ময়মনসিংহের দলিত ও সংখ্যালঘুরা পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিপাকে : শত্রু সম্পত্তি আইন সম্পর্কে অনেকেই জানে না

 Posted on

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ :: ময়মনসিংহের দলিত জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু পরিবারগুলো পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিপাকে পরেছেন। দেশ ভাগের পর ১৯৬৫ সালে এই বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে চলে গেছে তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিকেই শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষনা করে আইন করেছিল তৎকালীন সরকার। এসময় যারা দেশ ছেড়ে ভারতে যায়নি তাদের অনেকেরই সম্পত্তিও প্রভাবশালী মহল শত্রু সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে দখল করে নেয়। এসময় বেশিরভাগ সংখ্যালঘু পরিবার দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এছাড়া ময়মনসিংহ চরাঞ্চলে বসবাসরত বিন ও গোয়ালা কয়েকশ’ পরিবারের সম্পত্তি ১৯৮১ সালে বিআরএস জরিপ করার সময় টাকা না দেয়ায় জরিপ কর্মকর্তারা ক ও খ তপসিলভূক্ত করে রেখে যায়। দীর্ঘ দিন ধরে দখলে রেখে বসবাস করে আসলেও প্রয়োজনীয় মালিকানার কাগজ থাকার পরও বিআরএসে নাম থাকায় এখন ওই সম্পত্তির মালিক হয়েছে সরকার। তবে বর্তমান সরকার খ তপসিলভূক্ত জমির মালিকানার কাগজপত্র থাকা সাপেক্ষে তাদের নামে নাম কারিজ করার নির্দেশ দিলেও ভূমি অফিসগুলো অর্থ ছাড়া কাজ করে দিচ্ছে না। খ আর ক তপসিলভুক্ত সম্পত্তি ফিরে পেতে কাগজপত্র যথাযথ যাদের আছে তাদেরকে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করতে হয়েছে। এ নিয়ে বিপাকে পরেছেন চরাঞ্চলের কয়েকশ’ দলিত জনগোষ্ঠীর বিন ও গোয়ালা পরিবার।

পুরনো ব্রহ্মপুত্র পূর্ব পারের জেলখানা চরে পৈতৃক ৩৫ শতাংশ জমিতে দীর্ঘ দিন ধরে বৃদ্ধ স্বামী ও ৬ সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন গোলাপী রানী বিন। বাড়িভিটাসহ ৩৫ শতাংশ জমি কিনেছিলেন ব্রিটিশ জমিদার আমলে। সেই থেকে বংশ পরম্পরায় গোলাপী রানীর পরিবার বসবাস করছেন। ১৯৮১ সালে বিআরএস জরিপ কাজ চলার সময় চাহিদার টাকা না দেয়ায় মাঠ পর্যায়ের জরিপ কর্মকর্তারা গোলাপী রানীর জমি খ তপসিলভূক্ত করে রেখে যায়। গেল ৪/৫ বছর আগে বিআরএসের কাগজ প্রকাশিত হওয়ার পর ভূমি অফিসের মাধ্যমে জানতে পারেন বাড়িভিটাসহ পুরো জমি খ তপসিলভূক্ত হয়ে গেছে। এরপর স্থানীয় খাগডহর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে চলে দৌড়ঝাপ। পরে সরকার খ তপসিলভূক্ত জমি নাম খারিজ করে দেয়ার জন্য নির্দেশনাও দেন। কাগজপত্রসহ ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা হলে নাম খারিজের জন্য নগদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। চাহিদার টাকার যোগাড় করতে না পারায় এখনও জমি দখলে থাকলেও মালিকানার নাম খারিজ করাতে পারেনি গোলাপী রানী বিন। এনিয়ে চিন্তিত পরিবারটি।

একই এলাকার ৪৬/৭১ দাগে জেলখানা চর মৌজায় রাজন বিনের পারিবারিক ৩২ শতাংশ জমি খ তপসিলভূক্ত হয়েছে। এই জমির মালিক ছিলেন তার দাদা। দাদা মারা যাওয়ার পর জমির মালিকানা পেয়েছেন বাপ চাচা বাদল বিন, মিসরি লাল বিন, পরশু রাম বিন। জমির সিএস ও আরওআরে বাপ চাচার নাম থাকলেও বিআরএসে তাদের নাম নেই জমির মালিকানা এখন সরকার। পরে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক খ তপসিলের জমি নাম খারিজের জন্য স্থানীয় ভূমি অফিসে গেলে প্রধান নায়েব ৫৫ হাজার টাকা দাবি করেন। নাম খারিজের জন্য নায়েবকে নগদ ২৫ হাজার টাকা দিয়েছেন প্রায় ২/৩ মাসে। নগদ টাকা দেয়ার পরও নাম খারিজের কাগজ এখনও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে রাজন বিন জানান, বিআরসের মাঠ পর্যায়ে জরিপ কাজ চালানোর সময় মাঠ কর্মকর্তারা চরাঞ্চলের দলিত জনগোষ্ঠীর বিন ও গোয়ালা প্রায় ৬শ’ পরিবারের জমির সর্বনাশ করে গেছেন। যারা চাহিদার নগদ টাকা দিতে পেরেছিল তাদের জমির কোন সমস্যা হয়নি। বাকীদের জমি ক ও খ তপসিলে চলে গেছে। এখন ক তপসিলের জমির মালিকানা ফিরে পেতে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হচ্ছে। আবার অনেকেই এখনও মামলা করতে পারেনি, মামলার সময় চলে যাওয়ায়। তিনি আরও জানান, সরকারী নির্দেশনা থাকার পরও খ তপসিলের জমি ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের টাকা না দিয়ে কেউ জমির নাম খারিজের কাগজ পাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, চাহিদার টাকা দিয়েও অনেকে দিনের পর দিন ঘুরছে নাম খারিজের কাগজের জন্য। স্থানীয় রাজা বিন জানান, সরকার চরাঞ্চলে নতুন বিভাগীয় শহর স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই অধিগ্রহণের নোটিশও পেয়েছেন। কিন্তু বিআরএস মূলে জমির মালিকানা না থাকায় বিন ও গোয়ালা কয়েকশ’ পরিবারের মানুষ এখনও নোটিশ পায়নি। দুই এক মাসের মধ্যে নাম খারিজ করাতে না পারলে টাকাতো পাবেই না, জমি সরকার নিয়ে যাবে। তখন এসব হত দরিদ্র মানুষের কস্টের সীমা থাকবে না।

ময়মনসিংহ জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি এডভোকেট বিকাশ রায় জানান, শত্রæ সম্পত্তি আইনের কারণে দলিত এবং সংখ্যালঘু পরিবারগুলো সব সময় ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। আইনের সুফল এই জনগোষ্ঠীর মানুষ কখনই পায়নি। তিনি আরও জানান, শহরের মৃত্যুঞ্জয় স্কুল রোডে তার নিজের ১৩ শতাংশ জমি যা খ তপসিলভূক্ত হয়েছিল এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দখর করে নেয়। এই জমির মালিকানায় মামলা করে সর্বোচ্চ আদালতে ডিগ্রী পাওয়ার পরও দখল এখনও মিলেনি। তার মতো অনেকেই পৈতৃক জমি নিয়ে বিপাকে আছে জানান তিনি। শত্রু সম্পত্তি আইন সম্পর্কে দলিত এবং সংখ্যালঘু পরিবারগুলো ঠিক মতো জানে না দাবি করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও বাংলাদেশে দলিত এবং সংখ্যালঘু পরিবারগুলো তাদের নিজেদের জমি ফিরে পাচ্ছে না এটা খুব দুঃখজনক। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার দলিত এবং সংখ্যালঘু পরিবারের জমি রক্ষায় এবং ফিরে পেতে ব্যবস্থা নেবেন দাবি করেছেন হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা এডভোকেট বিকাশ রায়।

আতাউর রহমান জুয়েল,
একুশে টেলিভিশনের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি

শারি’র হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার।

Facebook Comments