প্রয়োজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিকাশ

 Posted on


বিকুল চক্রবর্তী :: বাংলাদেশে কৃষ্টি ও সংস্কৃতি কয়েক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে বিশাল অংশ ধর্মীয়ভাবে উদযাপিত হয়। কিছু আছে লোকজ ঐতিহ্য। ধর্মীয়ভাবে সনাতন (হিন্দু), মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ঠান ধর্মালম্বীদের রয়েছে পৃথক পৃথক সংস্কৃতি ও উৎসব। এর মধ্যে হিন্দু ধর্মালম্বীদের ঐতিহ্য বাঙ্গালীর সংস্কৃতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি প্রবাদ রয়েছে ১২ মাসে ১৩ পার্বন। আর এই পার্বনগুলো সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে। সনাতন শব্দের অর্থ প্রাচীন। হিন্দুরা সনাতন ধর্মালম্বী। তাই প্রাচীনকাল থেকে এ জাতি নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ধরে রেখেছে। সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্মালম্বীরা বছরে দুইবার দূর্গোৎসবের অয়োজন করেন। এর মধ্যে বসন্তকালে একটি ও শরৎকালে একটি। প্রথমে শুধু বসন্তকালে করা হলেও ত্রেতাযুগে ভগবান রামচন্দ্র রাবন বধের পূর্বে শরৎকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। এটি অকালে হয় বলে এই পূজাকে অকালবোধনও বলা হয়। কালক্ষেত্রে এই অকালবোধন এর পূজাটিই বড় আকারে রূপ নেয় যা জাতি ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে বাঙ্গালীর উৎসবে রূপ নেয়। তাছাড়া শরৎকালে এই পূজা হয় বলে এই সময়ের পূজাকে অনেকে শারদীয় দুর্গাপূজাও বলেন। এ ছাড়াও সনাতন ধর্মালম্বীদের আরো যে আচার অনুষ্ঠানগুলো সার্বজনীন উৎসব বা বাঙ্গালীর উৎসবে রূপ নেয় সেগুলো হলো কালীপূজা, দ্বীপাবলী উৎসব, সরস্বতি পূজা, ল²ীপূজা , চড়কপূজা ও চড়ক মেলা, দোল বা ফাগুয়া উৎসব, রথযাত্রা উৎসব, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্ঠমী উৎসব, শিবরাত্রী ব্রত, ত্রিকালদর্শী লোকনাথ ব্রম্মচারীর পাদুকা উৎসব, আবির্ভাব ও তিরোধান দিবস, শিবরাত্রী ব্রত, পূণ্য ¯œান ও তদসঙ্গে মেলার আয়োজন বর্তমানে বাঙ্গালীর উৎসব হিসেবে পরিগনিত। বিশেষ করে সুনাম গঞ্জের পূণ্যতীর্থ ¯œান ও নারায়নগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ ¯œান, সীতাকুন্ডের মেলা বাঙ্গালীর উৎসবে রুপ নেয়। একই সাথে ইসলাম ধর্মের অনেকগুলো উৎসব বাঙ্গালীর উৎসব হিসেবে পরিগনিত হয়। এর মধ্যে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী সাওয়াল মাসের প্রথম দিন অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল ফিতর (চাঁদ দেখা সাপেক্ষে) আর জিলহজ্জ মাসের দশম দিন হয় ঈদুল আযহা। ঈদুল ফিতরের রাতে চাঁদ দেখা নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে একটি আনন্দ উচ্ছাসের রূপ নেয়। যাকে বলা হয় চাঁদরাত । বিশেষ করে রমজান মাসের ২৯ বা ৩০তম রাতে চাঁদের দেখা পাওয়া যায়। আর এই চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে ঈদ উদযাপন। বলা চলে চাঁদরাতই ঈদের প্রস্তুতির আহবান জানায়। এ ছাড়াও মুহররম মাসের দশম দিনে অনুষ্ঠিত হয় প্রবিত্র আশুরা আর বার-ই রবিউল আউয়াল হযরত মোহাম্মদ (স:) এর জন্মদিনে পালিত হয় ঈদ-ই- মিলাদুন্নবী যা ইসলাম ধর্মের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। এছাড়াও শব-ই-কদর, শব-ই-বরাতসহ আরো একাধিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি উৎসব আমেজে পালন করেন ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা। আর টঙ্গির তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমাও এখন বাঙ্গালীর বড় ধর্মীয় উৎসবে রুপ নিয়েছে। বিশেষ করে মুসলমানদের ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্যতায় ও আত্মশুদ্ধির মানষিকতায় পালিত হয় একমাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। এ মাসে কেবলই সিয়াম সাধনাই নয় এ মাসে তারাবির নামাজ, সেহেরি, ইফতার এবং ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত অনেক দিবসাদি পালিত হয়। যা বাঙ্গালীর চিরাচরিত সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।

হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীরও বেশ কিছু ধর্মীয় উৎসব বাঙ্গালীর উৎসবে রুপ নিয়েছে। এর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের রয়েছে বৌদ্ধ প‚র্ণিমা, মধু প‚র্ণিমা, কঠিন চিবরদান। আর খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বড় ধর্মীয় উৎসব হলো বড়দিন, ইস্টার সানডে। এছাড়াও প্রত্যেক ধর্মেই রয়েছে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান। যেমন, বিয়ে, আকিকা, অন্নপ্রাসন। এ গুলোও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উৎসব আমেজে পালিত হয়। এদিকে ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও রাষ্ট্রীয়ভাবে রয়েছে বেশ কিছু জাতীয় উৎসব। সেগুলো হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস (ভাষা আন্দোলন) যা পালিত হয় ২১ শে ফেব্রয়ারি। ২৬ শে মার্চ অনুষ্ঠিত হয় মহান স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বিজয় দিবস। ১৫ আগষ্ট পালিত হয় জাতীয় শোক দিবস, ১৪ ডিসেম্বর পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৭ মার্চ পালিত হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও শিশু দিবস ও ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। মৌলবাদ ও বিদেশী আগ্রাসন যদি বন্ধ করা না হয় তাহলে বাঙ্গালীর লক্ষ লক্ষ বছরের নিজস্ব সংস্কৃতি এক সময় হারিয়ে যাবে।

বিকুল চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার ইলেক্টনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন; প্রতিনিধি- একুশে টেলিভিশন, ভোরের কাগজ ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Facebook Comments