পাবনার সুজানগরে দেশত্যাগ করেছে প্রায় অর্ধেক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী

 Posted on


গোপাল অধিকারী, জেলা প্রতিনিধি (পাবনা) :: নানান জাতি বা সম্প্রদায়ের দেশ বাংলাদেশ। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের বাঙালি মিলে করেছিল ১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধ। যার প্রেক্ষিতে বীরত্বের প্রতীক অন্যান্য সম্প্রদায়ের মত পেয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। কিন্তু দেশের জন্য যুদ্ধ করলেও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পায় নাই দলিত জনগোষ্ঠী। যার পরিপ্রেক্ষিতে হতে হয়েছে বাস্তভিটা ছাড়া। নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পেতে কোথায় কোথায় করতে হয়েছে দেশত্যাগ। পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলা। হিন্দু সম্প্রদায়ের অত্যাচারিত একটি উপজেলা। পূর্বপুরুষ থেকে পাবনা জেলার ৭টি উপজেলার মাধ্যে সর্বাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল এই উপজেলায়। সুজানগরের সাগরকান্দি, সাতবাড়িয়া, নাজিরগঞ্জ, মানিকদিও, মথুরাপুর, দুর্গাপুর, কুঁড়িপাড়া, ভাটপাড়া, নারোহাটি, কাটোয়া, শান্তিপুর, নিশ্চিন্তপুর, খেতুপাড়া, রায়পুর, উদয়পুর ও শোলাকুড়ি মিলে মোট প্রায় দুই হাজার পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময় বিভিন্ কারণে দেশত্যাগ করাই বর্তমানে তা দাড়িয়েছে একহাজার পরিবারে। কুঁড়িপাড়া প্রায় ৫০ পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা কমে দাড়িয়েছে আনুমানিক ২৫ ঘর। সাতবাড়িয়া প্রায় ৭৫০ পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা কমে দাড়িয়েছে আনুমানিক ১৫০ ঘর। কারণ হিসেবে উঠে আসে স্থানীয় অত্যাচার, বৈষম্য, সামাজিক অসহযোগীতা ও নদী ভাঙ্গন। স্বাধীনতা পরবর্তী ও ২০০১ সালে জোট সরকারের আমলে এই দেশত্যাগের নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে বলে জানা যায় বিভিন্নসূত্রে পাওয়া তথ্যমতে। চুরি-ডাকাতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে এগুলো ঘটেছে বলে মত দেন তারা। তবে কারও কোন সম্পত্তি অন্যের দখলে নেয় বলে জানা যায়। তবে কিছু নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। সেগুলোর কোন ব্যবস্থা হয় নাই।
সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি রতন কুমার সরকার বলেন, সাতবাড়িয়াতে প্রায় ৯৯% হিন্দুরা চলে গেছে। সাতবাড়িয়া ৭১ সালে প্রায় ৭৫০ পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা কমে দাড়িয়েছে আনুমানিক ১৫০ ঘর। তিনি বলেন মূলত দুইটি কারণে সাতবাড়িয়ার হিন্দুরা চলে গেছে। এক নদী ভাঙ্গন ও দুই একাত্তরের গণগত্যা।
সুজানগর উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অতুল কুন্ডু জানান, সুজানগর সদরে প্রায় ৫০০ পরিবার হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী আছে। বর্তমানে কেউ না গেলেও পূর্বে প্রায় ৫০% জনগোষ্ঠী চলে গেছে।
সুজানগর উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রনজিৎ কুমার রায় বলেন, দেশের অন্যান্য স্থানের ন্যায় সুজানগরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দেশত্যাগের কারণ আচার ও ব্যবহারের বৈষম্য। এছাড়াও সামাজিক অসহযোগিতা বা ভয়ের কারণে অনেকে চলে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
পাবনা জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাদল ঘোষ জানান, পাবনা জেলার মধ্যে সুজানগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক জনগোষ্ঠী দেশত্যাগ করেছে। তিনি বলেন, স্থানীয় নির্যাতনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা এলাকা ত্যাগ করে শহরে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, সুজানগরের অনেক পরিবারের ছেলে-মেয়ে পাবনাতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করায় তারা ত্যাগ করেছে। তিনি বলেন, কিছু সুবিধাবাদী মহল আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আমাদের মধ্যে আতংকের সৃষ্টি করে পরবর্তীতে বিভিন্ভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করছে।
পাবনা জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি চন্দন কুমার চক্রবর্তী জানান, বর্তমানে পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেশি লোকজন দেশত্যাগ করেছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নির্যাতন ও অত্যাচারের কথা বলেন। তিনি বলেন ২০০১ সালে জোট সরকারের আমলেও অনেকে অত্যাচারিত হয়ে চলে গেছে। তাছাড়া জিয়াউর রহমানের ক্ষমতাকালীন সময়ে চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়ায় দেশত্যাগে বাধ্য হয়। তবে বর্তমানে কেউ যাচ্ছে না বলে তিনি জানান। আর কারো জমি অন্যের দখলে নেই বলে তিনি জানান।

গোপাল অধিকারী, নির্বাহী সম্পাদক ইতিহাস২৪, উপজেলা প্রতিনিধি-দৈনিক আমার বার্তা ও র্বাতা সম্পাদক সাপ্তাহিক সময়ের ইতিহাস, সহ-সভাপতি শারি’র মাইনরিটি’স হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরাম।

Facebook Comments