নির্ধারিত সময় ধরে কাজ করলেও পুরুষের তুলনায় অর্ধেক বেতন দেওয়া হয়- আক্ষেপ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাধা রানী বাঁশফোর-এর

 Posted on

জয়পুরহাট থেকে সুজন কুমার মন্ডল :: জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকায় দলিত সম্প্রদায়ের বসবাস, তাদের শিক্ষার হার খুবই কম। তারা খুবই সহজ সরল নিরীহ প্রকৃতির। তারা নিজদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করলেও অন্যদের সঙ্গে তেমন মেলামেশা ও ঝগড়া বিবাদ করে না। সরজমিন ঘুরে জেলার বিভিন্ন এলাকা দেখা যায় এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় সনাতন ধর্মের বিধান অনুযায়ী অগ্নি এবং দেব দেবীকে সাক্ষী রেখে পারিবারিক ভাবে বিবাহ বন্ধনে অবন্ধ হয়। তাদের মধ্যে সংসার জীবনে স্বামী ন্ত্রীর মধ্যে খুবই মিল। শুধু তাই না যে কোন পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছেলে মেয়ে বৃদ্ধ নারী পুরুষ এক সঙ্গে বসে নাচ গান আড্ডা দিতে ভালোবাসে সাংসারিক প্রয়োজনে হাট বাজার ও স্বামী স্ত্রী মিলেমিশে একত্রে বাজারে গিয়ে তারা প্রয়োজনীয় কাজ সারে। এটা হলো ঘরের ভিতরের কথা আর বাহিরের কথা হলো।এদের নারী পুরুষ কেউ বাড়ীতে বসে থাকে না। জয়পুরহাট জেলার হরিজন ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক মুনু হরিজন জানান আধুনিক এই যুগে যখন শিক্ষা স্বাস্থ্য সর্বক্ষেত্রে দেশ যথন এগিয়ে যাচ্ছে তখন দলিত জনগোষ্টি অন্য সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। তারপর দলিত সম্প্রদায়ের পুরুষের তুলুনায় নারীরা অনেক পিছিয়ে। দলিত নারীদের সামাজিক অবস্থান জয়পুরহাটে শুন্য কোঠায়। তারপর ও সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ এবং এনজিওদের তৎপরতার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে দলিতদের উন্নয়নে যে সমস্ত কমিটি গঠন হচ্ছে সেখানে দলিত নারীদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আগের চেয়ে দলিত মেয়ে ধীরে ধীরে স্কুলমুখী হচ্ছে। আমাদের সাংসারিক এবং সামাজিক কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের পরামর্শ গ্রহণ করা হচ্ছে, আমাদের সম্প্রদায়ের নারীরা আজ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে এবং দেশ বিদেশ এর খবর রাখে, এক্ষেত্রে আমি মনে করি নারীরা আগের চেয়ে সচেতন হচ্ছে। তিনি আরো জানান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে বর্তমান সমাজের সঙ্গে খাপ খেয়ে তারা চলতে পারছে না। একই পেশার পরিস্কার পরিছন্ন কাজ নিধারিত সময় ধরে করলেও পুরুষের তুলনায় নারীদেরকে অর্ধেক বেতন দেওয়া হয়। যুগ যুগ ধরে অবহেলিত নারী সমাজ। দলিত সম্প্রদায়ের লোক হওয়ার কারণে দেশের উন্নয়ন কমকান্ডে নারী পুরুষের সমান অবদান থাকা সত্ত্বেও দলিত নারী নিগৃহীত। সমাজ রাষ্ট্রের কাছে মনে হয় দলিত নারীরা বোঝা, তাদেরকে যে সমাজের মূলধারায় আনতে হবে এর দায়িত্ব কে নেবে। এদের কাজে যেমন বেতন বৈষম্য তেমনি দৃষ্টিভঙ্গির আচরণ, এ ব্যাপরে ব্যাপারে কেউ প্রতিবাদ করার নেই। এই বিষয়ে দুঃখ করে বলেন জয়পুরহাট চিনিকল হরিজন কলোনীর সদস্য রাধা রানী বাঁশফোর- আমি একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসাবে কাজ করি আমার বেতন ১৫০০ টাকা, আর একজন মুসলিম পুরুষ পরিচ্ছন্ন কর্মী আমার পেশায় কাজ করে দুই জন ৮ ঘন্টা করে ভাগ করে কাজ করি তার বেতন ২৮০০ টাকা। শুধু এখানে নই যে কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে দলিত নারীদের বেতন বৈষম্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমাদের নারীরা পুরুষের মত চলাফেরা করতে পারলেও সমাজে নিজের মতামত ও সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা খুবই কম। আমরা দলিত সম্প্রদায় পদে পদে আমাদের সাংবিধানিক আধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের নারীরা শিক্ষায় দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে থাকার কারণে পুরুষ শাষিত সমাজে আমাদের স্থান নেই। হরিজন কলোনীর আর এক সদস্য সাথী রানী হরিজন জানান আমাদের হাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় ভাবে মন্ডল, প্রধান, সম্পাদক, সভাপতি, নির্বাচন করা হয় সেই ক্ষেত্রে ও দলিত নারীদের কোন স্থান নেই। অন্য ধর্মের নারীদের চেয়েও আমরা বেশি অসহায়। তিনি আরো জানান অন্য ধর্মের নারীরা বিয়ের পর বাবা মার নিকট অনেক কিছু পায়। সেই ক্ষেত্রে ও দলিত নারীদের চিত্র ভিন্ন। তিনি আরো বলেন আমাদের শরীর সম্পদ যত দিন গতরে শক্তি থাকে ততদিন আমরা খেটে খাওয়া পছন্দ করি। এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন সমাজে দলিত সম্প্রদায় মোট জনসংখ্যার একটি অংশ, দেখেতো কয়জন লোক দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে পুঙ্গ অথবা ভিখারী আছে। রাষ্ট্র তথা দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে দলিত সম্প্রদায়ের পুরুষের পাশাপাশি আমাদের নারীদের অবদান কম না। আমরা দলিত সম্প্রদায়ের লোকেরা সরকারের নিকট ভিক্ষা নয় কাজ চাই। হরিজন কলোনীর আর এক সদস্য রঘুনাথ হরিজন জানান আমি মনে করি আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে নারী পুরুষের ভেদাভেদ খুবই কম। আমাদের ঘরে যখন কোন নবজাতক আসে আমরা মনে করি নারী আসলে মা লক্ষী আর পুরুষ আসলে নারায়ণ বাবা এসেছে তাতেই আমরা খুশি আমরা সামাজিক ভাবে নারী পুরুষের বৈষম্য বিশ্বাস করি না। ভগবান আমাদের কে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে লক্ষী এবং নারায়ণ হিসাবে। আসুন আমরা সমাজে দলিত পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমান অধিকার দেই এবং দলিত পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকে সমাজের মূলধারার ফেরার জন্য সোচ্চার হই।

সুজন কুমার মন্ডল, শারি’র হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার

Facebook Comments