মুক্তিযুদ্ধোত্তর দিনাজপুর ট্র্যাজেডি : প্রাণে বাঁচা ৪ মুক্তিযোদ্ধার বয়ানে ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারির বিভীষিকার চিত্র

 Posted on

১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণসমাধি। চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণ, দিনাজপুর।

আজহারুল আজাদ জুয়েল :

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে নভেম্বর মাসের শেষ ও ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে বাঙালির বিজয় যাত্রা সূচিত হচ্ছিল। যেখানেই মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশন, সেখানেই তাঁরা বিজয়ী পাকিস্তানি হানাদারদের পতন। হানাদারদের লন্ডভন্ড করে ১৪ ডিসেম্বর দিনাজপুর শহরে যখন ঢুকে পড়ে তখন শহরের কোথাও পাকিস্তানি বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না।
দিনাজপুর জেলা শত্রæমুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় সৈনিকদের একটি ক্যাম্প করা হয়েছিল দিনাজপুর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে। অপরদিকে মহারাজা স্কুলের বিশাল ভবন ও বিরাট চত্বরে গড়ে তোলা হয়েছিল মুক্তি বাহিনীর ট্রানজিট ক্যাম্প। এই ক্যাম্পের নেতৃতে ছিলেন লে. কর্ণেল শাহরিয়ার রশিদ (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত)¡। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি এই ক্যাম্পেই সংগঠিত হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যাতে অর্ধ সহ¯্র বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। আর আহত? তার সংখ্যাও ছিল অগুনতি। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর এত বড় ট্রাজিক ঘটনা বাংলাদেশের কোথাও আর ঘটে নাই। ট্রাজেডিতে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের দাফন করা হয়েছিল দিনাজপুরের পবিত্র ভূমি চেহেলগাজী মাযার প্রাঙ্গণে। আর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

আজহারুল আজাদ জুয়েল

১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি। কি হয়েছিল সেদিন? সেদিনের ঘটনায় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তত ৪ জন এখনো বেঁচে রয়েছেন যাদের সাথে আমার (লেখকের) দেখা হয়েছিল ঢাকায়। ২০১৭ সালে তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আহত মোঃ তোজাম্মেল হক (৭২), মোঃ আক্কাস আলী (৭২), অনীল কুমার রায় (৬২) ও সুধীর চন্দ্র রায় (৬৭) এর। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারির সেই ভয়াবহ ঘটনা কিভাবে ঘটল এবং সেই বিস্ফোরণে আহত হয়েও কিভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, সেই বেদনা বিঁধুর ঘটনা তাঁদের বয়ানে এই নিবন্ধে তুলে ধরা হলো;

মোঃ তোজাম্মেল হক (৭২),
পিতা- মৃত মোঃ রফিউদ্দিন, মাতা- মৃত তোরাফুন নেছা, স্থায়ী ঠিকানা ঃ সাং- সিঙ্গিমারি, পোস্ট-বাসুপাড়া থানা- পার্বতীপুর, জেলা- দিনাজপুর। বর্তমান ঠিকানা ঃ ৬/২৪ বøক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা;

মোঃ তোজাম্মেল হক

আমি ছিলাম মোজাহিদ। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর দিনাজপুরের নিউটাউনে ৬ মাসের মোজাহিদ ট্রেনিং নিয়েছিলাম।

আমি রাজনীতি সচেতন ছিলাম। ৬ দফা, ১১ দফার আন্দোলনেও জড়িত ছিলাম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হলে এবং হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করা হলে আমি নীরব থাকতে পারিনি।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে পাঞ্জাবী সৈন্যরা শত শত বাঙালিকে হত্যা করেছে, ইপিআর বাহিনীর ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে আমিসহ বিপুল জনতা সাধারন মানুষ ও বাঙালি সেনাদের রক্ষার জন্য লাঠি, সোঁটা সহকারে সৈয়দপুরে যাই এবং ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করি। ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে বাঙালি সেনা অফিসার মাহবুবুর রহমানসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ সৈনিককে আশংকাজনক অবস্থায় বের করে আনি। তাদেরকে খোলাহাটিস্থ ফকিরের বাজার ডাঙ্গারহাটের একটি হাসপাতালে (ক্লিনিক) ভর্তি করে দেই। এই হাসপাতালটি চালাতেন ডাঃ মহসীন।

আমরা যখন সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানিদের প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়েছিলাম, তখন পাকিস্তানি সেনারা আমাদেরকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেছিল। ঐ গুলিতে আমি আহত হই। গুলি হালকাভাবে আমার পেটের কিনারে লেগে চলে যায়। আহত অবস্থায় লোকজন আমাকেও খোলাহাটি ফকিরের বাজার সংলগ্ন হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাঃ মহসীন নামের একজন চিকিৎসক হালকা অপারেশনের মাধ্যমে আমার পেটের ভেতর থেকে গুলির স্পিল্টার বের করেন। তার চিকিৎসা ও অপারেশনে আমি এবং আরো অনেকে সুস্থ হয়ে উঠি।

পেটে গুলি লাগায় সিদ্ধান্ত নিলাম যে, দেশে থাকব না। সিদ্ধান্ত নিয়েই ২৭ মার্চ দুপুরের পর ভারতের উদ্দেশে রওনা দেই। বাসন্তী সীমান্ত দিয়ে ভারতের ভেতরে ঢুকি এবং কাটলায় গিয়ে উপস্থিত হই। কাটলায় যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে দিনাজপুরের জজ ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হয় এবং তার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাটলা ক্যাম্পে রিক্রুট হই। সেখানে ছয় দিন শুধু লেফট-রাইট করি। পরে আরো প্রশিক্ষণ নেয়ার পর আমাকে শিলিগুড়ির পানিঘাটায় উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। পানিঘাটায় সর্বমোট ৩১দিন ট্রেনিং হয়। এর মধ্যে ২৯দিন ট্রেনিং, ১দিন পিকনিক ও ১দিন নাটকসহ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। এখানে ট্রেনিং নেয়ার সময় হাতে তৈরী করা যায় এমন বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম। প্রশিক্ষণকালে আমাদের উইংয়ে বুলবুল নামের একজন দোভাষী পেয়েছিলাম যিনি প্রশিক্ষকের হিন্দি অথবা ইংরেজী ভাষা আমাদেরকে বাংলায় বলে দিতেন। ট্রেনিংয়ের শুরুতে আমাকে জাতীয় পতাকা ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করতে হয়েছিল। আমাদের কাছে পবিত্র কোরানের মত ছিল জাতীয় পতাকা। সেই পতাকা ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিলাম যে, জাতীয় প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তিগত কাজে এই ট্রেনিং ব্যবহার করব না।

আমি ট্রেনিং নিয়ে ১২ রকমের বিস্ফোরক তৈরীর সক্ষমতা অর্জন করেছিলাম। রাইফেল, স্টেনগান, এলএমজি, এসএলআর, টু ইঞ্চি মর্টার, থ্রি ইঞ্চি মর্টার, গ্রেনেড, মলটেচ কলটেচ (বোতল টাচ), বাম্বু টাচ, বর্তন টাচ, কাটার টাচ (রাস্তা বøক), রেল ব্রীজ টাচ, এন্টি ট্যাংক মাইন, এন্টি পারসোনাল মাইন, জামকিং মাইন ইত্যাদি অস্ত্রের ব্যবহার শিখেছিলাম। কিভাবে কি করা যায়, কিভাবে টার্গেটকে সঠিকভাবে নির্মূল করা যায় ইত্যাদি বিষয় আমাদের প্রশিক্ষনের অংশ ছিল। পানিঘাটার ট্রেনিং শেষ হলে আঙ্গিনাবাদ ক্যাম্প থেকে আমাকে হাতিয়ার দেয়া হয়েছিল। হাতিয়ার পেয়ে সরাসরি রণাঙ্গণে যুক্ত হয়েছিলাম।

রণাঙ্গনে যুক্ত হওয়ার প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশের ভেতরে শত্রæ বাহিনীকে ঘায়েল করার জন্য গেরিলা অপারেশনে অংশ নেই। এই রকম অপারেশনে সাধারন মানুষের মাঝে আত্মগোপনে থেকে শত্রæ বাহিনীর উপর হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে দ্রæত পালিয়ে যেতে হতো। কিছুদিন এই পদ্ধতিতে ঝটিকা অপারেশন চালানোর পর সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিতে থাকি।

প্রায় একমাস সম্মুখ যুদ্ধ করি। প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ ছিল ফুলবাড়ির মাছুয়াপাড়ায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী ক্যাম্প ছিল। বাসন্তী সীমান্তের ছোট খাল পেরোলে এই ক্যাম্প। আমাদের কমান্ডার আফসার আলীর নেতৃতে ভোর বেলা ফজর নামাজের সময় খাল পেরিয়ে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা¡ ক্যাম্পের ৫০ গজের মধ্যে চলে আসি। তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানিরা আমাদের উপর মর্টার শেল নিক্ষেপ করে। ইসমাইল ও আজিজুল নামের দুই জন মুক্তিযোদ্ধা ঐ শেলে মারা যায়। মর্টার আক্রমনে টিকতে না পেরে পিছু হতে যাই। এর ক’দিন পর আবার বড় ধরণের প্রস্তুতি নিয়ে সাঁড়াশি হামলা চালিয়ে প্রায় ৩০০ সেনার পাকিস্তানি ক্যাম্পটি সফলতার সাথে উড়িয়ে দেই।

৭নং সেক্টরের অধীনে আমবাড়ি, ফুলবাড়ি, পলাশবাড়ি, হিলি, মোহনপুরসহ আরো অনেক জায়গায় যুদ্ধ করেছি। হিলির যুদ্ধ ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের সুরক্ষিত ও শক্তিশালী ক্যাম্প উড়াতে গিয়ে আমাদের অনেকেই শহীদ হন, বিপুল সংখ্যক ভারতীয় সেনাও মারা যান।

হিলির যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩টি স্কোয়াড ছিল। সেই সাথে ভারতীয় সেনা ছিল তিনশ’ জনের মত। ঐ যুদ্ধে সাধারনভাবে পাকিস্তানিদের কাবু করা যায় নাই। তারা দূর্ভেদ্য বাংকারের আড়ালে নিজেদেরকে ভিষণভাবে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তাই যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাতের অন্ধকারে তাদের বাংকারের ভিতর বিষাক্ত ও গরম পানি নিক্ষেপ করা হয়। গরম পানি দেয়ার পর থেকে পাকিস্তানি সেনারা সুরক্ষিত বাংকার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে থাকে। এই সুযোগে আমরা তাদের উপর হামলা চালাই। ব্যাপক যুদ্ধে বহু মুক্তিযোদ্ধা, বহু ভারতীয় সেনা ও বহু পাকিস্তানি সেনা মারা গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিদের পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে ক্যাপ্টেন শাহরিয়ারের (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত) নেতৃত্বে মহারাজা স্কুলে মিলিশিয়া ক্যাম্প খোলা হয়। সেখানে অস্ত্র জমা নেয়া হতো। আমি, অনীল, আক্কাস ঐ ক্যাম্পে যোগ দেই ৫ জানুয়ারি সকাল্।ে আমাদের হাতে কিছু অস্ত্র ছিল যা রাজাকারদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছিলাম। সেই অস্ত্রগুলো মহারাজা স্কুল ক্যাম্পে জমা দিয়ে সেখানেই থেকে যাই। সেখানে থেকে যাওয়ার কারণে পরদিন সন্ধ্যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হই।

দুর্ঘটনার দিন, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বাংলা সিনেমা দেখার পরিকল্পনা ছিল। তাই সিনেমা দেখার জন্য ক্যাম্প থেকে টোকেন নেয়ার আবেদন করেছিলাম। টোকেনের আবেদন করে ক্যাম্পে আমার রুমে ফিরে এসে বিশ্রাম নেয়ার সময় হঠাৎ বাঁশির শব্দ, রিপোর্ট করতে হবে। আমরা দ্রæত মাঠের মধ্যে এসে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। প্রত্যেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এক, দুই, তিন বলে নিজের অবস্থান বা উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলাম। আমরা যখন আমাদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছিলাম, তখন মাঠের মধ্যে একটি ট্রাক থেকে অস্ত্র আনলোড করা হচ্ছিল। ট্রাকটি এসেছিল হিলি থেকে। এর ভেতরে বিভিন্ন ধরণের মাইন ছিল। মাইনগুলো ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো ক্যাম্পে ধ্বংসের তুফান শুরু হয়।। শব্দের সাথে সাথে চাকাত চাকাত আলোর কয়েকটা ঝলক দেখতে পাই। এরপর আর কিছু মনে নাই। এই ঘটনার আটদিন পর আমার জ্ঞান ফিরে আসে। নিজেকে দিনাজপুরের মিশন হাসপাতালে দেখতে পাই এবং আমার ডান পা তখন কাটা ছিল। আমার সারা শরীরে তখন অসংখ্য স্পিøন্টারের ক্ষত ছিল।

পরে জানতে পারি যে, বিস্ফোরণের পর আমার রক্তাক্ত দেহ একটি গাছের উপরে ঝুলে ছিল। লোকজন লাশ ভেবে অচেতন অবস্থায় আমাকে ঐ গাছ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। উদ্ধারের পর বেঁচে আছি বুঝতে পেরে আমাকে দ্রæত মিশন হাসপাতালে পাঠানো হয়। মিশনেই অপারেশন করে আমার ডান পা কেটে ফেলা হয়। তখন বøাড ব্যাংক ছিল না। রক্ত দেয়ার ব্যাপারে মানুষ সচেতন ছিলেন না। মিশনের ফাদার রক্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে আমার জন্য মাইকিং করেছিলেন। তারপরেও রক্ত দেয়ার মত লোক তেমন পাওয়া যায়নি। তেঁতুলিয়ার একজন মুক্তিযোদ্ধা, যার নাম আসাদুজ্জামান, তিনি ফাদারের আহŸানে সাড়া দিয়ে আমাকে তার শরীরের তিন পাউন্ড রক্ত দেন। তার রক্তে এবং ফাদারের চেষ্টায় বেঁচে যাই। পরে আসাদুজ্জামানের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, যা এখনো বজায় আছে।

দিনাজপুরের মিশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মন্ত্রী কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার, এম আব্দুর রহিম, হাজী মনসুর আলী সরকার আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তারাই উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ঢাকায় আনার পর ১০-১২ দিন তেঁজগার এমপি হোস্টেলে ছিলাম। এরপর মগবাজারের সুশ্রী হাউজে নেয়া হয়েছিল। সুশ্রী হাউজে অবস্থানকলে সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়। সেই যে ঢাকায় এসেছি, তখন থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকাতেই আছি।

মহারাজা স্কুলে যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছিল তাতে স্কুলটির রাজকীয় ভবন ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছিল। স্কুল মাঠে বড় পুকুরের মত গর্ত হয়েছিল এবং মাটির তলদেশ থেকে পানি বের হয়েছিল। ঐ ক্যাম্পে সাড়ে সাত শত জন লিস্টেড মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। আমার জানা মতে, ঐ ঘটনায় অর্ধেকের বেশি মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়েছিল।

মোঃ আক্কাস আলী (৭২)
পিতা- মৃত মোঃ আজগর আলী, মাতা- মৃত বানেসা খাতুন, স্থায়ী ঠিকানা ঃ সাং- গড়িয়াগজ, পোষ্ট- মাঝিপাড়া, থানা- তেঁতুলিয়া, জেলা- পঞ্চগড়। বর্তমান নিবাস ঃ ১/৩৫ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, চিড়িয়াখানা রোড, মিরপুর-২, ঢাকা;

মোঃ আক্কাস আলী

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে আমার বসবাস ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার পিতৃালয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে আমি দিনাজপুরে এসে ভাইদের সাথে বসবাস করতে থাকি এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি। ২৮ মার্চ কুঠিবাড়ি বাঙালিদের দখলে আসার পর দিনাজপুর জেলা মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ১৩-১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী বোম্বিং করতে করতে আবারো দিনাজপুর শহর দখল করে নেয়। পাকিস্তানি বাহিনী যখন দিনাজপুর শহরের দিকে এগিয়ে আসছিল তখন নিজেদের জীবন বাঁচাতে সেখানকার বাঙালিরা শহর ছেড়ে গ্রামে এবং পরে ভারতের দিকে পালিয়ে যেতে থাকেন। এমন অবস্থায় আমার ভাইয়েরাসহ আমি বিরল হয়ে ভারতের রাধিকাপুরে পালিয়ে জীবন বাঁচাই।

ভারতে যাওয়ার আগেই বীর মুক্তিযোদ্ধা জর্জ ভাইয়ের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে যুক্ত হয়েছিলাম। বিরলের ঠনঠনিয়াপাড়ায় পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে আমাদের প্রবল সংঘর্ষ হয়েছিল। এই যুদ্ধে আমাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে আমরা ভারতের কালিয়াগঞ্জে গিয়ে ইয়োথ ক্যাম্প গঠন করি। এই ক্যাম্পে সফিকুল হক ছুটু, আবুল হোসেন, আব্দুল হাকিম সহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অপরদিকে জর্জভাই হামজাপুরে ইয়োথ ক্যাম্প গঠন করেন। আমি পরে রায়গঞ্জ ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে এবং আরো পরে শিলিগুঁড়ির পানিঘাটায় গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করি এবং বাংলাদেশের ভিতরে বিভিন্ন স্থানে শত্রæ বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন চালাই।

দিনাজপুর-ফুলবাড়ি মহাসড়কের মোহনপুরে পাকিস্তানি সেনাদের বড় ক্যাম্প ছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১১-১২ তারিখে ঐ ক্যাম্পের উপর ভারতীয় মাদ্রাজ রেজিমেন্টের পুরো এক ব্যাটালিয়ন সৈনিক এবং মুক্তি বাহিনী যৌথভাবে হামলা চালায়। এই অপারেশনে আমি মুক্তিবাহিনীর সাথে ছিলাম। ২০-২৫টি ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর হামলা চালানো হয়েছিল। প্রবল যুদ্ধে পাকিস্তানিরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। আমরা মোহনপুর দখল করার পর ফুলবাড়ি- গোবিন্দগঞ্জ-পলাশবাড়ি হয়ে গাইবান্ধায় যাই। এরপর আবার পলাশবাড়ি- গোবিন্দগঞ্জ হয়ে বগুড়ায় এগিয়ে যাই।

১৬ ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন আমার অবস্থান ছিল বগুড়ায়। সেখানে অবস্থানকালে ভারতীয় কমান্ডারের কাছে ছুটি চাইলে তিনি ছুটি প্রদান করেন। ছুটি নিয়ে প্রথমে তেঁতুলিয়ার বাড়িতে যাই। সেখানে দু-একদিন অবস্থান করার পর ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি আমি ও বড় ভাই ইউসুফ আলী একসাথে তেঁতুলিয়া হতে দিনাজপুরের দিকে রওনা দেই। বড় ভাই ঠাকুরগাঁওয়ে নেমে যান এবং আমি দিনাজপুরে আসি। দিনাজপুরে এসে ৪ জানুয়ারি বিকেল বেলা মহারাজা স্কুলে মুক্তি বাহিনীর মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগদান করি। ১৬ ডিসেম্বরের পর কর্ণেল শাহরিয়ারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগ দিতে আমাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নির্দেশ ছিল। ক্যাম্পে আমি ৫ জানুয়ারি প্যারেড করি। ৬ জানুয়ারিও সকাল বেলা প্যারেড করি। ৬ জানুয়ারি বিকাল বেলা ঘোড়াঘাট থেকে উদ্ধার হওয়া দুই ট্র্যাক অস্ত্র ক্যাম্পের মাঠে আনা হয়েছিল। সন্ধ্যার আগে অস্ত্রগুলো গাড়ি থেকে নামানোর সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ফলিন করানো হচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে ফলিন হয়েছিল, অনেকে খাওয়া-দাওয়া করছিল, অনেকে নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মাগরিবের নামাজ পড়তে আমিও ওজু করতে যাই। মহারাজা স্কুল মাঠে এখন যেখানে মসজিদ রয়েছে, তখন সেখানেই একটি টিনের মসজিদ ছিল। আমি মসজিদের পাশে ওজু করার জন্য যখন বসেছি, ঠিক তখুনি বিকট শব্দে পুরো মিলিশিয়া ক্যাম্প বিস্ফোরিত হলো। বিস্ফোরণের সাথে সাথে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।

এই ঘটনার প্রায় ছয় ঘন্টা পর রাত ১২টার দিকে আমার চেতনা ফিরে আসে। চেতনা ফেরার পর নিজেকে দিনাজপুর সদর হাসপাতালে দেখতে পাই। তখনো পুরো শরীর জুড়ে ধুলো-বালির আস্তরন ছিল। সোই সাথে সারা শরীর জুড়ে তীব্র ব্যথা হচ্ছিল। কিন্তু কেন আমার এই অবস্থা স্মরণে আসছিল না। আমি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করি, কি ব্যাপার, কি হয়েছে, কেন আমি এখানে? লোকজন তখন জানায় যে, মিলিশিয়া ক্যাম্পের অস্ত্র গুদাম বিস্ফোরিত হয়েছে। ক্যাম্পে আমি মাটির স্তুপে চাপা পড়েছিলাম। আমার মাথা ছাড়া পুরো শরীর মাটির তলে চাপা পড়েছিল। আমার সেন্স ছিল না। তারপরেও গলার ভেতর থেকে এক ধরনের গোঙানির আওয়াজ হচ্ছিল। সেই আওয়াজ পেয়ে লোকজন আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

ঐ ঘটনায় পুরো শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলাম। সবচেয়ে বেশি আঘাত ছিল বাম হাত ও বাম পায়ে। বাম হাত এখনো অচল, প্রস্রাব-পায়খানার কাজ এখনো ডান হাতে সারি। বাম হাতে কোন শক্তি পাই না। ঘটনার পর আমার পুরো শরীর বিষ-ব্যথায় ভরে গিয়েছিল। প্রায় এক মাস ধরে কানে শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া কিছু শুনতে পেতাম না। দিনাজপুর সদর হাসপাতালের পর আমার চিকিৎসা হয়েছে রাজশাহীতে। সেখানে হাতের অপারেশন হয়েছে। আরো পরে ফুলবাড়ির মুক্তিযোদ্ধা হাজী মনসুর আলী সরকারের নেতৃত্বে ঢাকায় এসে চিকিৎসা নিয়েছি। ঢাকায় আসার পর আমিসহ প্রায় ছয় শত মুক্তিযোদ্ধা মগবাজারের সুশ্রী ভবনে থাকতাম। কিন্তু ১৯৭৪ সালে সেখান থেকে আমাদেরকে বের করে দেয়া হয়। এরপর আমি চিরিয়াখানা সংলগ্ন এই কমপ্লেক্সে জায়গা পেয়েছি এবং এখানেই বসবাস করছি। এখানেও আমার জীবনে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। আমার একমাত্র ছেলে নুর আলম বাবু যুবলীগ করত। সে কোন সন্ত্রাসী ছিল না। কিন্তু মিথ্যা প্ররোচনায় তাকে সন্ত্রাসী সাজিয়ে র‌্যাব হত্যা করেছে। ৬ জানুয়ারির ট্র্যাজেডির চেয়েও এটা এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনীল কুমার রায় (৬২)
পিতা- মৃত দৌলত চন্দ্র রায়মাতা- মৃত অনন্তময়ী রায়, স্থায়ী ঠিকানা ঃ সাং- শমসেরনগর, থানা- ফুলবাড়ী, জেলা- দিনাজপুর। বর্তমান নিবাস ঃ কক্ষ নং ঃ বি-১০, মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১, কলেজগেট, মোহাম্মদপুর, ঢাকা;

অনীল কুমার রায়আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজারামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। একাত্তরে চৈত্র মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানি দোসর কেনান শাহ ও তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গ, যারা সবাই ছিলেন মুসলিম লীগের পান্ডা, তারা আমাদের গ্রামে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, খুনখারাবি করে। তাদের হামলায় এপ্রিলের প্রথম দিকে আমাদের গ্রামের একজন মারা যায়। এমতাবস্থায় আমাদের গ্রামের সবাই পালিয়ে যেতে থাকে। আমার বাবাও পরিবারের সবাইকে নিয়ে পার্বতীপুরের বেজাই মোড়, জলপাইতলী হয়ে ভারতের কুমারগঞ্জে পালিয়ে গেলেন। সেখানে আমরা শরণার্থী শিবিরে উঠি। কিন্তু সেখানে গিয়েই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে মনোস্থির করি। আমি কাটলা ক্যাম্পে যোগাযোগ করি এবং ১৫-১৯ এপ্রিলের মধ্যে ঐ ক্যাম্পে যোগ দেই।

যেদিন ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিলাম, সেদিন ফুলবাড়ির শমসেরনগর নিবাসী রনজিৎ কুমার রায়, পিতা- অবিনাশ চন্দ্র রায়, প্রেমানন্দ রায়, পিতা- রাজেন্দ্রনাথ রায়, পার্বতীপুরের রামচন্দ্রপুর নিবাসী পুষ্প চন্দ্র রায় পিতা- কেদার মন্ডল, রমেশচন্দ্র রায়, পিতা- অজ্ঞাত, বেলাইচন্ডী বৈরাগীপাড়ার চিত্তরঞ্জন রায় পিতা- সুরেন্দ্রনাথ রায়, পার্বতীপুরের নীলকান্ত রায়, পিতা- দেবকুন্ডা প্রমুখ যুবক ঐ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট হয়েছিলেন। তখন ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আ ল ম ফজলুর রহমান (পরে বিডিআর মহাপরিচালক)।

কাটলা ইয়োথ ক্যাম্পে যোগ দেয়ার তিন সপ্তাহ পর পানিঘাটায় উন্নত অস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করি এবং পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে অপারেশন চালাই। আমি এবং আমার সাথের মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত গেরিলা যুদ্ধ করতাম এবং জলপাইতলী, ভেরম, উদরানী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যাওয়া-আসা করতাম। অকস্মাৎ অপারেশন চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে আতংক সৃষ্টি করা, ব্যতিব্যস্ত রাখা ছিল আমাদের প্রধান কাজ। হঠাৎ অপারেশন চালিয়ে, কিছু গুলি খরচ করে পালিয়ে আসতাম। কখনো কখনো সম্মুখ যুদ্ধেও অংশ নিতাম।

সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে আমাদের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল ফুলবাড়ির গনিপুর মাছুয়াপাড়া এলাকায়। একজন হাবিলদারের নেতৃতে¦ আমাদের ৫০ জন মুক্তি সেনা ছিলেন। আমরা সন্ধ্যার দিকে গনিপুর মাছুয়াপাড়া এলাকায় পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে অভিযান চালালে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধের সময়কাল ছিল মাত্র আধা ঘন্টা। কিন্তু অল্প সময়ের ঐ যুদ্ধটাই ছিল ভয়াবহ। ঐ যুদ্ধে ইসমাইল হোসেন ও মোয়াজ্জেম হোসেন নামের দুই জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়। ইসমাইল পার্বতীপুরের হুগলীপাড়ার অধিবাসী। মোয়াজ্জেম ফুলবাড়ি ডিগ্রী কলেজের আজিজ প্রিন্সিপালের ভাই। ঐ যুদ্ধে আরো ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছিলেন। তারা হলেন পার্বতীপুরের রামচন্দ্রপুরের পুষ্পজিৎ রায়, শমসেরনগরের রণজিৎ রায়, সরকারপাড়ার নুরুল ইসলাম প্রমুখ। প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার পর এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম যুদ্ধ। ঐ যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়।

এর পরের যুদ্ধ হয় ভবানীপুরের ঘুঘুমারী গ্রামে। অক্টোবরের দিকে এটাও ভয়াবহ যুদ্ধ ছিল। সকাল থেকে শুরু হয়ে বিকাল পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলার পর পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে য়ায়। দু পক্ষের যুদ্ধে এখানে কয়েকজন সাধারণ পাবলিক মারা যায়।

১৬ ডিসেম্বর যেদিন দেশ স্বাধীন হয়, সেদিন আমি ফুলবাড়িতে অবস্থান করছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদেরকে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে আঙ্গিনাবাদ ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সেই মোতাবেক আমি ফুলবাড়ি হতে ভারতের আঙ্গিনাবাদে গিয়ে ২৫ ডিসেম্বর অস্ত্র জমা দেই এবং বকেয়া ভাতাদি প্রাপ্তির জন্য ৭নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার তরঙ্গপুরে গিয়ে আমার নাম রেকর্ড করি। তরঙ্গপুরে ২-৩দিন অবস্থান করার পর আবার দিনাজপুরের দিকে রওনা দেই। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি সকালে দিনাজপুরে আসার পর আমি মহারাজা স্কুলের মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্পে যোগ দেই। তখন তো জানতাম না যে, সকালে যোগ দিয়ে সন্ধ্যার মধ্যেই ভয়ংকরতম পরিস্থিতির শিকার হতে হবে! আমি আমার গ্রæপ কমান্ডারের সাথে আলোচনা করে সকালে ক্যাম্পে যোগ দিয়ে নাম-ধাম তালিকাভুক্ত করিয়ে দুপুর বেলা শহর দেখতে বের হই। দুপুরের খাওয়া সারি হোটেলে। এরপর সন্ধ্যার আগে আবার ক্যাম্পে ফিরে যাই। ক্যাম্পে এসে বিকালের খাওয়া করি। খাওয়ার পর বাঁশি বাজিয়ে আমাদের রোল কল করা হয়। এরপর ফলিন করতে বলা হয়। আমি স্কুল ভবনের সামনে ফলিনের প্রথম লাইনে পূর্বমুখী হয়ে ফলিন হই বা লাইনে দাঁড়াই। ঐ সময় প্রায় ৩-৪ শত মুক্তিযোদ্ধা সেখানে ফলিন করেছিলেন।

আমাদের ফলিন হওয়া চলছিলই। এমন সময় দুটো বিকট আওয়াজ হলো। সাথে সাথে অগ্নি কুন্ডলী, ধূ¤্র কুন্ডুলী, ধুলির কুন্ডলী এমনভাবে আমাকে আক্রমণ করল যে, চোখ মেলে তাকানোর অবস্থা ছিল না। চোখ বন্ধ অবস্থায় অনুভব করলাম যে, আমার মাথায় ভীষণ জোরে কেউ যেন বাড়ি মারল। আমার ধারণা হলো এই অবস্থা ছিল ১৫-২০ মিনিট। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আমার বোধ হয়েছিল, পাকিস্তানি সৈন্যরা বোধহয় আমাদের উপর হামলা করেছে। তাই জীবন রক্ষার জন্য দৌড় দিলাম। আর দৌড় দিতে গিয়েই ধপাস করে পড়ে গেলাম। পড়ে গিয়ে বুঝলাম যে, আমার পা ভেঙ্গে গেছে, পায়ের ভাঙ্গা অংশ ও ক্ষত দিয়ে প্রচুর রক্তপাত হচ্ছে। এই রকম ভয়ংকর অবস্থাতেও কেমন করে আমার চেতনা ছিল জানি না। আমি রক্তপাত বন্ধ করতে আমার প্যান্টের অংশ বিশেষ ভাবে মল্টিয়ে ক্ষতের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। কিন্তু রক্তপাত বন্ধ করা যায়নি কোনভাবেই। বিস্ফোরণের পর চতুর্দিক থেকে পানি পানি বলে আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার নিজের গলা দিয়েও পানি পানি বলে আর্তনাদ বের হয়ে এলো।

অবশেষে ঘন্টাখানেক পর লোকজন এসে আমাকে উদ্ধার করলেন। যখন উদ্ধার করা হলো, তখনো চেতনায় ছিলাম। আমাকে উদ্ধার করে দিনাজপুর সদর হাসপাতালের ফ্লোরে এনে রাখা হলো। চিকিৎসা হওয়ার পরেও বিøডিং চলছিল। অবস্থার অবনতিতে আমাকে এবং আরো ২০-২৫ জন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে ঐ রাতেই রংপুর মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হলো। রংপুরে একমাস চিকিৎসা হয়েছে। এই এক মাস আমার জীবনের কঠিন সময় গেছে। এই এক মাসের একদিনেও ঘুমাতে পারিনি। জ¦লন্ত অগ্নির মত প্রতিটি রাত কেটেছিল নির্ঘুম অবস্থায়।

বিস্ফোরণের সময় আমার ডান পায়ে শেলের টুকরো বিধেছিল। আর তাতেই পুরো পা আগুনের চেয়েও গরম হয়ে ভক ভক করতো। এটা কোন ভাবেই সহ্য হতো না। এর চেয়ে মরে যাওয়া ভাল বলে মনে হতো। শেলবিদ্ধ এই পায়ের আঙ্গুলগুলো ক্রমে শুকিয়ে গিয়েছিল এবং আমার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। অবস্থার ক্রমাবনতিতে মাসখানেক পর চিকিৎসকগণ অপারেশন করে আমার পা কেটে ফেলেন। এরপর আরো প্রায় সাড়ে ৬মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে সিএমএইচে এনে ভর্তি করানো হয়। সেখানে আরো ৭-৮ মাস চিকিৎসা নেয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠেছি তবে যে পা হারিয়েছি, তা আর জোড়া লাগে নাই।

সুধীর চন্দ্র রায় (৬৭)
পিতা- মৃত ধরণী ধর রায়, মাতা- মৃত রাজেশ^রী রায়, স্থায়ী ঠিকানা ঃ সাং- চন্ডীপুর, ৭নং মোস্তফাপুর ইউপি, থানা- পার্বতীপুর, জেলা- দিনাজপুর। বর্তমান নিবাস ঃ কক্ষ নং ঃ ৯/২৪৯ রুপনগর টিনসেড, পল্লবী, ঢাকা;

সুধীর চন্দ্র রায়

১৯৭১ সালে আমি নীলফামারী ডিগ্রী কলেজে বিএসসি’র ছাত্র ছিলাম। ঐ কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম এবং ৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। থাকতাম নীলফামারীর উলটপাড়ায়।

পার্বতীপুরে ২৫ মার্চ হতে বাঙালি-বিহারী জ¦ালাও- পোড়াও শুরু হলে সেই খবর নীলফামারীতে বসেই জানতে পারি। এমতাবস্থায় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ট্রেনযোগে নীলফামারী হতে পার্বতীপুরের নিজ বাড়িতে ফিরে আসি এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে খাদ্য যোগানোর কাজে সহযোগিতা করি। কিন্তু এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা ক্রম অগ্রসর হতে থাকলে মামাত ভাই পরেশ চন্দ্র রায়কে সঙ্গে নিয়ে এপ্রিল মাসেই সীমান্ত পার হয়ে ভারতের কুমারগঞ্জের তালতলা বাজারে যাই এবং ইপিআর বাহিনীর জন্য আটা কিনে আনি। ঐ আটা বাড়িতে এনে গ্রামের মেয়েদের সহায্যে রুটি বানিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণরত ইপিআর-পুলিশ বাহিনীকে খাওয়ার জন্য গুড়সহ দেই।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ১ এপ্রিল হতে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ফুলবাড়ি মুক্ত এলাকা ছিল। ঐ সময় পার্বতীপুরে আমাদের গ্রামসহ আরো বিভিন্ন গ্রামের মানুষ নিরাপদ ছিলাম। কিন্তু ৯ এপ্রিলের পর পাকিস্তানি বাহিনী সার্চলাইট অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। তারা গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে দিতে থাকে। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট করতে থাকে। অবস্থা খারাপ হয়ে ওঠায় আমাদের পরিবার ভারতের থলসামা গ্রামে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর আমরা তালতলায় এসে বসবাস করতে থাকি। সেখান থেকে আমি ও চিত্ত রায় গঙ্গারামপুরের শিববাড়ি ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগ দেই।
শিববাড়ি ক্যাম্পে প্রায় এক মাস ট্রেনিং গ্রহণ করি। এরপর ৩০ জুন আমাকে শিলিগুড়ির পানিঘাটায় উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। সেখনে প্রায় দুই মাস ট্রেনিংয়ের পর আমাকে তরঙ্গপুরে পাঠানো হয়। তরঙ্গপুর থেকে শিফট করা হয় বরাহরপুর ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন এস এস বার্ট ও রনোজিৎ সিং। বরারহরপুর ক্যাম্প থেকে আমার নেতৃত্বে পাঁচ জনের একটি টিমকে ফুলবাড়ির চিন্তামন ডাক বাংলোয় রেকি করতে পাঠানো হয় আগস্ট মাসের ৫-৬ তারিখে। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প ছিল। আমরা রেকি করার পর ৭-৮ আগস্ট মোহনপুর ব্রিজের কাছে পাঠানো হয় হ্রাসমান ফায়ার করার জন্য। এই গ্রæপে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। নেতৃত্বে ছিলাম আমি। আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে মোহনপুর ব্রিজের কাছাকাছি হাজীপাড়া আম বাগানের কাছ থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের সম্ভাব্য অবস্থানের দিকে গুলিবর্ষণ করি। প্রত্যেকে গুলি করি ৮-১০ রাউন্ড করে। গুলি করেই পালিয়ে যাই। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাপক গোলা বর্ষণ ও বোম্বিং করতে থাকে। ততক্ষণে আমরা তাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে সমর্থ হই।

১১ আগস্ট আমি সহ ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা পার্বতীপুরের ফরিদপুর বাজারে অবস্থান নেই। এই গ্রæপে পার্বতীপুরের বাসুপাড়া নিবাসী আমজাদ হোসেন কমান্ডার এবং আমি ডেপুটি কমান্ডার ছিলাম। ফরিদপুর বাজার থেকে ২০ আগস্ট খোলাহাটিতে অপারেশনে যাই এবং অ্যামবুশ করে খোলাহাটি রেল ব্রিজ ভেঙ্গে ফেলি। ব্রিজ ভাঙ্গার অপারেশনে নেতৃত্ব দেন পার্বতীপুরের আলাউদ্দিন আহমেদ। ব্রিজ ভাঙ্গার পরদিন ২১ আগস্ট খোলাহাটিতে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে আমাদের প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানি বাহিনী বিহারী ও রাজাকারদের সহায়তায় আমাদের উপর হামলা চালায় এবং খোলাহাটির পূর্ব দিকের গ্রামগুলোতে অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণ ও লুটপাট করে। এই অপারেশনে আমরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম ৬৫ জন। ঘন্টাব্যাপী প্রবল যুদ্ধের পর শত্রæরা পালিয়ে যায়। আমরা তাদের ৬টি রাইফেল পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করি।

সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ভবানীপুর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে প্রবল যুদ্ধ হয়। আমরা ৬৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ভবানীপুরে তিলাই নদীর পূর্ব দিকে অবস্থান নেই। পাকিস্তানি সেনারা পশ্চিম দিকে রেল লাইনের উপর অবস্থান নেয়। সকাল ৯টা হতে শুরু করে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এখানে প্রবল যুদ্ধ হয়। প্রবল যুদ্ধ হলেও কেউ হতাহত হয়নি। বিকাল ৪টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলার পর গুলি ফুরিয়ে আসায় আমরা সরে যাই।
রমজান মাসের মাঝামাঝি আমরা নবাবগঞ্জের ভাদুরিয়া গ্রামে অপারেশন চালাই। সেখান থেকে পরে বদরগঞ্জের কাছাকাছি এলাকায় পীস কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করি এবং তাকে হত্যা করি। ঐ এলাকার পাকিস্তান পন্থী এমপি’র বাড়িতেও অপারেশন চালাই। কিন্তু তাকে পাইনি।

অক্টোবরের প্রথম দিকে রংপুরের শঠিবাড়িতে অপারেশনের জন্য একবার রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অপারেশন না করেই ফিরে আসি।

বাংলাদেশের ভিতরে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নেয়ার পর আমরা সাধারণত পার্বতীপুরের আনন্দ বাজার সংলগ্ন গ্রামগুলোয় রাত যাপন করতাম। এই গ্রামগুলো অনেকটা নিরাপদ ছিল এবং লোকজন আমাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করতেন।

একবারের একটি ঘটনা হলো, আমি আনন্দবাজারে জনৈক বাবুলের বাড়িতে রাত যাপন করেছি। পরদিন সকালে বাবুলের মেয়ে কোথা থেকে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা তোমার জামাইকে মুক্তিযোদ্ধারা মেরে ফেলেছে।

এ কথা শুনে বাবুল মেয়েকে সান্ত¡না দিয়ে বলেন, মা তুমি কেঁদোনা। জামাই রাজাকার ছিল তাই মুক্তিযোদ্ধারা মেরেছে। আমি তোমাকে আবার ভাল জায়গায় বিয়ে দিব।

জামাইকে মেরে ফেলার কথা শুনে বাবুল ইচ্ছে করলে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারতেন। কারণ আমি মুক্তিযোদ্ধা এটা তিনি জানতেন। কিন্তু তিনি জামাইয়ের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়ে মেয়েকে সান্ত¡না দিলেন।

ফুলবাড়ি ৪ ডিসেম্বর এবং পার্বতীপুর ৬ ডিসেম্বর মুক্ত হয়েছিল। পার্বতীপুর দখলের যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। এর মধ্যে সোহরাব হোসেন নামের একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম মনে আছে।

পার্বতীপুর মুক্ত হওয়ার পর জ্ঞানাংকুর উচ্চ বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আমি এই ক্যাম্পে ছিলাম। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর আমি পার্বতীপুর থেকে ভারতের তালতলায় বাবা-মায়ের কাছে যাই। সেখান থেকে ১৯৭২ সালেরর ৩ জানুয়ারি তরঙ্গপুরে গিয়ে অস্ত্র জমা দেই। সেখানেই আমাকে দিনাজপুরের মহারাজা স্কুল ট্রানজিট মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগ দিতে বলা হয়। এই নির্দেশে ভারতের ডাঙ্গারহাট হয়ে ৫ জানুয়ারি দিনাজপুরে আসি এবং লিলি সিনেমা হল সংলগ্ন নুরুল হুদা চৌধুরীর বাড়িতে রাত যাপন করি। ৬ জানুয়ারি সকাল ১০-১১টার দিকে আমি, অনীল, তোজাম্মেল মহারাজা ক্যাম্পে যোগ দেই। সেখানে সারাদিন অবস্থান করি। বিকাল ৪টায় আমাদেরকে খাবার দেয়া হয়। ফলিন হয়ে খাওয়া করি। খাওয়া শেষ হলে আমাদেরকে বিশ্রাম নিতে বলা হয়। আমরা স্কুলে একটি ঘরে বিশ্রাম নেই। বিকাল পৌনে ৬টার দিকে হুইসেল বাজানো হয়। হুইসেলের শব্দে আমরা আবার ঘর থেকে বের হয়ে আসি। তখন আমাদেরকে ফলিন হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ফলিন হই। লাইন তখনো কমপ্লিট হয় নাই। আর তখুনি সেই ভয়াবহ তান্ডব শুরু হয়। হঠাৎ মাইন বিস্ফোরণে ক্যাম্পের পুরো অস্ত্র ভান্ডার বিস্ফোরিত হয়। এতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় মিলিশিয়া ক্যাম্প। বিস্ফোরণের সাথে সাথে আমার চেতনা লোপ পেয়েছিল। যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন নিজেকে উলঙ্গ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। পুরো শরীর তখন রক্তাক্ত। বাম পা, বাম পাঁজর সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়েছে বুঝতে পারি। আমার আশে-পাশে যারা ছিলেন তাদেরকেও একই রকম বস্ত্রবিহীন ও রক্তাক্ত দেখতে পাই। তখন চতুর্দিক থেকে আল্লাহ, হরি, ভগবানের নামে আর্ত চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। আর পানি পানি শব্দও পাচ্ছিলাম। সে এক ভয়ংকর অবস্থা। ঐ অবস্থায় দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু উঠতে পারি না। পায়ে, শরীরে তীব্র যন্ত্রণা আর অসাড় ভাব। হঠাৎ একজন এসে আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। কিন্তু আমি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাই। এরপর আমাকে কোলে করে একটি গাড়ীতে তোলা হয়। গাড়ীতে তোলার সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমাকে মহারাজা স্কুল হতে সরাসরি রংপুর মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে মাসখানেকের চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছিলাম।

আজহারুল আজাদ জুয়েল, সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক এবং সভাপতি, বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments