ময়মনসিংহে বৈশাখী উৎসবের মেলার মৃৎ কারিগররা বদলে ফেলেছে পেশা

 Posted on

আতাউর রহমান জুয়েল,ময়মনসিংহ :: বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাঙ্গালীর সার্বজনীন উৎসবের নাম। আর এ উৎসব এখন ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙ্গালীর সব শ্রেণী পেশার মানুষের মিলনমেলায় রুপ পায়। আর এ থেকে বাদ যাচ্ছেনা ময়মনসিংহের দলিত জনগোষ্ঠির মানুষেরাও। তবে যাদের হাতের ছোঁয়ায় বৈশাখী মেলায় মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র পাওয়া যায় দলিত সম্প্রদায়ের সেই মৃৎ কারিগররা তাদের বাপ দাদার পেশা বদলে ফেলেছে। এখন তারা নানা পেশায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে জীবন সংসার পার করছে। এদের মধ্যে ময়মনসিংহের দলিত সম্প্রদায়ের পাল গোত্রের লোকজন আর মৃৎ কাজ করছে না। তারা পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছে। তাই এখন ময়মনসিংহের শহর ও শহরতলীতে উদযাপিত বৈশাখী মেলায় মাটির তৈরি খেলনাসহ তৈজসপত্র আনতে হচ্ছে পার্শ¦বর্তী জেলা শেরপুর, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াসহ উত্তর অঞ্চল থেকে। মৃৎ কারিগররা বলছেন, সহজ লভ্য প্লাস্টিক সামগ্রী বাজারে আসার কারণে মাটির তৈরি জিনিসপত্র আর প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে তারা পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এখন তারা এখন অনেকটা ভালভাবেই জীবন অতিবাহিত করছেন বলেও জানান।

ময়মনসিংহ সদরের বলাশপুর পালপাড়ায় এখনও প্রায় শতাধিক পরিবারের ৫ শতাধিক জনগোষ্ঠি বসবাস করছেন। এদের একমাত্র পেশাই ছিল মাটির তৈরি মূর্তিসহ নানা জিনিসপত্র তৈরি করা। গত ৫ বছর ধরে পালপাড়ার দলিত সম্প্রদায়ের মৃৎ শিল্পীরা তাদের বাপ দাদার পেশা বদলে ফেলেছে। পালপাড়ার সুবল চন্দ্র পালের স্ত্রী ষাটোর্ধ কেনান রানী পাল বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সাথে মৃৎ শিল্পের কাজ করেছেন। গেল ৫ বছর ধরে ওই পালপাড়ার সবার মতোই তিনিও মৃৎ শিল্পের কাজ ছেড়ে দিয়ে এখন তিনি সূচি শিল্পের নকশীকাঁথা সেলাইয়ের কাজ করছেন। কেনান রানীর মতো ওই এলাকার অনেক নারীই এখন সূচি শিল্পের সেলাই কাজ করছেন। এই সেলাই কাজ করে মাসে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা উপার্জন হয় জানান তিনি। কেনান রানী পাল বলেন, এখন আর কেউ পালপাড়ায় মাটির তৈরি জিনিসপত্র তৈরির কাজ করছে না। প্লাস্টিক সামগ্রী বাজারে সহজলভ্য হওয়ায় মাটির তৈরি জিনিসের আর তেমন একটা কদর নেই। পহেলা বৈশাখে মেলা আসলে আগে তারা মৌসুমে ৪০ থেকে ৫০টি ধরণের নানা জিনিস তৈরি করতেন। মেলায় সেগুলো বিক্রি করে যে আয় হতো তা দিয়ে সারা বছর তাদের চলতে হতো পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। এ জন্য তাদের খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হতো। এই কাজ ছেড়ে দিয়ে সেলাইয়ের কাজ করে এখন যে আয় হয় তা দিয়ে সুন্দরভাবেই তাদের সংসার চলছে। এখন আর সংসারে তেমন একটা অভাব নেই দাবি করেছেন কেনান রানী।

শুধু কেনান রানী না, পালপাড়ার মৃৎ কারিগরদের সবার একই কথা। তারা জানান, আগে মাটি দিয়ে তৈরি করা জিনিসপত্র বাজারে কিংবা মেলায় বিক্রি করে সংসার ভাল চলতো না। পাল পাড়ার আশি বছরের বৃদ্ধ নগেন্দ্র চন্দ্র পাল জানান, ৫ বছর আগে তারা মৃৎ শিল্পের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তখন তিনিসহ তার দুই পুত্রকে নিয়ে স্বর্ণ কারিগরের কাজ শিখেন। এখন তারা নিজেরাই একটি স্বর্ণালংকারের দোকান দিয়ে বসেছেন। তাদের দোকানে এখন অন্য কারিগররাও কাজ করে জীবন অতিবাহিত করছে। নগেন্দ্র চন্দ্র পাল জানান, ময়মনসিংহ জেলা এবং উপজেলার পালপাড়ার মৃৎ কারিগররা বাপ দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। তিনি আরও জানান, মৃৎ শিল্পীরা কেউ স্বর্ণ, অনেকেই বেকারীসহ বিভিন্ন কারখানায় কাজ করছেন। তবে এদের পুনর্বাসন কিংবা সহায়তায় সরকারী কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। অবেহলিত এসব পেশা ছেড়ে আসা মৃৎ শিল্পীদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেয়ার আহবাণ জানান তিনি। পালপাড়ার রঞ্জন পাল জানান, দলিত সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী হিসেবে সরকারী কোন সাহায্য কিংবা সহযোগিতা তাদের কোন কালেই জুটেনি। তাদের সাহায্যে সরকার এগিয়ে আসবে এটাই রঞ্জন পালের প্রত্যাশা। তবে পালপাড়ার দলিত জনগোষ্ঠীর মৃৎ শিল্পীরা পেশা বদল করলেও এবারের পহেলা বৈশাখের উৎসবে যোগ দিতে কার্পণ্য করেননি। এই জনগোষ্ঠির সব বয়েসি মানুষ এই দিনে আনন্দ উপভোগ করেছেন জানান তারা।

এদিকে পালপাড়ার সাবেক মৃৎ শিল্পীদের মতো ময়মনসিংহের হরিজন পল্লীর দলিত জনগোষ্ঠির মানুষেরা পয়লা বৈশাখের শুভ্র সকালে মন্দিরে শিতলা মায়ের পূজো সারেন। আর এই পূজোর পরই পহেলা বৈশাখের বাঙ্গালী উৎসবে সবাই যোগদান করেন। বৈশাখী মেলায় এই স¤প্র্রদায়ের শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়েসি মানুষ অংশ নেয় এবং কেনাকাটা করে থাকেন। এই দিনটির জন্য সবাই অপেক্ষা করে থাকে, কবে আসবে বৈশাখী মেলা।

হরিজন পল্লীর রিপন হরিজন জানান, এখন বৈশাখে মেলা ও আনন্দ উৎসব যেভাবে হয়ে থাকে আমাদের ছোট বেলায় এরকম ছিল না। শুধুমাত্র শিতলা মায়ের পূজো হতো। গেল ৮/১০ বছর ধরে পূজোর সাথে বৈশাখের প্রথম দিন আমরা সবার সাথে উৎসব পালন করে থাকি।

হরিজন পল্লীর বলদেব হরিজন জানান, পয়লা বৈশাখ এখন বাঙ্গালীর সব মানুষের বড় উৎসবে রুপ নিয়েছে। সবাই এই দিনে উৎসব পালন করে আনন্দ উপভোগ করে থাকে। এই দিন প্রত্যেকের ঘরে পোলাও মাংসসহ ভাল-মন্দ খাবারের আয়োজন থাকে। বাচ্চাদের জন্য নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়। এ ধরনের আয়োজন আগে ছিলনা।

রঞ্জন হরিজন জানান, নববর্ষের পয়লা বৈশাখে শিবমন্দির ও পঞ্চায়েত কমিটির মাধ্যমে হরিজন পল্লীর সবাইকে মিষ্টি মুখ করানো হয়। এই দিনে সবার সাথে দেখা সাক্ষাত হয় এতে করে আন্তরিকতার বন্ধন সুদৃঢ় হয়ে থাকে।

হরিজন পল্লী প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মুন্নী সরকার হরিজন জানান, অন্যবারের চেয়ে এবারের বাংলা নববর্ষ বেশি আনন্দঘন ছিল সরকার বৈশাখী উৎসব ভাতা দেয়ায়। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারী যারা আছেন তারা এই টাকা পেয়ে সন্তানদের জন্য ভালো কিছু কেনার সুযোগ পেয়েছে। ভালমন্দ খাওয়ার জন্য বাজার করতে পেরেছে। তাই সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি। তিনি আরও জানান, দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ বৈশাখে বাইরের পরিবেশে মেলাসহ বিভিন্ন উৎসবে আগে তেমন একটা যোগ দিত না। তবে ৫/৬ বছর ধরে আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষ তারা হরিজন পল্লী ছাড়াও মেলাসহ বিভিন্ন আয়োজনে যোগ দেয়া শুরু করেছে। এরফলে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে আমাদের সখ্যতা দিন দিন গড়ে ওঠছে। এই উৎসবটি সামাজিকভাবে দলিতদের জন্য বৈষম্য দূর হওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে বলেও মনে করছেন এই শিক্ষিকা।

আতাউর রহমান জুয়েল, একুশে টেলিভিশনের ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি ও শারি’র হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার।

Facebook Comments