ময়মনসিংহের দলিত ও হরিজনদের নেই নিজস্ব ভূমি এ নিয়ে নেই সরকারী উদ্যোগ

 Posted on

\ ময়মনসিংহ প্রতিনিধি \
ময়মনসিংহ মহানগরীর দলিত জনগোষ্ঠীর হরিজন পল্লীর ভরত হরিজন(৭০) স্ত্রী গেন্দুয়া হরিজন(৬৫)। এই দম্পতি ১৯৮৮ সাল থেকে বসবাস করছেন হরিজন পল্লীর ১২ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১০ ফুট প্রস্থের একটি ঘরে। পরিবারের সদস্যের মধ্যে রয়েছে তাদের ৫ পুত্র, ৫ পুত্র বধু, নাতি নাতনি ৮ জন ও ১ প্রতিবন্ধী কন্যা লক্ষী রানী হরিজন। এ হিসেবে ২১ সদস্যের পরিবার নিয়ে ভরত হরিজন ছোট্র ঘরটিতে গাদাগাদি করে মানবেতর জীবন যাপন করে আসছেন।
শুধু ভরত হরিজনই না, হরিজন পল্লীর তার মতো নন্দু হরিজন ১৮জন সদস্য, চন্দ্র লাল হরিজন ১৫ জন সদস্য, রামা বাশফোড় ১২ সদস্যসহ এখানকার প্রত্যেকটি পরিবার একই অবস্থায় বসবাস করছেন।
হরিজন পল্লীর রাজা সিং হরিজন জানান, ব্রিটিশ আমলে ভারতের এলাহাবাদ থেকে এখানকার বসবাসকারীদের আনা হয় ময়মনসিংহ অঞ্চলে পরিচ্ছন্ন কাজ করার জন্য। ময়মনসিংহ পৌসভায় পরিচ্ছন্নকর্মীর চাকুরি দিয়ে জমিদার শশী কান্ত মহারাজ হরিজন পল্লীর প্রায় পৌনে দুইশ’ একর জমি দান করেন তাদের আবাসন তৈরি করে থাকার জন্য। সেই থেকে তারা বসবাস করে আসছেন। পরে ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ফাস্ট লেডি বেগম রওশন এরশাদের সদিচ্ছায় হরিজন পল্লীতে গুচ্ছ গ্রাম স্থাপন করে দেয় সরকার। সেই থেকে এখানে তাদের বসবাস। কালের পরিক্রমায় হরিজন পল্লীর সদস্য সংখা বেড়েছে কিন্তু তাদের জায়গার পরিমাণ বাড়েনি।
নন্দ হরিজন জানান, দলিত স¤প্রদায়ের লোকজন ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজার রেলক্রসিং সংলগ্ন হরিজন পল্লী ছাড়াও রেলওয়ে স্টেশন কলোনীর নাটক ঘরলেন, রেলিমোড়, এসকে হাসপাতাল কলোনী, কেওয়াটখালী, মরাখলা শ্মশানঘাটসহ গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন এলাকায় দলগত ভাবে বস্তির পরিবেশে বসবাস করে আসছে। কর্ম এলাকার আশেপাশেই তারা বাস করে। তবে এরা সবাই ভূমিহীন হিসেবেই পরিচিত। বিশেষ করে নগরীর নতুন বাজার রেলক্রসিং সংলগ্ন হরিজন পল্লীতে দলিত কয়েকটি স¤প্রদায়ের বর্তমানে দেড়শ’ পরিবারের সহস্রাধিক সদস্য গাদাগাদি করে প্রায় দুইশ’ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। আজও তারা এখানকার ভূমির মালিকানা পাননি।
নাটক ঘরলেন হরিজন পল্লীর রাম বাবু হরিজন জানান, তারা রেলওয়ে কলোনীর জমিতে দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করে আসছেন। এখানে রয়েছে ১২ টি পরিবার। ছোট ছোট ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাদের গাদাগাদি করে বসবাস করতে হয়। ফলে সন্তানদের নিয়ে এখানে বসবাস করা তাদের জন্য কষ্ট দায়ক।


হরিজন পল­ীর অসিত হরিজন জানান, তাদের বড় সমস্যা হচ্ছে বর্ষায় তারা শান্তিতে বাস করতে পারেন না। পানি ঘরে ওঠে যাওয়ায় ঘরের আসবাবপত্র নষ্ট হয় এবং সারা রাত দাড়িয়ে থাকতে হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভাল না থাকায় পানি নামতে সময় লাগে এমনকি পানি ২/৩ দিনও জমে থাকে। তখন বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পরে।
রিপন হরিজন জানান, শহরের মূল সড়ক থেকে হরিজন পল্লী কয়েক ফুট নিচু হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই হরিজন পল্লী পানিতে থই থই করে। বিশেষ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভাল না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ঘর ও রাস্তায় পানি জমে থাকে। তখন শিশুরা বাইরে বের হতে পারেনা এমনকি স্কুলে যাওয়া তাদের বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আরও জানান, ড্রেনেজ ও রাস্তার উন্নয়নে হরিজন পল্লীর পঞ্চায়েত কমিটির নেতৃত্বে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছে বেশ কয়েক বার আবেদনও করা হয়েছে কিন্তু কোন কাজে আসেনি। রিপন হরিজন আরও জানান, এই পৌণে দুইশ’ জমিতে যদি সরকারের উদ্যোগে বহুতল ভবন নির্মাণ করে হরিজন পরিবারকে বরাদ্দ দেয়া হতো তাহলে আবাসন সমস্যার সমাধান হতো।
হরিজন পল্লী কমিউনিটি প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মুন্নী সরকার জানান, জেলার দলিত ও হরিজন স¤প্রদায়ের লোকজনের আবাসন সমস্যা সবচেয়ে বড় সমস্যা। ভূমিহীন দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের ব্রহ্মপুত্র নদে জেগে উঠা চরের খাস জমি বরাদ্দ দেয়া হলে তারা আবাসান ব্যবস্থা করে থাকতে পারত। এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তিনি।
ময়মনসিংহ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মোহাম্মদ শের মাহবুব মোরাদ জানান, দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের আবাসন সমস্যা দূর করতে চরাঞ্চলে খাস জমি বরাদ্দ দেয়া যায় কিনা এই বিষয়টি তারা ভেবে দেখবেন। তিনি আরও জানান, হরিজন পল্লীতে অল্প জায়গাতে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে প্রকল্প পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
ময়মনসিংহের স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক গালিভ খান জানান, দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের ভূমিহীন মানুষদের আবাসন সমস্যা সমাধানে প্রকল্প হাতে নেয়া যায় কিনা এ বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দলিত স¤প্রদায়ের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইকরামুল হক টিটু বলেন, মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করা হয়েছে এবং ইউজিপ থ্রি প্রকল্পের কাজ চলছে। হরিজন পল­ীর ড্রেনেজসহ রাস্তার উন্নয়নে প্রকল্প হাতে নেয়ার কথাও জানান তিনি। তবে তাদের আবাসন সমস্যা দূর করতে সিটি কর্পোরেশনের কোন সুযোগ নেই দাবি করে তিনি আরও বলেন, আবাসন সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিতে পারে।

Facebook Comments