মৌলভীবাজারে দলিত সম্পদায়ের অধিবাসীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকায় রয়েছেন চাকুরী বঞ্চিত : প্রয়োজন বিশেষ কোটা

 Posted on


বিকুল চক্রবর্তী :: মৌলভীবাজারের দলিত সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছেন। বছরের পর বছর ধরে সমাজে অবহেলিত থাকায় মেধা বিকাশের সুযোগ তারা কমই পেয়ে আসছেন। সঙ্গত কারনেই তারা সহজ-সরল জীবন যাপন করে আসছেন। তাদের সহজ-সরল জীবন-যাপনের জন্য সমাজের প্রতিষ্ঠিত বা বোদ্ধা শ্রেণীর কাছে তারা আজ উপেক্ষিত। তাই অনেক ক্ষেত্রে তারা সহজ বা সস্তা শ্রম হিসেবে বিবেচিত। বছরের পর বছর ধরে বংশ পরম্পরায় তারা সমাজের কাছ থেকে যে অবহেলার চিত্র ধারণ করে আসছে, তাতে তাদের মনের মধ্যে এক ধরনের অপ্রাপ্তি স্থায়ী বাসা বেঁধেছে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই তারা তাদের জীবনমানের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান না। এর ফলে তারা বর্তমান সমাজে লেখাপড়া, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, সামাজিক নেতৃত্ব সকল ক্ষেত্রেই অন্যান্য বাসিন্দাদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন।
নারী শিক্ষা, নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, সেলুনের কাজ, ধোপার কাজ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, গবাদি পশু পালন, এলএমএফসহ নানাবিধ প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও তারা তাতে অংশ নেন না। মুলত তাদের এ সব প্রশিক্ষণ গ্রহণে জোরালোভাবে কেউ উদ্বুদ্ধ করেন না। আর এ সব ক্ষেত্রে তারাও স্ব উদ্যোগে এগিয়ে যান না। তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বংশ পরম্পরায় তারা সমাজের অন্য মানুষের সাথে খুব একটা মিশেন না। ফলে অনেক বিষয় তাদের অজানাই থেকে যায়।
মৌলভীবাজারে দলিত সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী অল্প বেতনে পৌরসভার পরিচ্ছনকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তাও অল্প সংখ্যক। আর কিছু কিছু পুরুষ জুতা সেলাই এর কাজ কওে । আসলে বর্তমানে মানুষ জুতো ছিঁড়ে গেলে নতুন জুতো কিনে নেন। তাই এ পেশায়ও ভাটা পড়েছে। কেউ কেউ কিছু জুতার কারখানায় চাকুরী করলেও মৌলভীবাজার জেলায় এমন প্রতিষ্ঠান না থাকায় সবাই ঢাকা বা অন্য জায়গায় গিয়ে কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারন দূরে চাকুরী করলে থাকা- খাওয়ার জন্য তারা ঝামেলায় পড়ে যান। যে বেতন পাওয়া যায় তা দিয়ে ঢাকা শহরে বাসা নিয়ে থাকা দুরুহ হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা চন্দন রবিদাশ জানান, তিনি এইচএসসি পাস করেছেন ১০ বছর আগে সরকারী বে-সরকারী কোন চাকুরীই পাননি। এখনও তাদের পাড়ায় বেশ কিছু ছেলে-মেয়ে আছে যারা এসএসসি ও এইচএস সিপাস। কিন্তু কোন চাকুরী নেই।
পিছিয়ে পড়া এ শ্রেণীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সরকারকে এদের জন্য বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত তাদরে শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাইরে বেড়িয়ে আসার জন্য তাদের মধ্য থেকে বাধ্যতামুলক কিছু চাকুরী দেয়া উচিৎ। এতে তাদের জীবনমানের উন্নয়নের পাশাপশি তারা তাদের গন্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং যিনি বেরিয়ে আসবেন তিনি যুগের তালে নিজের কমিউনিটির জন্য ভূমিকা রাখতে পারবেন বলেও মনে করেন অনেকে। পাশাপাশি তাদেরকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে উদ্বুদ্ধ করে দক্ষ করে গড়ে উঠতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা-বানিজ্য ও হাঁস-মুরগী পালনের জন্য তাদের কমসুদে ঋণ প্রদান ও তা তদারকির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের তদারকি করে বিদ্যালয়মূখী করা, স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের ঝরে পড়া রোধ করা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তাদের সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর জন্য মুল ভুমিকা নিতে হবে জেলার পৌর প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদকে। তবে এ ক্ষেত্রে পূজা উদযাপন পরিষদ ও হিন্দু বোদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও ভূমিকা রাখতে পারেন। তাদের সন্তানদের জন্য চিত্রাঙ্কন , আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য প্রশিক্ষণে সুযোগ দিতে হবে।
এ ছাড়াও তাদের মৌলিক চাহিদা পুরণে সদা সচেষ্ট থাকতে হবে স্থানীয় সরকারকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সারা শহর পরিচ্ছন্নতায় তারা নিয়োজিত থাকলেও তাদের আবাসস্থল থেকে যায় অন্ধকারে। অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করে তাদের পলীøতে। এর কারন তাদের পলীøতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না, নেই পৌরসভার সাপ্লাইএর লাইনও। সবার আগে বিশুদ্ধ পানি ও জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ছাড়াও সরকারের ভিজিএফ ভিজিডি এর চাল প্রাপ্তি কার্ড প্রদান করা। সাথে সাথে অনেক দলিতদের রয়েছে পৌরসভার সাথে ভুমি জটিলতা তাও দুর করে তাদের নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাস করার সুযোগ দিতে হবে।
সর্বোপরি তাদের শিক্ষিত সন্তানদের বিশেষ কোটায় চাকুরী প্রদানের দাবি করেন সমাজে পিছিয়ে পড়া এ শ্রেণীর অভিভাবকরা।

বিকুল চক্রবর্তী , সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক, প্রতিনিধি- একুশে টেলিভিশন ও দৈনিক ভোরের কাগজ

Facebook Comments