মৌলভীবাজারে দলিতদের বিকল্প জীবিকায়নে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও তৈরি সামগ্রী বিপননের সুযোগ নেই

 Posted on

বিকুল চক্রবর্তী, মৌলভীবাজার :: মৌলভীবাজারে দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠি বিকল্প জীবিকায়নে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন। যে কারণে অন্যান্য জাতির চেয়ে তারা বংশ পরম্পরায় দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করে জীবনধারণ করেন। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে তাদের বিকল্প জীবিকায়নে কুটিরশিল্পসহ অন্যান্য কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য সচেতন করা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরীভাবে আবশ্যক। তবে গ্রাম পর্যায়ে দলিত জনগোষ্ঠির কিছু কিছু প্রবীণ ব্যক্তি বাঁশ-বেত দিয়ে টুকরী, ঝাকা, পোড়া, সেরী টুকরি, চালুন, ডালা, কুলা, মাছ ধরার খলই ( চালন) সহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরী করে থাকেন। অনেকে তৈরী করে নিজেরা ব্যবহারও করেন।

পর্যাপ্ত কাঁচামাল ও বিপননের সুযোগ না থাকায় তারা বানিজ্যিকভাবে তা তৈরি করেন না। যদি তাদের নিজের জমিতে বাঁশঝাঁড় সৃষ্টি করতে পারতেন এবং বিপননের জন্য কাছাকাছি বাজারে মার্কেট তৈরী করে দেয়া যেতো তাহলে তারা এর দ্বারা জীবিকায়নের সঞ্চার করতে পারতেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু পৃষ্টপোষকতা বা সহজ শর্তে যদি ছোট ছোট ঋণ দেয়া যায় তাহলেও তারা এ পেশাকে ধারণ করতে পারতেন। মৌলভীবাজারে দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির বিশাল একটি অংশ বসবাস করেন চা বাগানে। যেখানে বিকল্প জীবিকায়ন খুবই জরুরী। আর বিকল্প জীবিকায়নের সহজ পন্থা হলো কুটির শিল্প। চা বাগানে প্রতি পরিবারে একজন করে সদস্যের কাজ দেয়া হয়। বাকি সদস্যরা বেকার থাকেন। ছোট একটি বসত ঘর। আর সামান্য একটু জমি। এতে গাছপালা, বাঁশ বা শাকসবজী লাগানোর কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হাতের কাছে না থাকায় সেখানে এ শিল্প গড়ে উঠে না। তবে কাপড় সেলাই, নকশী কাঁথা সেলাই এ সব কাজে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারলে তাদের একপেশে জীবন-যাপন থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।

আর বিশেষ করে বর্তমানে বিভিন্ন প্লাষ্টিক সামগ্রীর সহজ লভ্যতার সুবাদে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের হাতের তৈরী গ্রামীণ বিভিন্ন সামগ্রী। এর ফলে দলিত জনগোষ্ঠির নতুন প্রজন্মের কেউই এগুলো তৈরীর নিয়ম শিখতে পারছে না। একটা সময় আমাদের গ্রামীণ পরিবারগুলোতে নিত্য প্রয়োজনের বিভিন্ন সামগ্রী বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরী করে নিজেরাই ব্যবহার করতেন। যা ছিলো স্বাস্থ্যসম্মতও। কিন্ত আধুনিক যুগে আমাদের সেই সব টুকরী, ডালা, কুলা, মাছ রাখার খলই,ধান রাখার টাইল, শাকসবজী ধোয়ার চালুন, চাইন, শের, পোড়াসহ হাতের তৈরী এ সামগ্রীগুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এই অবস্থায় আজও কিছু কিছু লোক তা ধরে রেখেছেন। তাদেরই একজন শ্রীমঙ্গল সবুজবাগের ভৈরবতলী এলাকার নৃপেন্দ্র সরকার। নৃপেন্দ্র সরকার জানান, তিনি বাজার থেকে বাঁশ কিনে এনে তা তৈরী করেন। আর গ্রামের কিশোরসহ বিভিন্ন লোকজনকে কাছে বসিয়ে তা তৈরীর নিয়মও দেখিয়ে দেন। তিনি বলেন, এই সামগ্রীগুলোর বেশ চাহিদা রয়েছে। নিজের আর্থিক সংগতি না থাকার কারনে তিনি বাঁশ কিনতে পারেন না। কৃষিকাজ করেন। এর ফাঁকে তিনি প্রতিদিন এক-দুই ঘন্টা করে ছোট ছোট সামগ্রী তৈরী করেন। একই সাথে তিনি বলেন, উপযুক্ত মুল্যে তা বিপননের ব্যবস্থা করতে পারলে তাদের জন্য সুবিধা হয়। গ্রাম-গঞ্জে দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির নতুন প্রজন্মকে তা শেখানোর জন্য সরকার প্রশিক্ষণ সেন্টার তৈরী করে দেবে এমনটাই চাওয়া এ এলাকার নতুন প্রজন্মের।

বিকুল চক্রবর্তী, সাংবাদিক, একুশে টেলিভিশন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও ভোরের কাগজ

Facebook Comments