ময়মনসিংহে গ্রামের চেয়ে শহরের দলিত শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষায় এগিয়ে : কেউ পাচ্ছে না সরকারি সুযোগ সুবিধা

 Posted on

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ :: ‘আজকের শিশুই, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’- আর এই শিশুদের লেখাপড়া করিয়ে শিক্ষিত করতে সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। তবে দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য এই বাধ্যবাধকতা খুব একটা কাজে আসছে না। তবে ইদানিং গ্রামের চেয়ে শহরের দলিত জনগোষ্ঠী তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করানোর ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে এখন অধিকাংশ শহরের শিশুরা প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করছে। সংসারের অভাবের কারণে বেশি দূর লেখাপড়া করাতে না পারলেও অনেকেই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। তবে দলিত জনগোষ্ঠীর সন্তানদের লেখাপড়া করানোর জন্য সরকারি বিশেষ কোন সুযোগ সুবিধা নেই। আর এসব শিশুদের জন্য নেই সরকারি উদ্যোগে কোন স্কুলের ব্যবস্থাও। নিজেদের উদ্যোগে প্রাইমারি স্কুল গড়ে তুললেও তা সরকারিকরণ হচ্ছে না।
এদিকে দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠতে হয়। এসব শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে নেই কোন সুযোগ সুবিধা। সেই কারণে দলিত স¤প্রদায়ের শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রটি খুবই জটিল। কেননা সরকারি সুযোগ ছাড়াও নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে মা বাবাদের যতটুকু সচেতন থাকা দরকার, সে ব্যাপারে দলিত সম্প্রদায়ের অভিভাবকরা ততটুকু সচেতন না। তাই তাদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
ময়মনসিংহ শহরের দলিত জনগোষ্ঠীর হরিজন পল্লীতে ১৯৮৯ সালে হরিজন পল্লী কমিউনিটি প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এটি এখনও সরকারিকরণ তো দূরের কথা রেজিস্টার্ড প্রাথমিকেও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রতিষ্ঠার ২৭ বছরেও স্কুলটির উন্নয়ন না হওয়ায় এখানকার দলিত জনগোষ্ঠীর লোকজন হতাশ।
স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মুন্নী সরকার জানান, স্কুলে নার্সারী থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। তারা আজ পর্যন্ত সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা পায় নি। শিক্ষার্থীরাও পায়না সরকারি উপবৃত্তির কোন সুযোগ সুবিধা। শিক্ষার্থীদের সামান্য বেতনের আয়ে ৪ জন শিক্ষক দিয়ে এই স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি না হওয়ায় শিক্ষকরা যেমন মানবেতর জীবন যাপন করছেন তেমনি অল্প বেতনে ভাল কোন শিক্ষক এখানে চাকরি করতেও চায়না। স্কুলটি দ্রæত সরকারিকরণের দাবি করলেন প্রধান শিক্ষিকা মুন্নী সরকার। তিনি আরও জানান, আগের তুলনায় দলিত জনগোষ্ঠী সন্তানদের লেখাপড়ায় বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছে। তবে গ্রামের দলিত জনগোষ্ঠী এই দিক থেকে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে। হরিজন পল্লীর রিপন জানান, এখানকার ৫/৬শ’ শিশুর মধ্যে ৯০ শতাংশই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। তবে প্রাথমিক স্তরের ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ৮০ শতাংশ, ৮ম পর্যন্ত ৫০ শতাংশ এবং এসএসসি-এইচএসসি ও উচ্চতর ডিগ্রী পর্যন্ত ১০ শতাংশ শিশু শিক্ষা লাভ করছে। বাকিরা ঝরে যায়। এসব শিশুদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা জানান রিপন। এর মধ্যে পারিবারিক অর্থনৈতিক সমস্যা, অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব, শিক্ষার পরিবেশ না থাকাকে দায়ী করেছেন তিনি। তিনি আরও জানান, হরিজন কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখনও সরকারি না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু পরিবেশে শিক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
একই এলাকার রাজা শিং শর্মা জানান, দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ সচেতন না হওয়ায় শিক্ষায় অগ্রসর হওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। বিশেষ করে বাবা-মা অভাবের সংসারে খরচ জোগাতে না পেরে অল্প বয়সের সন্তানদের তাদের পেশায় নিয়োজিত করছেন। ফলে শিশুরা যথাযথ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এখানকার শিশুদের জন্য নেই খেলাধূলার কোন ব্যবস্থা। তাই শিশুদের খেলার জন্য বাইরের পরিবেশে যেতে হয়।
গৃহবধূ সরস্বতী গোয়ালা জানান, তার দুই সন্তান একজন তন্ময় গোয়ালা ৯ম শ্রেণিতে ও আরেকজন সুস্ময় গোয়ালা হরিজন কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে পড়ছে। হরিজন পল্লি ঘনবসিত হওয়ায় এবং শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় সন্তানদের লেখাপড়া করাতে গিয়ে অনেক কষ্ট হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে শহরের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষায় গ্রামের দলিত জনগোষ্ঠী বেশ পিছিয়ে রয়েছে। শহরে হরিজন পল্লিতে প্রাইমারি স্কুল থাকায় শিশুরা এই স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু গ্রামের স্কুলগুলোতে এই জনগোষ্ঠীর শিশুরা লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামের দলিত জনগোষ্ঠীর অভিভাবকরা একদিকে অভাবী অন্যদিকে সচেতন না হওয়ায় তাদের সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে একটু বড় হলেই নিজেদের পেশায় নিয়োজিত করছে।
ফুলপুর উপজেলার রূপসী ইউনিয়নের বিহারাঙ্গা নদীরপাড় এলাকার দলিত স¤প্রদায়ের বয়স্কা ছিতিয়া রানী রবিদাস জানান, সংসারের অভাব দূর না হওয়ায় এখানকার শিশুদের পরিবারের পেশায় কাজে লাগানো হয়, স্কুলে পাঠানো হয় না।
একই এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী কার্তিক রবিদাস জানান, আমরা সরকারি জায়গায় নদীর পাড়ে এক কোণে ছোট্ট একটি পরিসরে বেশ কিছু লোক বসবাস করি। এখানে প্রাইমারি স্কুল দূরে হওয়ায় এবং সংসারের অভাবের কারণে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারি না। আমাদের জন্য যদি আলাদা করে স্কুলের ব্যবস্থা করা হতো তাহলে সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারতাম। নানা সমস্যার কারণে শিশুদের স্কুলে দেওয়া হয় না।
এদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশের বেশকিছু জেলায় দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করা হলেও ময়মনসিংহে তা এখনও চালু করা হয় নি। এই কারণে এখানকার দলিত জনগোষ্ঠী সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। সারাদেশের মতো ময়মনসিংহেও দলিত শিশুদের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হলে এবিষয়ে সরকারকেই বিশেষ নজর দিতে হবে। তাদের উন্নয়নে এগিয়ে সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। আর এদের কল্যাণের জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার এগিয়ে আসা জরুরি।
– আতাউর রহমান জুয়েল, একুশে টেলিভিশনের ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি এবং শারি’র দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments