মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝিনাইদহের দলিত জনগোষ্ঠীর গৌরবময় অবদান থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁরা এখনও বৈষম্যের শিকার

 Posted on

ছবি :ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার দলিত জনগোষ্ঠীর মুক্তিযোদ্ধা মন্টু দাস, স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করলেও স্বীকৃতি মেলে নাই বরং নানা রকমের বৈষম্য তাড়া করে ফেরে।

মোঃ খলিলুর রহমান, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি ::
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার ঝিনাইদহ জেলা এক সমৃদ্ধ জনপদ। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বিপ্লবী বীর বাঘা যতীন, তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্র, মরমী কবি লালন শাহ্, পাগলা কানাই, বীর প্রতীক সিরাজুল ইসলাম, গণিত শাস্ত্রবিদ কে.পি.বসু, কবি গোলাম মোস্তফা, বারো আউলিয়ার আর্শীবাদপুষ্ট বারোবাজার, গাজী-কালু-চম্পাবতির উপাখ্যান, কুমার-কপোতাক্ষ, চিত্রা, বেগবতী, নবগঙ্গাঁ নদী আর খেজুর গুড়, কলা-পানের প্রাচুর্য মন্ডিত এই ঝিনাইদহের রয়েছে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে গৌরবময় ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাঙালি জাতির গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের এই জনপদ ঝিনাইদহের অবহেলিত দলিত জনগোষ্ঠীর ত্যাগ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।

সাধারণত সমাজের অবহেলিত দলিত শ্রেণীর সাধারণ মানুষের ত্যাগের ইতিহাসকে পুঁজিবাদী সমাজে খুব একটা বড় করে দেখা হয় না। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে দলিত সম্প্রদায়ের কামার, কুমার, জেলে, ধোপা, নরসুন্দর, হরিজন, কলু, বেহারা, পাটনী সহ সকল দলিত সম্প্রদায়ের ত্যাগের অবদানকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই কেননা যে কোন যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয় বেশি সমাজের এই দলিত জনগোষ্ঠীর লোকেরা।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝিনাইদহের দলিত জনগোষ্ঠীর অবদানের বিষয়ে ঝিনাইদহের প্রত্যন্ত এলাকার দলিত জনগোষ্ঠীদের সাথে সরেজমিনে কথা হয়। ঝিনাইদহের দলিত সম্প্রদায়ের হামদহ দাসপাড়ার অমরেশ দাস স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও স্বীকৃতি স্বরূপ কোন মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র পান নাই। ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার সাবেক বিন্নী গ্রামের দলিত সম্প্রদায়ের মুক্তিযোদ্ধা মন্টু দাস মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও স্বীকৃতি স্বরূপ কোন সনদপত্র পান নাই এবং সরকার কর্তৃক কোন সুযোগ সুবিধা পান নাই বলে জানালেন। তিনি বর্ণনা করলেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঝিনাইদহের অবহেলিত দলিত সম্পদায়ের করুণ ইতিহাসের কথা। স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মন্টু দাসের মত দলিত সম্প্রদায়ের অনেকেই সেদিন শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করেছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। সমাজের ধনী শ্রেণীর চেয়ে সেই দিনগুলোতে দলিত শ্রেণীর মানুষদের দশা ছিল জরাজীর্ণ কেননা স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন সময়ে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, নিরাপত্তা কোনটারই ব্যবস্থা তাদের ছিল না।
ঝিনাইদহের দলিত জনগোষ্ঠীসহ আপামর জনসাধারণের রয়েছে বীরত্বের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে মন্টু দাসের মতো ঝিনাইদহের দলিত জনগোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্য সহ সর্বস্তরের মানুষ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মন্টু দাসের মতে ঝিনাইদহে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সবসময়ই জীবনকে তুচ্ছ মনে করে ঝিনাইদহের দলিত জনগোষ্ঠীর লোকেরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আর তাই ঝিনাইদহ জেলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ গুরূত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

বাঙালী জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হলো-আমাদের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালে এ জেলার অধিবাসীগণ বারুদের স্তুপের মতো একযোগে বিস্ফোরিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিশিখা জ্বেলেছিল রণাঙ্গনে, শহরে-বন্দরে, গ্রাম-গঞ্জে। তদানীন্তন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন এই মর্মে রেসকোর্স ময়দানে ‘‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’ এবং ‘‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’’ বলে আহবান জানালেন তখন ঝিনাইদহেও অবরোধ প্রস্তুতি ব্যাপকভাবে শুরু হয় এবং গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন সব কিছুই সম্ভব হয়েছিল ঝিনাইদহের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার ফলে তাই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝিনাইদহের অবহেলিত দলিত জনগোষ্ঠীর অবদানকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই।

১লা এপ্রিল, ১৯৭১ বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে বারোটায় হঠাৎ খবর আসলো হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিষয়খালী আক্রমণের। তড়িৎ গতিতে মুক্তিবাহিনী প্রধান মাহবুব সাহেব প্রতিরোধ বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন বিষয়খালী অভিমুখে। উভয় পক্ষে সামনা সামনি যুদ্ধ হলো। এটাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সমর। ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিল ঠিক দুপুর একটার সময়। সেদিন ঝিনাইদহের সকল শ্রেণী পেশার মানুষই ঝাপিয়ে পড়েছিল তবে তাঁরা ছিল অনভিজ্ঞ এবং তাদের ছিলনা ভারি কোন অস্ত্র, কিন্তু তাতে কি? মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে তারা মরণকে হাসিমুখে বরণ করতে রাজী। কামানের গোলা ব্যর্থ হয়ে গেল তাদের অসীম সাহসের কাছে। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী অতিক্রম করতে পারলো না বিষয়খালী নদী, তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল যশোর ক্যান্টনমেন্টে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যুদ্ধ বিজয়ের গৌরবের প্রথম মাইল ফলক স্থাপন করল এই বিষয়খালীর যুদ্ধে। এই যুদ্ধের কাহিনী প্রথম বিদেশী রেডিও বিবিসি, ফরাসি বার্তা সংস্থা এবং অস্ট্রেলীয় রেডিও এবিসিতে প্রচারিত হয়।

এছাড়াও ভারতে ট্রেনিং প্রাপ্ত ঝিনাইদহ জেলার নওজোয়ানরা মুক্তিবাহিনীর নির্দেশ মতো হানাদার এবং তাদের দোসর রাজাকারদের সমূলে বিনাশ করতে থাকে। এমন কয়েকটা প্রচন্ড গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শৈলকুপা উপজেলায় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলি হচ্ছে (১) শৈলকুপা থানা আক্রমণ (২) কামান্নার যুদ্ধ (৩) আবাইপুর হাই স্কুল প্রাঙ্গনের যুদ্ধ (৪) আলফাপুরের যুদ্ধ ইত্যাদি। তবে এক্ষেত্রে ঝিনাইদহের দলিত জনগোষ্ঠীর লোকেরা গেরিলা যোদ্ধাদেরকেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সহযোগিতা করেছিল বলে জানালেন মুক্তিযোদ্ধা মন্টু দাস।

এভাবে সারা জেলায় মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ শেষে ৩ ডিসেম্বর মহেশপুর, ৪ ডিসেম্বর কোটচাঁদপুর, ৫ ডিসেম্বর কালিগঞ্জ ও ৬ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ শহরস্থ সমগ্র জেলা স্বাধীন হয় সমগ্র বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই যার মূলে রয়েছে দলিত সম্পদায় সহ সমাজের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ।

মন্টু দাস আক্ষেপ করে বললেন- আমাদের কী গেল, কী পেলাম। কিংবা রক্তের ঋণ কি শোধ হয়েছে? দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের মুক্তি কি এসেছে?

আমরা গর্ব করে বলি, আমাদের একটি স্থায়ী ঠিকানা আছে। পাঁচ দশক পরও আমরা দেখি লাখ লাখ বস্তি বাসী, ভাসমান মানুষ, যাদের বুলডোজারের তাড়া খেয়ে এখান থেকে ওখানে ছুটে বেড়াতে হয়। সব কর্মক্ষম মানুষ কি সম্মানজনক কাজের সংস্থান করতে পেরেছে ? ফুটপাতে তাড়া খাওয়া ফেরিওয়ালাদের কথা ভাবলেই মনে হয়, একদিকে শহরকে সুন্দর করার আয়োজন, অন্যদিকে দেখি ওই মানুষগুলোর পেছনে একটি করে নিরন্ন পরিবার। এখনো মানুষ চাল-ডাল-পেঁয়াজ-বিজলির দাম নাগালের মধ্যে পাওয়ার দাবিতে পথে নামে। স্কুলে খেলার মাঠ তো দূরের কথা, অনেক জায়গায় মাথার ওপর ছাদও নেই।
কিন্তু আমরা যা চাইনি, তাও ঘটছে। আমাদের সমাজের বুনন, মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা প্রতিনিয়ত ঝাঁকুনি খাচ্ছে। রাজনীতিতে সুবিধাবাদ এবং মেধাহীন নেতৃত্ব জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। রাজনৈতিক আন্দোলন এখনো সহিংস। মানুষ পেটানোর মধ্যে এখনো অনেকে আনন্দ পায়। গাড়ি ভাঙচুর করে পুলক অনুভব করে। এই স্বাধীনতা তো আমরা চাইনি।
যে স্বাধীনতায় সমাজের আপামর সকলেই অবদান রেখেছে সেই স্বাধীনতার এত বছর পরও সমাজের দলিত সম্প্রদায়ের লোকেরা নানা রকমের শোষণ, জুলুম ও বৈষম্যের শিকার।
তাই স্বাধীনতা সংগ্রামকে অর্থবহ করে তুলতে হলে দলিত জনগোষ্ঠীদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

মোঃ খলিলুর রহমান, তৃণমূল সংবাদকর্মী এবং বাংলাদেশ দলিত হিউম্যান রাইটস্ মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments