নড়াইলে পেশাগত বৈষম্যই দলিত জনগোষ্ঠীর শিশু শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ

 Posted on

তানভীর আহমেদ রুবেল, নড়াইল :: “আমি জানি, ভবিষ্যতে বড় হয়ে আমার সন্তানরাও ওই একই কাজ করবে। লেখাপড়া করে জীবন বদলানোর সুযোগ তারা পাবে না। কারণ, আমাদেরকে তো মানুষ বলেই গণ্য করা হয় না”-৭ বছর বয়সী মেয়ে দিপিকার দিকে তাকিয়ে নিজের ভাষায় ঠিক এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন মা হেমন্ত রানী। অস্থায়ী ভিত্তিতে লোহাগড়া পৌরসভার ঝাড়–দার পেশায় কাজ করেন তিনি। নড়াইলে হেমন্তের মতো হাজারো দলিত মানুষের বসবাস। আর হেমন্তের শিশু সন্তানের মতো বিপুল এই জনগোষ্ঠীর শিশুরাও বেড়ে ওঠছে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে।
“স্কুলিতো যাতিই চাই কিন্তু ওরা খালি মুচির ছাওয়াল কয়ে মারে” – ১০বছরের দলিত শিশু অলোকের উক্তিটিই বলে দেয় শিক্ষায় তাদের অবস্থানের কথা। অলোকের বাড়ি নড়াইলের লোহগড়া উপজেলার ঋষি পাড়ায়। শুধু অলোকই নয়, তার মতো শত-শত দলিত শিশুরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে শিক্ষায়, খেলাধূলায়, শিল্প-সংষ্কৃতিতে, কর্মসংস্থানে। নড়াইলের অনেক গ্রামেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুরা। দলিত জনগোষ্ঠীর শিশুরা বেশির ভাগই অজ্ঞতার কারণে ভালো শিক্ষায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবহেলিত হওয়ার কারণে দলিত স¤প্রদায়ের শিশুদের পড়ালেখার উপর তাগিদ নেই পরিবার প্রধানদের। ছোট বেলা থেকেই বাবা-মায়ের সাথে কর্মস্থলে ছুটে চলা। সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের শিশুদের তুলনায় সুবিধা বঞ্চিত দলিত শিশুরা নিজেদের আলাদা ভাবে ভাবতে শুরু করে। মনে করে তারা ভিন্ন কোন জাতের লোক।
দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তির হার ৯৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে মেয়ে শিশুর হারও ঈর্ষণীয়, শতকরা ৫২.৪৮ ভাগ। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গ্রামে-গঞ্জে, বেড়ে ওঠা দরিদ্র পরিবারের শিশুরাও আজ বিদ্যালয়মুখী। তবে শিক্ষার এই ঢেউ সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং নানামুখী বৈষম্যের শিকার কিশোরদের আজও স্পর্শ করতে পারে নি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু (৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী)। এ হিসেবে দলিত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। অথচ প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ এতই নগণ্য যে তার কোনো হিসাবই নেই। বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা ব্যবস্থা থাকলেও দলিতদের জন্য তা নেই। আইনী সুরক্ষার সুযোগ না থাকায় দলিত মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হারও বেশি। দলিত নারীরা এখনও সরকার ঘোষিত মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে বঞ্চিত। দেশে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ২৬ শতাংশ। আর দলিত স¤প্রদায়ের মধ্যে এই হার ৯৬ শতাংশ। তাই একই দেশের নাগরিক হওয়া সত্তে¡ও নড়াইল জেলায় শিক্ষা নামের পরশ পাথরের ছোঁয়া দলিত শিশুদের ভাগ্যে নেই।
চিকিৎসা, পুষ্টি, পড়ালেখা এসব কি এ বিষয়ে তাদের কোন ধারনা নেই। দলিত স¤প্রদায়ের বেশির ভাগ পরিবার প্রধানরা সামান্য টাকা বেতনে পৌরসভা, হাট-বাজার ঝাড়–, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের কাজ করে। সরকারি কোটা চালু থাকলেও তাদের চাকরি হচ্ছে না। ফলে পরিবার থেকেই শিক্ষার প্রতি অনিহা প্রকাশ করে। তাই অযথা বসে না থেকে ৭-৮ বছর বয়সেই এসব শিশুরা ঝুকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে। তবে দলিত স¤প্রদায়ের শিশুরা পরিশ্রমী। তবে তাদের সু-সংগঠিত হতে অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান প্রাপ্তিসহ সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রয়োজন সকলের মানবতা ও আন্তরিকতা। দলিত স¤প্রদায়ের সমাজে প্রচলিত আইন ও নীতিমালা, সংষ্কার, সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক প্রথা, মূল্যবোধ, রীতিনীতির বাধ্যবাধকতা এসব কিছুই তাদের অধিকার আদায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নড়াইলের লাহুড়িয়া, কাশিপুর, গোপীনাথপুরসহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত দলিত শিশুদের জন্য নেই আলাদা কোনো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, এমনকি শিক্ষামূলক বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা। এই জনগোষ্ঠীর সদস্য অচিন্ত্য বিশ্বাস বলেন, “আমরা গরিব, ভালো আয় করতে পারি না, তাই ছেলে-মেয়ে নিয়ে কাজ করে খাই।” দিন দিন বেড়েই চলেছে শিশুশ্রম। কেউ ভ্যান চালায়, কেউ গ্যারেজে কাজ করে, কেউ হোটেলে পরিচ্ছন্নতার কাজ করে, মোট কথা বয়স ৭ হলেই কেউ আর বসে নেই। স্কুলে গমনের প্রবণতা থাকলেও বেশির ভাগ মাধ্যমিকে গিয়ে আটকে থাকে। বাল্যবিয়ের হার এদের মাঝে খুব বেশি, মেয়েদের ১৩-১৪ বছর বয়স হলেই বিয়ে দেওয়া যেন রিতিমতো প্রথা হয়ে গেছে। কোন নিবন্ধন ছাড়াই হয় বিয়ে। বিবাহ নিবন্ধন কি তা তারা জানেই না। স্কুলগুলোতে এসব শিশুদের সব সময়ই পেছনের সারিতে বা পৃথক ভাবে বসতে বাধ্য করা হয। তাদেরকে অবমাননাসূচক নামে ডাকা হয়। সেজন্য দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী সমাজের শুদ্ধতা রক্ষায় কাজ করলেও তারা ঘৃণা ও বৈষম্যের শিকার।
শিশুদের ক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করায় আজ তারা প্রতিটা ক্ষেত্রেই পদদলিত হচ্ছে। তাই তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে শিশুরা যাতে ভবিষ্যতে দেশের সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে সে ব্যাপারে সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান সমাজের প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী।
– তানভীর আহমেদ রুবেল, দীপ্ত টিভি ও দৈনিক আজকের পত্রিকার নড়াইল জেলা প্রতিনিধি এবং শারি’র দলিত ও মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments