তাদের অন্যতম। তাদের বেশির ভাগ পরিবারের সদস্যদের প্রধান আয়ের উৎস সামান্য বেতনে পৌরসভায় চাকুরী। সামান্য বেতনে জীবন ও জীবিকার চাহিদা মেটানো দুষ্কর। সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে, সরকারী অন্যান্যে সুযোগ সুবিধার ন্যায্য দাবীর হিস্যা না পাওয়ায় তারা নিজ উদ্দ্যোগে গড়ে তুলেছেন একটি সমবায় সমিতি। এ বিবেকান্দ পল্লীর শিশুরা অল্প সংখ্যক ৫বছরে বয়সে ও বেশির ভাগ শিশু ৬ থেকে ৭বছর বয়সে স্কুলে যায়। বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের রাজবাড়ী জেলা শাখার সভাপতি বাসুদেব মন্ডল জানান, রাজবাড়ী বিবেকন্দ্র পল্লীতে প্রায় ৮৫টি হরিজন পরিবারের ৯শত লোকের বসবাস। এদের মধ্যে ১১জন কলেজে, ১৪জন হাই স্কুলে, ৭জন শিশু শ্রেনীতে ও ৫০জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। বেশির ভাগ ছেলে মেয়েরা ৭ম শ্রেনী থেকে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখা করে ঝড়ে পড়ে। প্রায় ৬৫জন পৌরসভায় ১৩ শত টাকা থেকে ২৭শত টাকা বেতনে চাকুরী করে। তাও আজ বঞ্চিত হচ্ছে। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার পৌরসভার রেলওয়ে ষ্টেশনের কোল ঘেষে আদিকাল থেকে রেলওয়ের সরকারী জমিতে খুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করে আসছে ৬টি ডোম পরিবার। এ পরিবারগুলোর মধ্যে ৪জন গোয়ালন্দ পৌরসভায় ১৮শত টাকা বেতনে চাকুরী করে। কেউ আবার লেখাপড়া শিখে পরিবারের সদস্যদের মুখে দু,বেলা খাবার পৌছে দিতে পাড়ি জমিয়েছে রাজধানী ঢাকায়। এখানে বসবাসকারী রতন ডোম ও তার স্ত্রী ঝর্না ডোম। তাদের ঘরে ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে। ছেলে হিরা ডোম একটি প্রকল্পে মাষ্টারোলে চাকরী করে। বিশাল ডোম আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। মেয়ে একজন বিয়ে হয়েছে আর অন্য ২জন শান্তনা গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে। অন্তরা ডোম ব্র্যাকের ৫ম শ্রেনীতে পড়ার পর বাদ দিয়েছে অর্থাভাবে। দুলাল ডোম বাড়ীতে থাকে আর স্ত্রী মুন্নী ডোম ১৮শত টাকা বেতনে পৌরসভায় কাজ করে। তাদের একমাত্র সন্তান মুন্না ডোম গোয়ালন্দ আইডিয়াল একাডেমীর ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। পলাশ ডোম বেকার। তার স্ত্রী মিনা ডোম পৌরসভায় কাজ করে। ২সন্তান। বড় পুত্র জয় কিন্ডার গার্টেনের বেবি শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। রংলাল ডোম ও তার স্ত্রী সাধনা ডোম এখন বেকার। তাদের ৩ ছেলে ও  ২মেয়ে। ছেলে রাজা ওরফে সাগর ডোম ঢাকার একটি হাসপাতালে ৫হাজার টাকা বেতনে চাকুরী করে। আর মানিক ও বাদশা ডোম ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করে বাদ দিয়েছে। ২ মেয়ে একজনের বিয়ে হয়েছে আর অন্যজন ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করে এখন বাড়ীতে রান্নার কাজ করে। স্বাধীনতার পুর্বে অনেক সম্পদশালী ও বিত্তবৈভব থাকলেও স্বাধীনতা পরবর্তী দেশে ফিরে পথের ফকির। ৭১-এ ভিটে-বাড়ী ফেলে ভারতে পাড়ি জমালে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বসতবাড়ী। ফলে পুর্ব পুরুষের জমির দলিলাদি আর দেশে ফিরে তাদের জমি ফেরৎ পায়নি। জমি চলে যায় ভুমিদস্যুদের দখলে। এখনও কিছু জমির কাগজপত্র থাকলেও দখলে নিতে সাহস পাচ্ছে না রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গাহাতি মোহন গ্রামের হরিজন জনগোষ্টি। তারা এখন নিঃস্ব ভাবে কালুখালী- ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ের জামালপুর ষ্টেশন সংলগ্ন খন্ড খন্ড জমিতে বসবাস করছেন। জামালপুর বাজার সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করলেও তাদের ঘরে জোটেনি বিদ্যুতের আলো। ভাঙ্গাচোরা ঘরে রাতে ঘুমিয়ে ফাঁকা দিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুতের আলো। এদের বেশির ভাগ লোকই হাটে-বাজারে জুতা সেলাই করে সংসার চলে। আয় কমে যাওয়ায় অনেকে এখান থেকে চলে গেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।এখানে ১১টি পরিবারের বসবাস। এদের মধ্যে সহিতার ৩ ছেলে ১ মেয়ে। ছেলে কমল দশম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করে অর্থাভাবে পড়ালেখা বাদ দিয়ে বাবার সাথে জুতা সেলাইয়ের কাজে যোগ দিয়েছে। হৃদয় সপ্তম শ্রেনীতে ও জয় তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ালেখা করছে। মেয়ে বৃষ্টি গোয়ালন্দে মামা বাড়ীতে থেকে ৯ম শ্রেনীতে পড়ালেখা করছে। তার স্ত্রী মিরা বাড়ীতে রান্নার কাজ ছাড়া কিছু করতে পারেনা। মানিকের ২ মেয়ে, ২ ছেলে। পিয়াংকা ৭ম শ্রেনীতে ও পুর্নিমা ২য় শ্রেনীতে পড়ে আর ছেলে পাপ্পন ২য় শ্রেনীর ছাত্র। শ্যাম কিশোরের ১ ছেলে ,১ মেয়ে।  মেয়ে ডলি  ২য় শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। দেবদাস সপ্তম শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। এরাই যে স্কুলে গিয়ে তাদের লক্ষে পৌছাতে পারবে সেরকম ভাবে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। তবে একটু বড় হলেই বাবার সহযোগিতা করলে সংসার ভালো ভাবে চললেই তারা খুশি।সমাজে সকল শ্রেনী পেশার মানুষের মতো সকল সুযোগ সুবিধা নিয়ে বেচে থাকার পাশাপাশি ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে চায় রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার পৌর শহরের ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্ধা ডোম পরিবারগুলো। আদিকাল থেকেই তাদের পুর্বপুরুষরা পাংশা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড নারায়নপুরে বসবাস করে আসছেন। অনেক পরিবারই শহর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জীবিকার তাগিদে বেড়িয়ে গেছেন। পুর্ব পুরুষের ভিটাবাড়ী বিক্রি করে অন্যত্র বাসস্থান গড়ে তুলেছেন। তাদের পেশাও অনেকেই বদলে ফেলেছেন। পাংশা পৌরসভার নারায়নপুরে এখন বসবাস করে ৪টি পরিবার। ৪টি পরিবারের সদস্য সংখ্যা ২২জন। ২২ সদস্যের মধ্যে ২জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পা রেখেছে সবেমাত্র। দিলীপ সরকার ও পিটুয়া সরকার জানান, তারা অবহেলিত, সরকারের কাছে দাবী ডোম সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিশেষ বরাদ্ধ ও সরকারী চাকুরীতে কোঠা প্রথা চালু করা। তাহলে তাদের সন্তানরা লেখাপড়ায় আরো সচেষ্ট হবে।রাজবাড়ী জেলার পাংশা পৌর শহরের ৯নং ওয়ার্ডের মৈশালা-মাগুরাডাঙ্গী গ্রামে আদীকাল থেকে গড়ে ওঠে ঋষি পল্লী। এ পল্লীতে ৩৭টি পরিবার বসবাস করে। জনসংখ্যাও কম নয়। ছোট-বড় দিয়ে প্রায় ৩শতাধিক জন রয়েছে। পুর্ব পুরুষের আমল থেকেই তারা এখানে ঘাটি গেড়ে বসবাস করছে। পৌর শহরের মধ্যে বসবাস হলেও এখানে কোন উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি। ঋষি পল্লীর মধ্যে কেউ কেউ জমি অন্যত্র বিক্রি করার কারনে অনেকে বড় বড় ভবন তুলেছে। ফলে ঋষিদের কুড়ে ঘর গুলো যেন চোখে পড়ার নেই। পুর্ব পুরুষেরা আদীকাল থেকেই যে পেশায় সম্পৃক্ত ছিল তারাও সেটা ধরে রেখেছে। তবে দিনবদলের সাথে সাথে তাদের সচেতনতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি পরিবারের ছোট ছেলে মেয়েরা স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করছে। কলেজ পা রেখেছে জীবন দাস , পাংশা বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী প্রতিমা দাস , মৈশালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্র পার্থ দাস। এখানে বেশির ভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে।  রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলা সদর ইউনিয়নের পুর্বমৌকুড়ি গ্রামের ঋষিপল্লীর  বাসিন্ধারা। আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে ছেলেদের স্কুলে যাবার বয়স হলেও বেশির ভাগ পরিবারের সন্তানদেরকে যেতে হয় দু,বেলা দু-মুঠো ভাতের সন্ধানে। পড়ালেহা করে চাকরী ভাগ্যে জোটে না, তাই সংসার চালাতে ৮-১০ বছর বয়স হলেই কাজে গেলে যেতে হয়। এ পল্লীর বেশির ভাগ লোকই গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র তৈরীর কাজ করে। এমনিতেই বাশ-বেতের মুল্য চড়া হওয়ায় যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার পরিচালনা করা দুষ্কর। পড়ালেখার প্রতি অভিভাবকদের ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক অনটনের কারনে বেশির ভাগ ছেলে-মেয়েরা মাধ্যমিক পর্যায়ের আগেই ঝড়ে পড়ে। তাদের বেশির ভাগ পরিবারের সদস্যদের প্রধান আয়ের উৎস বাঁশ ও বেতের বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র, তেজসপত্র তৈরী করে বিক্রি করা। এ দিয়ে যে অর্থ আয় হয় তা দিয়ে সংসার পরিচালনা করতে হীমশিম খেতে হয়। এখন অনেকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে সেলুন, বাজারে কুলির কাজসহ অন্যান্যে কাজের প্রতি ঝুকে পড়ছে। এ ঋষি পল্লীর শিশুদেরকে কম সংখ্যক ৫বছরে বয়সে স্থানীয় ব্যাপিষ্ট স্কুল, ব্র্যাক স্কুল ও বেশির ভাগ শিশুদেরকে ৬ থেকে ৭বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫জন ছেলে , ১১জন মেয়ে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩জন ছেলে, ২জন মেয়ে, ব্র্যাক স্কুলে ২জন ছেলে, ২জন মেয়ে গমন করে। কলেজের বারান্দায় পা রাখতে পারেনি কেউ। তাদের পিতা-মাতাদের ইচ্ছা থাকলেও তাদের সাধ্যের মধ্যে কুলায় না ফলে সরকার সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করলেও তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি।পুর্ব মৌকুড়ি গ্রামের সচেতন ব্যাক্তি মিলন দাস জানান, ঋষি পল্লীতে ৩৩টি পরিবার বসবাস করে। ২শত লোকের বসবাস। এদের মধ্যে প্রায় পরিবারের সদস্য বাঁশ ও বেত দিয়ে তেজসপত্র তৈরী ও বিক্রি করে। আবার কেউ কেউ বাদ্য যন্ত্র বাজায়। এখন এ পেশা ছেড়ে বেশির ভাগ সেলুনের কাজে ঝুকে পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পরই বাদ দেয়। অনেকে স্কুলের বারান্দায় পা রাখার সুযোগ পায় না। বেশির ভাগ ছেলে মেয়েরা ৫ম শ্রেনী থেকে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখা করে ঝড়ে পড়ে। বাপ দাদার পেশা ছাড়া তাদের আর অন্য আয়ের উৎস নেই।  বার্তা প্রেরকঃ সোহেল রানা, সম্পাদক, রাজবাড়ী টাইমস ও শারি,র হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার, রাজবাড়ী।              মোবাইলঃ ০১৭১৭-৩০৯৮৭১।

Facebook Comments