বিস্মৃতিতে দিনাজপুরের অন্যতম ভাষা সৈনিক জসিরউদ্দীন ভাদু

 Posted on


-আজহারুল আজাদ জুয়েল-
জসিরউদ্দীন আহম্মেদ ভাদু দিনাজপুর জেলার এক বিস্মৃত ভাষা সৈনিক। বলতে গেলে এই জেলার সবাই তাকে ভুলে গেছেন। কিন্তু বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে, কৃষক-জনতার ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে এবং বাঙালির অমলিন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তেজোদীপ্ত এক নাম হলো জসিরউদ্দীন আহম্মেদ ভাদু।
দিনাজপুর শহরের লালবাগে ১৯১৬ সালে জন্ম জসিরউদ্দীন ভাদুর। পিতার নাম বশিরউদ্দীন আহমেদ, মায়ের নাম জমিলা খাতুন। পিতা পোষ্ট অফিসে চাকুরি করতেন। তিনি বশির পিয়ন নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। জসিরউদ্দীন ভাদুর বয়স যখন ১৩ তখন তার মা জমিলা খাতুন মারা যান। তার এক বোন রাবেয়া খাতুন। মায়ের অকাল মৃত্যুর পর সৎ মা মরিয়মের শ্নেহে তিনি লালিত-পালিত হন।
জসিরউদ্দীন ভাদু ১৯৩৪ সালে মহারাজা স্কুল হতে মেট্রিক পাশ করেন। স্কুল বয়সেই রাজনীতিতে জড়ান। বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী গোপন দলে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৩৭-৩৮ সালে দিনাজপুর জেলায় কমিউনিষ্ট পার্টি গঠিত হলে তিনি এই পার্টিতে সক্রিয় হন। ১৯৪০ সালে প্রথম কারাবরণ করেন। এরপর থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে বলে তার পরিবার সূত্রে জানা যায়। প্রতিবারেই দু-চারদিন করে কারাগারে থেকেছেন।
১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দিনাজপুর জেলায় যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল সেই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মিছিল মিটংয়ে শ্লোগান দিয়ে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতেন। তার গলার আওয়াজে বিপ্লবী ভাব ছিল। খালি গলায় কথা বললেও কন্ঠস্বর অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যেত।
কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক জেলা সভাপতি ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য আলতাফ হোসাইন জানান, সুশীল সেনকে সম্পাদক করে ১৯৩৭-৩৮ সালে তৎকালিন দিনাজপুর জেলায় কমিউনিষ্ট পার্টির গোড়াপত্তন হয়েছিল। ঐ সময় কমিটির সদস্য ছিলেন বিভূতি গুহ, গুরুদাস তালুকদার, সুনীল সেন, হাজী ম্হোাম্মদ দানেশ প্রমুখ। পরবর্তীতে কমিউনিষ্ট পার্টির তিনটি জেলা সম্মেলনে পর্যায়ক্রমে ড. সুনীল সেন, অনীল রায় ও বেনু সেন সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পর্যায়ক্রমে ১৯৬০ সন পর্যন্ত পার্টির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কালে আন্দোলন-সংগ্রামে বিপ্লবী ভূমিকা রাখা কয়েকজন হলেন বরদা ভূষণ চক্রবর্তী, সচীন চক্রবর্তী, কম্পরাম সিং, ননী ভট্টাচার্য, গোপালী ভট্টাচার্য, কালিচক্রবতী, রানী মিত্র, বীনা গুহ, কানাই লাল, মন্টু, ফন্টু, কালি সরকার, নারায়ন হালদার, মনসুর, জিপেন রায়, জিতেন নাথ, স্রবিন্দু মজুমদার, দেবেন্দ্রনাথ রায়, শ্যাম মিত্র, অজয় রায়, কৈলামা কুমার, জসিরউদ্দীন আহম্মেদ ভাদু প্রমুখ।
রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় থাকায় জসিরউদ্দীন ভাদুর সুনির্দিষ্ট পেশা ছিল না। কাঠের ব্যবসা করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। পেশার প্রতি মনযোগ কম থাকায় সর্বদা আর্থিক সমস্যায় থাকতেন। তিনি ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রায় ৯০ বছর বয়সে প্রানত্যাগ করেন। তার সমবয়সীদের কেউ এখন বেঁচে নেই। ফলে তার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া মুশকিল। তার বড় ছেলে আজিজুর রহমান দুলু মারা গেছেন। মেজো ছেলে আনিসুর রহমান (৬৫) ও ছোট ছেলে আতিকুর রহমান (৪৫) বাবার সম্পর্কে খুব্ বেশি কিছু জানাতে পারেন নাই। তাদের পিতা বৃটিশের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং ভাষা আন্দোলনে কাজ করেছেন এই টুকু শুধু বলতে পারেন। আনিসুর রহমানের স্ত্রী (৫৭) আফরেজা বেগম বলেন, আমার শ^শুর এমনভাবে ভাষণ দিতেন যে, সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। তিনি ইংরেজীতে কথ্ াবলতে পারতেন। তাঁকে অনেকে জিজ্ঞাসা করত যে, আপনি কি পাস? তিনি মজা করে বলতেন, ব্রেঞ্চি পাস।
আতিকুর রহমান বলেন, ১৯৪০ সাল থেকে বাবাকে জেলে যেতে হয়েছে অনেক বার, এ কথা বাবাই গল্পে গল্পে বলতেন। আমার মা আনজুয়ারা বেগম বলতেন, পাকিস্তান আমলে বাবাকে ধরার জন্য পুলিশ অনেকবার বাড়ি ঘেরাও করেছিল। বাবা কখনো পালিয়ে যেতে পারলেও ধরাও পড়েছেন কখনো কখনো। ৩-৪ দিন জেলখানায় থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও কখনো টর্চারের শিকার হয়েছেন বলে শোনা যায় নাই। বরং তখন রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে প্রচুর সম্মান পেয়েছেন। ১৯৯৩ সালে লোকভবনে তেভাগা নিয়ে প্রায় তিন ঘন্টার একটি আলোচনা সভায় তিনি সভাপতিত্বে করেছিলেন। ঐ সভায় ইন্ডিয়া থেকেও আলোচক এসেছিলেন। তিনি ছয় দফার আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনেই যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকুড়া এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ করেছেন। ইয়াসমিন হত্যা বিরোধী আন্দোলনে রামনগর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি হয়েছিল। তিনি মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে দেন। আমি তখন বলেছিলাম, আব্বা বাইরে যাইয়েন না, ১৪৪ ধারা আছে, সমস্যা হতে পারে। তিনি ক্ষুদ্ধস্বরে বলেন, কত ৪৪ ধারা ভাঙ্গলাম, আর এটা কি? এই কথা বলেই তিনি মিছিলে বের হন।
জসিরউদ্দীন ভাদু ২০০৫ সালে মারা গেছেন। শেষ জীবনে আহলে হাদীস আন্দোলন, দিনাজপুর জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সংগঠনের অর্থায়নে চিরিরবন্দরের নওখৈরে বিশালাকার একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন।

Facebook Comments