পটুয়াখালীর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারী সুযোগ বঞ্চিত

 Posted on

মশিউর রহমান টিপু, পটুয়াখালী :: ফুলরানী। বয়স প্রায় ৮০ বছর। স্বামী বেঁচে নেই। হাটুর সমস্যার কারণে ভালভাবে হাটতে পারেন না। চোখে দেখেন ঝাঁপসা। থাকেন পটুয়াখালী পৌরসভার ঋষি কলোনীতে। ফুল রানী জানান, এখন পর্যন্ত তিনি কোন সরকারি বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতা পাননি। স্বামী থাকতে মোটামুটি সংসার চললেও এখন খুবই কষ্টে আছি। ছেলে যে আয় করে তা দিয়ে সংসার চলে না। ফুল রানী আরো বলেন, স্বামী ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সুখের সংসার ছিল। স্বামী যে আয় করত তা দিয়ে সংসার ভালভাবে চলে যেত, পরে মেয়ের বিয়েতে সঞ্চয়ের সব টাকা খরচ হয়ে যায়। এরপর স্বামীর অসুখে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পরে বাধ্য হয়ে ছোট ছেলেকে জুতা সেলাইয়ের কাজে নামতে হয়। লেখাপড়া আর করতে পারেনি। তিনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে আছি। এখন ছেলে বিয়ে করেছে, সংসার হয়েছে, সন্তান হয়েছে এবং সংসারের খরচ বেড়ে গেছে। একজনের আয়ে এতজনের খরচ চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু কিছুই করার নেই। অসুস্থ হলে অনেক সময় ওষুধ খেতে পারি না পয়সার অভাবে। এ সময় যদি সরকারি বয়ষ্ক বা বিধবা ভাতা পেতাম খুবই উপকারী হতাম। অনেককে এইসব ভাতা দেয়া হয় শুনেছি, আমি পাই নাই। একই অবস্থা ঋষি কলোনীর আলো রানী, কমলা রানী, অঞ্জলী রানী, শ্রীমতি ও অরুনী রানীর।
পটুয়াখালী পৌরসভার ঋষি কলোনীতে বসবাস করে প্রায় ৪০টি পরিবার। লোকসংখ্যা ৩০০ জন। এ কলোনীর পুরুষরা প্রায় সবাই জুতা সেলাই করা, গবাদি পশুর চামড়া সংগ্রহের কাজ করে। এ কাজে চলে সকলের সংসার। বছরের পর বছর ধরে তারা এখানে বসবাস করলেও সরকারি বিভিন্ন সহযোগিতা থেকে তারা বঞ্চিত। এ ঋষি কলোনীর আর এক নারী কাজুরী রানী বলেন, আমাদের আশেপাশে অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা সহ বিভিন্ন সহযোগিতা পেলেও আমাদের সে তালিকায় কেউ নাম দেয় না। আমাদের কাছে সরকারি লোকজন আসেও না। পৌরসভা থেকে ঈদ সহ বিভিন্ন সময়ে গরীবদের সহযোগিতা হিসাবে চাল দেয়া হলেও আমরা তা পাই না। পূজার সময় গত বছর আমাদের মন্দিরে শুধু ৩ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। ঋষি কলোনীর আরেক বাসিন্দা মায়া রানী বলেন, আমাদের এখানকার পুরুষরা কাজ করলেও মহিলারা সবাই বসে থাকি। আমাদের সেলাই বা হাতের কাজের কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হলেই কাজ করে আমরা স্বাবলম্বী হতে পারতাম। কলোনীর আরেক বাসিন্দা অঞ্জলী রানী বলেন, শুনেছি সরকার বর্তমানে গরীবদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বিভিন্ন ট্রেনিং দিয়ে থাকে। কিন্তু কারা দেয় কোথায় দেয় আমরা তা জানিনা। আমাদের সাথে এ বিষয়ে কেউ জানতেও আসেনি। হাতের কাজে কোন প্রশিক্ষন পেলে আমারদের খুবই ভাল হতো। তিনি আরো বলেন, আমাদের এখানে অনেক বৃদ্ধ থাকলেও বয়স্ক তালিকায় তাদের নাম কেউ দেয় না। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি বয়স্ক ও বিধবাদের জন্য ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করে।
এ বিষয়ে মহিলা অধিদপ্তর পটুয়াখালী জেলার ভারপ্রাপ্ত সাহিদা সুলতানা বলেন, আমরা জেলার বিভিন্ন পর্যায়ে পিছিয়ে পাড়া বেকার নারী জনগোষ্ঠীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সেলাই, বøক, বাটিক প্রশিক্ষণ, মোম তৈরি, পার্লাারের কাজ সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করি। এজন্য আমরা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করি, যারা আগ্রহী তারা আবেদন করে। এর মধ্যে থেকে আমরা প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করি। এসব প্রশিক্ষণে যদি দলিত সম্প্রদায়ের কেউ অংশগ্রহণ করতে চায়, অবশ্যই আমাদের তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। আগামীতে যাতে তারা এ ধরনের প্রশিক্ষণ সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া গর্ভবতী মায়েদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের। এ সুযোগ যাতে তারা পেতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে।
এ বিষয়ে পৌর কমিশনার এ্যাড. আক্তারুজ্জামান নোবেল বলেন, পৌরসভা থেকে বিভিন্ন সময়ে যেসব সাহায্য কার্যক্রম পরিচালিত হয় তা দরিদ্র জনগোষ্ঠী পেয়ে থাকে। ঋষি কলোনীর লোকজন আমাদের সাথে যোগাযোগ করে না বলে তালিকায় তাদের নাম সব সময় দেয়া সম্ভব হয় না। তবে ঋষি কলোনীর উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পৌরসভা থেকে নেওয়া হয়েছে। কলোনীর ভিতরের রাস্তা পাকা করে দেয়া হয়েছে। ঢোকার পথের সড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে। কলোনীর সামনে আলোর ব্যাবস্থা করা হয়েছে। কলোনীর কারো কোন সমস্যা হলে আমার জানলে সব সময় তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসি।
মশিউর রহমান টিপু, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক সংবাদ এবং শারি’র মাইনরিটি হিউম্যান রাইট্স মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments