ভোলায় দলিত শিশুদের স্বপ্ন পূরণে বাধা দরিদ্রতা

 Posted on

অচিন্ত্য মজুমদার ::
“লেখাপড়া শেষ করে ডাক্তার হয়ে সাধারন মানুষের সেবা করবো” সরেজমিনে এমনটাই জানালো ভোলা শহর থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত বাপ্তা ইউনিয়নের হরিজন কলনীর বাসিন্দা ভানু ভক্তের ছেলে ২য় শ্রেনির ছাত্র বিবেক ভক্ত। “লেখাপড়া শিখে পুলিশ হয়ে সমাজ থেকে অপরাধ দমন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবো” জানালো একই কলনীর সমির মজুমদারের মেয়ে ৫ম শ্রেনির ছাত্রী অপর্ণা মজুমদার। আর “পড়ালেখা শিখে শিক্ষক হয়ে শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করবো” জানালেন ওই কলনীর গনেশ ভক্তের মেয়ে ৩য় শ্রেনীর ছাত্রী বৃষ্টি ভক্ত।

এমন সব স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করলেও পারিবারিক দারিদ্রতার কারনে ভোলার দলিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পার হওয়ার পর একটি বিরাট অংশ ছিটকে পড়ে শিক্ষা জীবন থেকে। এর মধ্যে ছেলেদের হার ৫০ শতাংশ এবং মেয়েদের হার ৭০ শতাংশ এমনটাই জানালেন বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠির অধিকার আন্দোলন ভোলা জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক স্বপন কুমার দে। তিনি আরো জানান, ভোলায় দলিত শিশুরা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়না বললেই চলে। তাই জেলার দলিত স¤প্রদায়ের শিশুরা আগের চেয়ে অধিকহারে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দারিদ্রতা এবং লেখাপড়ার প্রতি পারিবারিক অবজ্ঞা ও উপেক্ষার কারণে তাদের মধ্যে ড্রপ আউটের হার অত্যাধিক। ফলে এই জনগোষ্টির মধ্যে উচ্চ শিক্ষিত মানুষ খুবই নগন্য। তিনি জানান, জেলা শহরে ৫৫জন দলিত শিক্ষার্থী শিক্ষায় ভাব অবস্থানে রয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ১৯ জন সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষা উপবৃত্তি পেয়েছে। বাকিদের ব্যাপারে ভোলার সমাজ সেবা অধিদপ্তরে একাধিক বার গিয়েও কোন কাজ হয়নি। দলিত শিক্ষার্থীদের স্থলে সাধারন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এসময় তিনি বলেন, ভোলার দলিত শিশুদের নিয়ে কোন শিশু সংগঠনও কাজ করেনা।

সরেজমিনে হরিজন কলনীর বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, দলিতদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব রয়েছে। তারা যেহেতু চিরস্থায়ী দারিদ্র থাকেন সেহেতু স্বাস্থের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। হাট বাজার রাস্তা ড্রেন টয়লেট অফিস আদালত পরিষ্কারের সুরক্ষা ব্যবস্থা করেন যারা, তাদের পরিস্কারের ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ বা ভ‚মিকা কোনদিন নেয়নি।

কলনীর মধ্যে দলিত শিশুদের জন্য একটি প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বেসরকারি একটি এনজিও সংস্থার অর্থায়নে বিদ্যালয়টি তৈরী হয়েছে। তাদের অর্থায়নেই শিশুদের বই, খাতা, কলমসহ লেখা-পড়ার সকল খরচ চলে। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক জীবন চন্দ্র দে জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে ওই বিদ্যালয়ে দলিত শিশুদের শিক্ষার প্রথম স্তরটা তৈনী করে দেয়া হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৩৩জন শিশু অধ্যায়নরত রয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন ছাত্রী ও ১৩ জন ছাত্র। তিনি আরো জানান, বিদ্যালয়ের ফ্লোর জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পাকা করে দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন সকাল হলেই শিশুদের কলতানে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয়টি।

বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠির অধিকার আন্দোলন ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মানিক লাল ডোম জানান, জেলার ৭টি উপজেলায় প্রায় প্রতিটিতেই রয়েছে দলিত জনগোষ্টির বসবাস। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দলিত জনগোষ্টির পরিবারের পুরুষ ও নারীরা বেশির ভাগই অজ্ঞ। দারিদ্রতা আর শিক্ষার আলো না থাকায় দলিত স¤প্রদায়ের শিশুদের পড়ালেখার প্রতি ঝোক নেই পরিবার প্রধানদের। ছোট থেকেই বাবা-মায়ের সাথে কর্মস্থলে ছুটে চলার কারনে খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এই জনগোষ্ঠির শিশুরা। এছাড়া চিকিৎসা, পুষ্টি, পড়ালেখা এসব কি তাদের মধ্যে ধারনা নেই। এই স¤প্রদায়ের অধিকাংশ পরিবার প্রধানরা ১৫শ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা বেতনে পৌরসভা, হাট-বাজার ঝাড়–, বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী অফিসের পরিছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করে থাকে। এদের জন্য সরকার কোঠা চালু থাকলেও এখন আর তাদের চাকুরী মিলছে না। ফলে তাই ৮-১০ বছর বয়স হলেই শিশুরা বাবা-মায়ের সাথে কাজে জড়িয়ে পড়ে।

অচিন্ত্য মজুমদার, ভোলা জেলা প্রতিনিধি

Facebook Comments