মুন্সিগঞ্জে শারির উদ্যোগে সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিকরণ সভা অনুষ্ঠিত 

 Posted on

দলিতকন্ঠ ডেস্ক : বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শারির উদ্যোগে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোভিড ১৯ সচেতনতা ও সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আজ (২০ জানুয়ারি, বুধবার) মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানে শারির প্রকল্প কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

বাংলাদেশ দলিত পঞ্চায়েত ফোরামের সভাপতি রামানন্দ দাসের সভাপতিত্বে সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজদিখান উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ হাসান আলী, সিরাজদিখান উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ডলি রানী নাগ এবং সিরাজদিখান উপজেলা  কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মোশারফ হোসেন।

এছাড়া উক্ত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন শারি সংস্থার অ্যাডভোকেসি কোঅর্ডিনেটর রঞ্জন বকসী নুপু,  পাবলিকেশন এন্ড ডকুমেন্টেশন  অফিসার বি এস গাইন,  প্রোগ্রাম অফিসার  নিরঞ্জন দাস ও পবিত্র কুমার মন্ডল,  পঞ্চায়েত নেতা বাদল চন্দ্র দাস ও  পরেশ চন্দ্র দাস, শারি পরিচালিত  বিকাশ শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্রের  শিক্ষক রেখা রানী দাস ও সুমি রানী দাস,  কোভিড ১৯ সচেতনতা সম্পর্কিত স্বেচ্ছাসেবক  নন্দরাজ দাস ও  সম্রাট দাসসহ দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিবৃন্দ ।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ হাসান আলী বলেন,  শারি সংস্থা আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে এসে শারির উপকারভোগী একজন শিক্ষিকার সাফল্যগাথা শুনে আমার খুবই ভালো লেগেছে। এই জনগোষ্ঠীর নারীরা যে আগে বাইরের সমাজে বের হতে পারতেন না তা আমি আমার নিজ এলাকা মানিকগঞ্জেও দেখেছি। সেখানে শুধু নারীরা নয়, সামগ্রিকভাবে পুরো দলিত সমাজই অত্যন্ত সংকীর্ন ভাবে বসবাস করতো। এক সময় সেখানে তারা নিজেদের অনুষ্ঠানাদি করতেও সঙ্কোচ বোধ করতো, বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি। বর্তমানে তাদের সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তারা এখন সচ্ছন্দ্যেই তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানাদি পালন করেন থাকে। কিন্তু তাদের মধ্যে শিক্ষার হার সবচেয়ে কম।  দারিদ্রের কারণে তাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা ক্ষেত্রে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারে না।   আমি আমার স্কুল জীবনে দেখেছি মনোরঞ্জন সরকার নামে আমার এক ক্লাসমেট যে ক্লাসে প্রথম হতো কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে সে এসএসসি পাশ করতে পারেনি। মানিকগঞ্জে চন্দননগর নামে আমার সেই গ্রামের স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন রাজেন্দ্র কুমার সরকার নামে একজন শিক্ষানুরাগী যিনি নিজেও দলিত জনগোষ্ঠীর একজন ব্যক্তি। কিন্তু সেই স্কুল থেকে দলিত সম্প্রদায়ের কেউ পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না।

তিনি উপস্থিত দলিত জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে বলেন,  আপনাদের এখানে যারা গবাদি পশু পালনের সাথে যুক্ত আছেন তারা আমাদের সাথে যদি যোগাযোগ করেন তাহলে আমরা যথাসাধ্য সহায়তা করব যাতে আরো উন্নত প্রযুক্তি ও সেবা সহায়তায় পশুপালন করে অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন করতে পারেন।

সিরাজদিখান উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ডলি রানি নাগ বলেন  ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে যে যুবকরা পড়াশোনা শেষ করে বেকার আছেন উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন কার্যালয়ের আধীনে  তাদের জন্য বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের সু-ব্যবস্থা রয়েছে। মুন্সীগঞ্জে মোবাইল সার্ভিসিং, ইলেকট্রনিক্স, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার, কম্পিউটার, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু পালন, সেলাই, ব্লক বাটিক প্রভৃতি বিষয়ে ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। করোনাকালীন সময়ে আমরা এলাকাভিত্তিক ২৫ জনের একটি দল সংগ্রহ করে এ প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকি। আপনাদের দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে যদি এরকম ২৫ জনের একটি দল গঠন করে  প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে চান তাহলে আমরা উল্লিখিত ট্রেডসমূহ আপনাদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করব। স্থানীয় কোলা ইউনিয়নে আমাদের একটি সেলাই প্রশিক্ষণ চলছে যেখানে সাতাশ জন প্রশিক্ষণার্থীর সবাইকে একটি করে সেলাই মেশিন প্রদান করা হবে।  আপনারা আমাদের কাছে যোগাযোগ করলে এ ধরনের সেবা আমরা  প্রদান করবো।

তিনি বলেন, দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুরা এখন অবাধেই স্কুলে যাতায়াত করতে পারে, কোনো বাধার সম্মুখিন কেউ হয়না। যদি কোথাও কেউ কোনো বাধা দিয়েছে এরকম জানতে পারেন তবে আমাদেরকে জানাবেন, সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আপনাদের সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার রয়েছে এই মনোভাব আপনাদের থাকতে হবে।

সিরাজদিখান উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, উপজেলা কৃষি অফিস কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, বীজ সারসহ উন্নত কৃষি উপকরণ সরবরাহ,  পরামর্শ প্রদান, প্রণোদনা এবং প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সেবা দিয়ে থাকে।এছাড়া সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই এলাকায় দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা কৃষির সাথে সম্পর্কিত এবং একত্রিত থাকেন তারা আমাদের কাছে যদি যোগাযোগ করেন তাহলে আমরা তাদেরকে এসকল সেবাসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রদান করব। 

সভার সূচনা বক্তব্যে শারির এডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর  রঞ্জন বকসী  নুপু বলেন ১৯৯২ সাল থেকে শারি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করে আসছে। সংস্থার মূল কাজ দলিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা এবং এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকারি সেবা বলয়ে এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করণ। বিগত বছরে বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশের মানুষ কর্ম হারিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন আমাদের দেশের দলিত জনগোষ্ঠী। তারা  করোনাকালীন সময়ে কর্ম হারিয়ে যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। করোনা পরিস্থিতি আরো প্রলম্বিত হলে  তারা অর্থনৈতিকভাবে আরো শোচনীয় অবস্থার সম্মুখীন হবেন। সেই পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে শারি মুন্সিগঞ্জ জেলায় দলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২৩১ পরিবারের মধ্যে করোনাকালীন ত্রাণ সরবরাহ করেছে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ক্ষুদ্র পেশাজীবী যারা করোনার কারণে কাজ হারিয়েছেন তাদের মাঝে কিছু নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করা হবে। যাতে তারা ক্ষতি কাটিয়ে আবার নিজ নিজ পেশাকে আঁকড়ে ধরতে পারে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড  এর আর্থিক সহায়তায়  শারি সহ আটটি সংগঠন মিলে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে,  যার সমন্বয়ের দায়িত্ব রয়েছে ইসিনেট নামে একটি সংগঠন।

তিনি বলেন, দলিত জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তারা নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতে চায়। শারি সংস্থা তাদেরকে স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রদানকারী সরকারি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগসুত্র স্থাপনের  কাজটি করে থাকে। মুন্সীগঞ্জে সংস্থার একটি পাইলট প্রকল্প চালু রয়েছে।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে শারি পরিচালিত বিকাশ শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্রের শিক্ষিকা রেখা রানী দাস বলেন,  আামি দলিত জনগোষ্ঠীর একজন গৃহবধূ হিসেবে বাইরের জগতে বের হতে পারতাম না। আমার সাথে শারি সংস্থার প্রতিনিধিদের যোগাযোগ হয় এবং আমি এই সংস্থার পরিচালিত শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্রের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাই।  এই কাজে আমি আমার পরিবার থেকেও বাধার সম্মুখীন হয়েছি,  কারণ আমাদের পরিবারে প্রথাগতভাবে মেয়েদের বাইরের জগতে বের হওয়ার রীতি ছিল না। এই শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্রে যুক্ত হওয়ার পরে আমাদের পরিবারের সবাইকে আমি পরিবারের বাইরের কার্যক্রমেও নারীদের যুক্ত হওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হয়েছি এবং আমাদের পঞ্চায়েতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি হয়েছে যে আমাদের মেয়েদেরও ক্ষমতায়ন দরকার। আমাদের সমাজের মেয়েদের পঞ্চায়েত নেতাদের সাথেও কথা বলার ক্ষমতা ছিল না। এখন তারা প্রায় সকল কাজেই পঞ্চায়েতের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সেই সুযোগ করে দিয়েছে শারি সংস্থা। 

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শারির প্রোগ্রাম অফিসার নিরাঞ্জন দাস।

Facebook Comments