প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহায়তায় পাল্টে যাচ্ছে ঝালকাঠির সাহসী নারী শেফালী রানী শীলের জীবনচিত্র

 Posted on


ঝালকাঠি প্রতিনিধি :: ঝালকাঠির ‘শেফালী রানী শীল’ এখন সারাদেশের এক আলোচিত নাম। সাহস ও জীবনসংগ্রামে তিনি স্থাপন করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বামীর অবর্তমানে, অজপাড়া গাঁয়ের বিরুপ পরিবেশে, ‘নারী নরসুন্দর’ হিসেবে, ১৫ বছর ধরে পুরুষ মানুষের চুল-দাঁড়ি কেটে তিনি সংসার চালানোর পাশাপাশি চার মেয়ে ও এক ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। শেফালী রানীর জীবনসংগ্রামের কাহিনী নজরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে চার শতাংশ জমি ও ভবন তৈরি করার জন্য তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। পাল্টে যেতে শুরু করেছে অসহায় শেফালী রানীর জীবনচিত্র। সব জায়গায় তার জয়জয়কার।

ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত দোগনা গ্রামের বাসিন্দা শেফালী রানী শীলের বয়স প্রায় ৫০ বছর। কাঠমিস্ত্রিরির মেয়ে শেফালী রানীকে অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে দেয়া হয়। দোগনা বাজারে স্বামী বিশ্বনাথ শীলের একটি সেলুন ছিল। কোন রকম চলে যেতো তাদের সংসার। একে একে তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় চার মেয়ে ও এক ছেলে। পনের-যোল বছর আগে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন স্বামী বিশ্বনাথ। বন্ধ হয়ে যায় সংসারের চাকা। নিজের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে না পেরে এক সময় নিরুদ্দেশ হয়ে যান বিশ্বনাথ। পুরো সংসারে অন্ধকার নেমে আসে। বুকে সাহস নিয়ে শেফালী রানী নিজেই সেলুনের দায়িত্ব নেন। সেই থেকে শুরু হয় পুরুষের চুল-দাঁড়ি কাটা। লোকজন একটু ভিন্ন চোখে দেখে পিছনে নানা কথা বললেও তাতে কান দেননি শেফালী রানী।

শেফালী রানী প্রতিদিন সকালে যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির হন দোগনা বাজারে। সেখানে এক প্রবাসীর বসতঘরের বারান্দায় দেয়া সেলুনে সারাদিন পুরুষের সৌন্দর্য্য বর্ধনের কাজ করেন। সাধারণ চুল কাটার পাশাপাশি আধুনিক স্টাইলের চুলের কাট দেয়াও রপ্ত করেন শেফালী রানী। তার নাম ছড়িয়ে পরে নিজ গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামগুলোতে। তরুন-যুবরা ছুটে আসতে থাকে শেফালী রানীর সেলুনে। শেফালী রানী অতি যতেœ চুল কাটা ও সেইভ করার কাজ চালিয়ে যান।

দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে, নিজে খেয়ে, না খেয়ে থেকেও শেফালী রানী সন্তানদের কষ্ট বুঝতে দেননি। লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের মানুষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার চার মেয়ে ও এক ছেলে এখন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছে। মাকে নিয়ে গর্ব করে সন্তানরা। একদিন চাকরি করে তারা মায়ের দুঃখ ঘুচানোসহ তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায়।

জীবনসংগ্রামে সাহসী ভূমিকার জন্য মহিলা বিষয়ক অধিদফতর গত বছর শেফালী রানীকে ‘জয়িতা পুরস্কার’ দিয়েছে। অধিদফতর থেকে তাকে স্বাবলম্বী করতে আর্থিক সহযোগিতা করাসহ সব সময়ে পাশে থাকারও আশ^াস দেয়া হয়েছে।

শেফালী রানীর জীবনসংগ্রামের কাহিনী সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে পারেন। তিনি সাহসী নারী শেফালী রানীর জন্য চার শতাংশ জমি এবং ভবন নির্মাণ করার জন্য তিন লাখ বরাদ্দ দেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার মোঃ এনামুর রহমান গত ২ জুলাই ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার দোগনা গ্রামে গিয়ে শেফালী রানীর হাতে বরাদ্দপত্র তুলে দেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোহসীনসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মোঃ জোহর আলী, পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিন এবং সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার এনামুর রহমান বলেন, শেফালী রানী জীবনসংগ্রামে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তার জন্য ‘মানবতার মা’ প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘উপহার’ নিয়ে হাজির হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা পেয়ে খুশি শেফালী রানী ও তার সন্তানরা। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানোসহ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এ উপলক্ষে দোগনা হাটে সমাবেশেরও আয়োজন করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার মোঃ এনামুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের ভাগ্যান্নয়নে বদ্ধপরিকর। এ দেশে একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না। সরকার অসহায়দের ঘরবাড়ি তৈরি করে দেয়াসহ তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবে। সমাবেশে শেফালী রানী বলেন, তার মতো একজন অসহায় মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবেন, এটা তার কল্পনাও ছিল না। তিনি শেখ হাসিনার প্রতি ফের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী দেয়া জমিতে ইতিমধ্যে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করার জন্য সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সারাদেশ থেকে শেফালী রানীর মতো জীবনসংগ্রামীদের খুঁজে বের করে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ-সাহস দেয়াসহ সব ধরনের সহযোগিতা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সচেতন মহল।

Facebook Comments