বাঙালি সংস্কৃতি ধরে রাখতে সামাজিক উদ্যোগ ও সরকারি পৃষ্টপোষকতার বিকল্প নেই

 Posted on

অচিন্ত্য মজুমদার, ভোলা :: বাঙালীর লোকজ অস্তিত্বের সকল জীবনাচারণই হচ্ছে লোকসংস্কৃতি। আর লোকজ সত্তায় মিশে আছে বাঙালির উৎসবের নানান দিক। আবহমান কাল ধরে লোকসংস্কৃতি বাঙালির উৎসবের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভ‚মি বাংলাদেশের আনাচে-আনাচে, পল্লীমায়ের কোল জুড়েই লালিত হয়ে বিকাশমান রয়েছে আমাদের লোকজ উৎসব। আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস অনেক পুরনো। তেমনি আমাদের উৎসবের ধারাগুলোও অনেক পুরনো এবং ঐতিহ্যময়। হাজার বছরের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের গৌরবমাখা সোপানে আমাদের বাংলা সংস্কৃতির ভিত্তি মজবুত। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতি আর বিদেশি আগ্রাসনের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগ ও সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাবে দিন দিন বাঙালির লোকজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তাই বাঙালি লোকসংস্কৃতি ধরে রাখা ও এর বিকাশ ঘটানো এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলার মানুষের হাসি-কান্না,আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, বিরহ-যাতনা কিংবা জীবনের পরতে পরতে মাখামাখি হয়ে আছে আমাদের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য। বিপুল শক্তি নিয়ে আমাদের লোকজ সংস্কৃতি সমগ্র বাঙালির হৃদয়ে গ্রথিত। আমাদের ধর্ম-কর্ম, বিবাহ-শাদি, ঈদ আনন্দোৎসব, পুজা-পার্বণসহ জীবনের সর্বত্রই এই সংস্কৃতির স্বরূপ ছড়িয়ে রয়েছে। আমাদের লোকায়ত জীবনের প্রতিটি অঙ্গনেই এক যাদুকরী প্রভাব নিয়ে এই সংস্কৃতি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সঞ্চরণশীল। ভোলা জেলা আবৃত্তি সংসদের আহবায়ক সামস-উল আলম মিঠু জানান, বাংলার সর্ব প্রকার পরিমার্জিত সাংস্কৃতিক অস্তিত্বই আমাদের লোকজসংস্কৃতির অংশ। এছাড়া বাংলা নববর্ষ,পহেলা বৈশাখ এবং শৌর্য-বীর্যগাঁথা বাংলার বারোমাসের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানাদি আমাদের লৌকিক সংস্কৃতির একটা বিরাট মহীরূহ হয়ে আছে। প্রবীণ সাংবাদিক ও ভোলা প্রেসক্লাবের আহবায়ক মোঃ আবু তাহের বলেন, এক সময় বাঙালি সংস্কৃতির বড় অংশই জুড়ে থাকতো ১২ মাসে ১৩ পার্বণ। শরতের আগমনে মাঠে মাঠে কাশফুলের বাগান দেখা মিলত। শীতের আগমনীতে খেজুরের রসের আর নতুন চালের পায়েস ও নতুন চালের গুড়ো দিয়ে তৈরি বাহারি পিঠা রসনা তৃপ্তি করতো। বাঙালি বিয়েতে ব্যবহার হতো পালকি, গরুর গাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ি। ওইসব গাড়ি সাজানো হতো ফুল বা রং-বেরঙের কাগজ দিয়ে। বিয়ে অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়া চলতো কলার পাতায়, শালপাতায় বা কাসার থালায়। কিন্তু নিজের শেকড়কে না জানলে কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব না। আমাদের শেকড় লুকিয়ে লোকগান, হস্তশিল্প ও সাহিত্যে। শহরের নলিনী দাস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উদীচীর সভাপতি অসীম কুমার সাহা বলেন, এক সময় ভোলায় বাড়িতে বাড়িতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ বা চিংড়িই প্রাধান্য পেতো। ধুতি পাঞ্জাবী বা পাজামার সঙ্গে পাঞ্জাবী ভালই মানাতো। বাংলা নববর্ষ বা পৌষ মেলায় হাতে তৈরি বাঁশের বাঁশি, রুটি তৈরির কাঠের বেলান, পিড়ে, মাটির ঘটসহ লোহার তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জাম শোভা পেতো। ১৯৭২ সালের সংবিধান পরিবর্তনের পর থেকে এদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরুদের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। জাত, পাত ও ধর্মের দোহাই দিয়ে দুর্গাপূজাসহ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান মুড়ে ফেলা হয় নিরাপত্তার চাদরে। এরপরও প্রতি বছর কোন না কোন স্থানে ঘটে হামলা। মামলা হয়, শাস্তি হয় না দোষীদের। তাই বাঙালির লোকসংস্কৃতি ও উৎসবকে ধরে রাখতে হলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির অগ্রযাত্রায় বাধাগুলোকে দুর করতে হবে। সব কথার সার কথা হচ্ছে, সবার উপরে মানুষ সত্য। মানুষকে সেটা বঝতে হবে। মানুষের মর্যাদাকে রক্ষা করতে হবে। ভোলার ফাতেমা খানম ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক সাংস্কৃতিক কর্মী রেহেনা ফেরদৌস বলেন, আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সভ্যতা ও সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে। তাতে আমাদের গৌরব বাড়বে বৈ কমবে না। ভোলা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাছুদ আলম ছিদ্দিক বলেন, বাঙালির চিরায়ত উৎসবের মধ্যে পৌষমেলা, পিঠা উৎসব, গ্রামীণ নবান্নের আমেজ, চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষ উদযাপনে দেশীয় সংস্কৃতি লালন ও বিকশিতকরনের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। প্রতি বছর সরকারি পৃষ্টপোষকতায় ভোলায় বাঙালির উৎসবগুলো পালন করা হয়ে থাকে। উৎসবগুলোতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করে।

অচিন্ত্য মজুমদার, ভোলা প্রতিনিধি, ডিবিসি নিউজ, ডেইলী অবজারভার ও পরিবর্তন ডট কম। সদস্য, দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments