মণিপুরি মহারাসলীলা রাখাল নৃত্যে মানবপ্রেম

 Posted on

মণিপুরি ললিতকলা অ্যাকাডেমি প্রাঙ্গণ এবং আদমপুরে মণিপুরি শিশুদের বর্ণিল রাখাল নৃত্যের মাধ্যমে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে শুরু হয়েছে মণিপুরি মহারাসলীলা উৎসব। মণিপুরি পল্লির বাড়ির উঠানে ছেলেমেয়েরা এক মাস ধরে নাচের প্রশিক্ষণ শেষে গতকাল সোমবার মাধবপুর ও আদমপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মণিপুরি মহারাসলীলা উৎসব। এ উৎসবের রাখালনৃত্যে বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি ও সত্যসুন্দর মানবপ্রেমের আরাধনা করা হয়।

তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে মানা হয়নি কোনো স্বাস্থ্যবিধি। গতকাল সোমবার দুপুরে একযোগে মাধবপুরের শিববাজারে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমির সামনের উন্মুক্ত মঞ্চের খোলা ময়দানে বেশ কয়েকটি স্থান ঘিরে কলাগাছ পুঁতে বর্ণিল কাগজ কেটে ফুল ও ঝাঝর দিয়ে সাজানো বৃত্তের মাঝে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি বর্ণিল পোশাকে সেজে শিশুরা রাখাল নৃত্যে অংশ নেয়। রাখাল নৃত্য চলাকালে ভক্তরা বাতাসা নিক্ষেপ করেন রাখাল নৃত্যের তালে তালে। এ সময় বৃত্তের বাহিরে উৎসুক, শিশু-কিশোর ও নারী-পুরুষের ভিড় জমে এই মিষ্টি বাতাসা ধরার জন্য। একইভাবে আদমপুরে দুটি পৃথক স্থানে মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায়ের শিশুদের অংশগ্রহণে শুরু হয় রাখাল নৃত্য। সেখানেও লোকজনকে মাস্ক না পরতে দেখা গেছে। রাখাল নৃত্যের তালে তালে হয়েছে বাতাসা বিতরণ।

এ বছর কমলগঞ্জের মাধবপুর শিববাজার জোড় মন্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের ১৭৮তম রাস উৎসব। মাধবপুরের রাসলীলা আয়োজক হচ্ছে মণিপুরি মহারাসলীলা সেবা সংঘ। গতকাল সোমবার দুপুরে উৎসবস্থলে শুরু হওয়া গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাতে জোড়া মন্ডপে রাসের মূল প্রাণ মহারাসলীলা। রাতভর রাধাকৃষ্ণের প্রণয়োপখ্যানের সে রাসলীলা উপভোগ করতে সারাদেশ থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, কবি-সাংবাদিক, দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদিকে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা না মেনে মাস্ক ছাড়াই দর্শনার্থীরা ঘুরছেন।

অন্যদিকে কমলগঞ্জের আদমপুরে মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায় আয়োজন করেছে ৩৪তম পৃথক রাসলীলা উৎসব। আদমপুরে পাশাপাশি দুটি স্থানে হবে রাস উৎসব। আদমপুর জোড়া মন্ডপ ও মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে। এখানেও থাকবে চলছে রাখাল নৃত্য ও রাতে অনুষ্ঠিত হবে মহারাসলীলা উৎসব। তবে মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায় আলাদা স্থানে আয়োজন করলেও উৎসবের অন্তঃস্রোত, রসের কথা, আনন্দ-প্রার্থনা সবই একই। উৎসবের ভেতরের কথা হচ্ছে বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি ও সত্যসুন্দর মানবপ্রেম।

মাধবপুর ও আদমপুরে আয়োজকরা জানিয়েছেন, মহারাসলীলার মূল উপস্থাপনা শুরু হচ্ছে দুপুর থেকে ‘গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য’ দিয়ে। গোষ্ঠলীলায় রাখাল সাজে কৃষ্ণের বালকবেলাকে উপস্থাপন করা হয়। এতে ছিল কৃষ্ণের সখ্য ও বাৎসল্য রসের বিবরণ। গোধূলি পর্যন্ত চলে রাখালনৃত্য। রাত ১১টা থেকে পরিবেশিত হয় মধুর রসের নৃত্য বা শ্রী শ্রীকৃষ্ণের মহারাসলীলানুসরণ। এই রাসনৃত্য ভোর (ব্রাহ্ম মুহূর্ত) পর্যন্ত চলে।

মণিপুরি মহারাসলীলা সেবাসংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ‘আমাদের মহারাসলীলা হচ্ছে। এখন পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ। নতুন কাপড়চোপড় কেনা হয়েছে। আমাদের কাছে হেমন্তকাল মানেই রাস-পূর্ণিমা, রাস উৎসব। সন্ধ্যায় সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা।

আদমপুর মহারাস উদ্যাপন কমিটির অন্যতম নেতা ইবুংহাল সিংহ শ্যামল বলেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত রাখাল নৃত্য। রাতে মহারাসরীলা। এর আগে সন্ধ্যায় সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা হয়েছে।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক ও কমলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আরিফুর রহমান বলেন, আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তার জন্য দুই জায়গাতেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

Facebook Comments