ভূমিদস্যুদের অত্যাচারে নিঃস্ব আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা পাহাড়ি পরিবার

 Posted on

মাহমুদুল গনি রিজন : নৃতাত্তি¡ক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কৃষক পাকাই মাল পাহাড়ি। দুই স্ত্রীর চার সন্তান হাসনা মাল পাহাড়ি, বাবুরাম পাহাড়ি, খুকি মাল পাহাড়ি ও শনি মাল পাহাড়ি। বংশ পরম্পরায় তারা বসবাস করছে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামদিয়া ইউনিয়নের ০১নং ওয়ার্ডের পালোপাড়া গ্রামে। চার সন্তানের মাঝে সম্পত্তি বন্টনে কোনো অভিযোগ ছিল না কারো। খুকি ও বিধবা বোন শনি মাল পাহাড়ির দিন কাটছিল বেশ ভালই। পৈত্রিক সুত্রে জমির পরিমান ছিল ১৮ বিঘা ০৯ শতাংশ। যা দিয়ে তাদের পরিবার চলছিল। খুকির স্বামী হরেন মাল পাহাড়ি মহান মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধত্তোর সময়ে স্বামীর মৃত্যুর পর খুকি তার বাবার বাড়িতে চলে আসেন এক মেয়ে সখিনাকে নিয়ে। অন্য ছেলেমেয়েরা থাকে স্বামীর বাড়িতে। ইতোমধ্যে নিঃসন্তান শনি মাল পাহাড়ির স্বামী মৃত্যবরণ করলে বিধবা বোন শনিও চলে আসে বাবা পাকাই মাল পাহাড়ির বাড়িতে খুকির কাছে। খুকির দুইভাই হাসনা মাল পাহাড়ি ও বাবুরাম মাল পাহাড়ি ও তাদের স্ত্রীরা মৃত্যুবরণ করেন অনেক আগেই। তাদের দুই ভাইয়ের দুই মেয়ে বিয়ে হলে তারাও চলে যায় শ্বশুর বাড়িতে। অর্থাৎ খুকি, শনি দুইবোন ও তাদের এক মেয়েকে নিয়েই বসবাস করতেন ওই বাড়িতে।

খুকির স্বামী মুক্তিযোদ্ধা হরেনের মৃত্যুর পর এই সম্পত্তির উপর নজর পড়ে ভূমিদস্যুদের। নানাভাবে হয়রানি হতে থাকেন খুকির পরিবার। কখনও বাড়িতে হামলা, কখনও বাড়িতে আগুন দিয়ে মিথ্যা মামলা, ফলজ ও বনজ গাছ কর্তন, জোরপূর্বক জমি দখল। বর্তমানে শনি মাল পাহাড়ির পরিবারে পৈত্রিকসুত্রে জমির পরিমান ১৮ বিঘা ০৯ শতাংশ থেকে ১ বিঘা ১০ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এ পর্যন্ত পক্ষে-বিপক্ষে ৬টি মামলা হয়েছে। কোর্টের এইসব মামলা মোকদ্দমা দেখতেন খুকি মাল পাহাড়ি। একের পর এক মানসিক নির্যাতন জর্জরিত খুকি মাল পাহাড়ির পক্ষে বিপক্ষে ৬টি মামলার টানতে গিয়ে এবছর মে মাসে মৃত্যুবরণ করেন। খুকির মৃত্যুর পর বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন খুকির ছোট বোন শনি মাল পাহাড়ি। কোনো কথা বলতে পারেন না তিনি। অসহায় শনি এখন বাকরুদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকেন পৈত্রিক ভিটের এক কোণায়। মেয়ে সখিনা মাল পাহাড়ি ভয়ে, শংকায় কাটাচ্ছেন প্রতিটি মুহূর্ত। এভাবেই কাটছে খুকি মাল পাহাড়ির সংসার।

ভূমিদস্যুরা এতটাই শক্তিশালী যে রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসন যেন তাদের কাছে অসহায়। অথচ খুকি মাল পাহাড়ির স্বামী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া হরেন মাল পাহাড়িরা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত নাগরিক। অথচ সংবিধানের মৌলিক অধিকারটুকু পাচ্ছেন না তারা। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে আদিবাসী হরেন মাল পাহাড়ি দেশ স্বাধীন করে যে সংবিধান আমাদের দিয়ে গেছেন সেই সংবিধানের অধিকার এবং মানবাধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন তারই স্ত্রী-সন্তানরা।

মাহমুদুল গনি রিজন, জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সংবাদ ও রেডিও টু ডে এবং সদস্য, বাংলাদেশ দলিত এন্ড মাইনারিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম

Facebook Comments