যশোরে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে অবহেলিত দলিত জনগোষ্ঠী

 Posted on

\ এইচ আর তুহিন, যশোর \
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে একযোগে কাজ করছে সরকারের ২৮টি মন্ত্রণালয়। ১৪২টি কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত, অক্ষম এবং নিঃস্ব জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে ওই মন্ত্রণালয়গুলো। তবে যশোরে এর পরিপূর্ণ সুফল পাচ্ছে না দলিত জনগোষ্ঠী।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় সরকার বয়স্ক, বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত নারী, প্রতিবন্ধী, দুস্থ ও দরিদ্র অন্তঃসত্ত¡া নারী, চা বাগানের শ্রমিক, হিজড়া, দলিত ও ভবঘুরে সম্প্রদায় এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া দেশব্যাপী ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস), ভালনারেবল গ্রæপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি), ভালনারেবল গ্রæপ ফিডিং (ভিজিএফ), টেস্ট রিলিফ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) এবং প্রোগ্রাম ফর ফ্রেন্ডলি ফুডের মতো অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিও পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় মাসে ১০ লাখ অতিদরিদ্র নারীকে ৩০ কিলোগ্রাম করে চাল এবং আট লাখ অতিদরিদ্র মাকে মাতৃত্বকালীন ভাতা দিচ্ছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় ৩৫ উপজেলাতে দরিদ্র মানুষের মাঝে পুষ্টিকর চাল বিতরণ করছে।
সমাজসেবা বিভাগ (ডিএসএস) জানিয়েছে, চলতি বছর সরকার বয়স্ক ভাতা বাবদ ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ খাতে ৩৫ লাখ দরিদ্র মানুষ মাসে ৫০০ টাকা করে পাচ্ছেন। ১২ লাখ ৬৫ হাজার বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত নারীর জন্য ৭৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রত্যেক বিধবা নারী মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ৮ লাখ ২৫ হাজার প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ৬৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এখান থেকে প্রত্যেকে ৬০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ৮০ হাজার শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া চলতি বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সব কর্মসূচির ভাতা ১০ শতাংশ হারে বাড়িয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, প্রবাসী রেমিট্রন্স, তৈরি পোশাক খাতে বিপ্লব, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন ুপূরণের মাধ্যমে পরিসর বাড়ছে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক বর্তমানে দেশে নির্ভরশীল মানুষের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৫৪ ভাগ। ২০০২ সালে যার অনুপাত ছিল ৮০ জন। ২০১১ সালে এই অনুপাত নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪ জন। গত পাঁচ বছর ধরে এই অনুপাত ঘুরপাক খাচ্ছে সাড়ে ৫৫ ভাগে। সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মতে, দেশের বিরাট জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশের সম্পূর্ণ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
প্রসঙ্গত, দেশের নিম্নবর্ণের মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে না। সামাজিকভাবে তারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রেস্তোরাঁয় বসে নিম্নবর্ণের মানুষ খেতে পারছে না, ঘর থেকে চায়ের কাপ এনে চা খেতে হচ্ছে! তারা তাদের সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করতে পারছে না। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮ (১) ধারায় কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন না করার কথা বলা হয়েছে এবং অনুচ্ছেদ ১৯ (১) ধারায় সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও এ অবস্থার উন্নতি না হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
দেশের দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি অংশ বাঙালি। এরা সাধারণত গ্রামীণ জনপদেই বসবাস করছে। এদের মধ্যে ঋষি, মুচি, ধোপা, পাড়ই, কাওরা, বেয়ারা, নিকারি, শিকারি, কাপালি, পোদ, কলু, চামার, বাউরি, বাগদি, নম, শিয়ালি, কৈবর্ত, কাহার, কেশরা, নলুয়া, ধানি, বাগল, বাছাড়, মেছো, কোটাল, চণ্ডাল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আরেকটি অংশ ১৮৩৫-৫০ সালের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে নগর পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য ব্রিটিশরা তাদের এনেছিলো। এরা হরিজন সম্প্রদায় নামে পরিচিত। এদের মধ্যে রয়েছে বাশফোর, হেলা, ডোম, ডোমার, রাউত, লালবেগী, বাল্মিকী, হাড়ি ইত্যাদি। দেশে প্রায় এক কোটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৫ লক্ষ হরিজন সম্প্রদায়ের। এসব শ্রেণি-পেশার লোকজন অর্থনৈতিকভাবে হতদরিদ্র প্রকৃতির। সামাজিকভাবে অবহেলিত। রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত। শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। ধর্মীয়ভাবে ঘৃিণত। এসব শ্রেণির নারীদের অবস্থা অবর্ণনীয়।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির ১০০টিরও বেশি প্রকল্প রয়েছে। পাঁচটি মন্ত্রণালয়— স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ভিত্তিতে তাদের কর্ম পরিকল্পনা এবং কিভাবে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যায় সেটা ঠিক করবে। এখানে সমন্বয় কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমন্বয়হীনভাবে কাজ করলে কোনো প্রকল্পের পূর্ণ সফলতা আশা করা যায় না। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের শক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এসব প্রকল্পে দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কমিটিতে দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
এইচ আর তুহিন, বার্তা সম্পাদক, প্রতিদিনের কথা ও যশোর প্রতিনিধি প্রতিদিনের সংবাদ এবং বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments