প্রভাবশালীদের জবর দখলে নওগাঁর অধিকাংশ অর্পিত সম্পত্তি

 Posted on


মো. আতাউর রহমান, নওগাঁ :: মানুষ বিভিন্ন কারণে প্রান্তিক হয়ে থাকে। এই প্রান্তিকতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভূমিহীনতা। ভূমিহীন মানুষ অন্য অর্থে পরগাছার মতোই। সামান্য বাতাস, বৃষ্টি বা ধাক্কায় যার অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার মতো অবস্থা দাঁড়ায়। একইভাবে একজন ভূমিহীন মানুষ বা একটি ভূমিহীন পরিবারও অস্তিত্বহীন। সমাজে ভূমিহীন মানুষরা উদ্বাস্তুদের মতো জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়। জীবনের অর্থ কি তাঁরা যেন খুঁজে পায়না। যে জায়গাটি দিয়ে সে চলাচল করে, যে স্থানটিতে সে নিদ্রায় যায়, যে বাতাস নিয়ে সে শ্বাস-প্রশ্বাস চালায়, যে সূর্যের আলো দিয়ে সে নিজের পথ দেখে তাঁর কোনটিকেই সে আপন ভাবতে পারেনা। ভূমিহীন মানুষের মানসিক যাতনা তাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। অন্যদিকে অর্পিত সম্পত্তি আইনের বেড়াজালে পড়ায় সহায়-সম্পদ হারিয়ে যে সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ প্রান্তিক হয়েছে তাদের অবস্থা আরো নাজুক। চোখের সামনে অন্য মানুষ তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি ভোগ দখল করে বহাল তবিয়তে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করলেও তাকে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে হয়। এর চেয়ে ব্যথাতুর আর মর্মস্পর্শী আর কি বা হতে পারে। আমরা কমবেশী সকলেই ভারতবর্ষ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বৃটিশ শাসন, পাকিস্তানী শাসন এবং সর্বোপরী বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিষয়ে অবগত আছি। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, অত্যাচার-নির্যাতন, শোষণ-নিপীড়ন পাড়ি দিয়ে আজকের আমাদের এই উদীয়মান বাংলাদেশ। আমরা এও অবগত আছি যে, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্তমান বাংলাদেশের ভূ-সীমানার মধ্যে বসবাসকারী অধিকাংশ সংখ্যালঘু মানুষ তাদের সহায় সম্পদ ছেড়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই তাদের সম্পত্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে বিনিময় করে চিরতরে দেশত্যাগ করে। তবে অধিকাংশ সংখ্যালঘু পরিবার আবারো দেশে ফিরে আসার আশায় তাদের সম্পত্তি বিনিময় না করেই দেশ ত্যাগ করে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার ফিরে আসতে সক্ষম হলেও বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে অনেকেই আর স্বদেশে ফিরে আসতে পারেনি। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন অনুযায়ী ১৯৬৫ সালে সংগঠিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় যারা ভারতে পাড়ি জমায় এবং ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সাল হতে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সময়ের মধ্যে যারা আর বাংলাদেশে ফিরে আসেনি তাদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তিগুলোকে অর্পিত সম্পত্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে যারা সম্পত্তির কোন প্রকার বিনিময় না করেই চলে গেছে তাদের সম্পত্তিগুলোকে ‘ক’ তফশিলের অন্তর্ভূক্ত এবং যারা বিনিময় করে গেছে তাদের সম্পত্তিগুলোকে ‘খ’ তফশিলের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ভৌগোলিকভবে নওগাঁ জেলা বাংলাদেশের উত্তরে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় এ জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাসের পরিমাণও বেশী। জেলায় মূলধারার বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি হিন্দুসহ আরো প্রায় ১৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বাস। ২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী নওগাঁ জেলার ১১টি উপজেলায় ২৬ লাখ ১শত ৫৭ জনগোষ্ঠীর বাস। এর মধ্যে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ৪ লাখ ৬৬হাজার ৪শত ৬৬জন। অর্থাৎ জেলায় বসবাসকারী মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ১৮ভাগ সংখ্যালঘু। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশে বসবাসকারী প্রায় ৯০ভাগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ জীবনের নিরাপত্তার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাড়ি জমায়। যাদের অধিকাংশই আর পরবর্তী সময়ে এদেশে ফিরে আসেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকেই ফিরে আসলেও সহায়-সম্পত্তিতে স্বত্ব বুঝে না পাওয়ায় মনের দুঃখে আবারো ভারতে পাড়ি জমায়। নওগাঁ জেলার একটি অন্যতম উপজেলা পত্নীতলা। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী পপত্নীতলা উপজেলায় মোট ২লাখ ৩১ হাজার ৯শ’ জনসংখ্যার বাস। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ২০ভাগ সংখ্যালঘু। উপজেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বাস বেশী হওয়ায় এখানে অর্পিত জমির পরিমাণও বেশী। পত্নীতলা উপজেলা ভূমি অফিস হতে প্রাপ্ত তথ্য বিবরণী অনুযায়ী উপজেলায় মোট অর্পিত কৃষি জমির পরিমাণ ১হাজার ৫শ’ ৪২ একর। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর/২০১৭ মাস পর্যন্ত ৫শ’ ৫৭ একর জমি ৩শ’ ৩১ জনের নামে ইজারা প্রদান করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৯শ’ ৮৫ একর জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে যা ইজারাযোগ্য। অন্যদিকে “খ” তফশিলভুক্ত জমির নামজারীর আবেদন নিস্পত্তি সংক্রান্ত সেপ্টেম্বর/২০১৭ মাসের মাসিক তথ্য বিবরণী অনুযায়ী এ পর্যন্ত ৪শ’ ৭৫জন নামজারীর জন্য ভূমি কর্মকর্তার নিকট আবেদন করেছেন। যার মোট জমির পরিমাণ ২শ’ ৫৫একর। সেপ্টেম্বর/২০১৭ মাসে ৯জনের আবেদনের নিস্পত্তি করা হয়েছে। যার সম্পত্তির পরিমাণ ১একর। এ পর্যন্ত ২শ’ ৪জনের আবেদনের নিস্পত্তি করা হয়েছে। যার জমির পরিমাণ ১হাজার ৪শ’ ২১একর। অন্যদিকে ৫১জনের আবেদন বাতিল করা হয়েছে। যার জমির পরিমাণ ৪২ একর। এছাড়াও ২শ’ ৭১টি আবেদন পেন্ডিং অবস্থায় আছে, যার জমির পরিমাণ ১হাজার ২শ’ ৫৯ একর। সরেজমিনে পত্নীতলা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে “খ” তফশিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় জমি পড়েছে এমন কয়েক জনের সাথে কথা বললে তাঁরা জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী “খ” তফশিলভুক্ত জমি অবমুক্তির জন্য তাঁরা আইনজীবির মাধ্যমে কোর্টে আবেদন করেছিলেন। পরবর্তি সময়ে তাঁরা আইনজীবির মাধ্যমে জানতে পারেন যে, সরকার নীতিমালার পরিবর্তন করায় এ সকল মামলা আর পরিচালনার প্রয়োজন নেই। এর পর থেকে তাঁরা দখলে থাকা জমি স্বাভাবিক ভাবে ভোগদখল করে আসছেন। এর বেশী আর কিছু তাদের জানা নেই। এ বিষয়ে পাটিচরা ইউনিয়নের পাটিচরা গ্রামের উত্তম কুমার নামে এক ব্যক্তি জানান, পত্নীতলা ইউনিয়নের মামুদপুর গ্রামে তাঁর ৮৮শতাংশ জমি আছে যা “খ” তফশিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় পড়েছে। জমিটি স্থানীয় ২জন প্রভাবশালী দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক ভোগ দখল করে আসছে। তাঁর নিকট প্রয়োজনীয় দলিলাদি না থাকায় তিনি প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছেন না। এ বিষয়ে পত্নীতলা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আব্দুল করিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাপণের ক্ষেত্রে তাঁরা আন্তরিকতার সাথে কাজ করছেন। অর্পিত সম্পত্তির নিস্পত্তির জন্য আবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় যাচাই বাছাই সাপেক্ষে নীতিমালা অনুযায়ী তাঁরা পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।
মো. আতাউর রহমান, উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সকলের খবর ও শারি’র দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস্ মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments