নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এখনও বিদ্যালয়মুখী হতে পারে নি নওগাঁর বেশিরভাগ হরিজন শিশু

 Posted on

মো. আতাউর রহমান, নওগাঁ :: শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নয়নের শিখরে উঠতে পারে না। এই উক্তিটি হৃদয়ে ধারণ করে যখন দেশের মূলধারার জনগোষ্ঠী সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তখন বাংলাদেশের অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী দলিত শ্রেণীর শিশুরা সবেমাত্র বিদ্যালয়ের গন্ডিতে পা রাখতে শুরু করেছে। বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক অস্পৃশ্যতার কারণে বিগত দিনগুলিতে দলিত জনগোষ্ঠী শিক্ষা লাভ করতে পারেনি। বর্তমানে যে সীমিত সংখ্যক দলিত শিশু বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করেছে একই কারণে তারাও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। যা দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা অর্জন কার্যক্রমকে চরমভাবে ব্যহত করছে। যদিও সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিক্ষিপ্তভাবে নওগাঁ জেলার ১১টি উপজেলায় প্রায় ৬ শতাধিক হরিজন জনগোষ্ঠীর বাস। এর মধ্যে নওগাঁ পৌরসভার অন্তর্গত হরিজন কলোনীতেই ৯৯পরিবারে ৩২৮ জনসংখ্যার বাস। অনিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন, সামাজিক সচেতনতার অভাব, অভিভাবকদের অনীহা, হরিজন শিশুদের প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদাসীনতা ও অস্পৃশ্যতার ধারণার কারণে ২০০৯ সালের পূর্ব পর্যন্ত এ সকল হরিজন কলোনীর কোনো শিশু বিদ্যালয়ে যেত না। বিষয়টি নজরে এলে নওগাঁর স্থানীয় বেসরকারি সংগঠন বরেন্দ্রভ‚মি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (বিএসডিও) ২০০৮ সালে নওগাঁ ও সান্তাহার হরিজন কলোনীতে ২টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র (প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়) স্থাপন করেন। এ সকল বিকাশ কেন্দ্রে ৪-৬ বয়সী ৩০জন করে হরিজন শিশুদের শিক্ষার্থী হিসাবে ভর্তি করানো হয়। উদ্দেশ্য ছিলো ১বছর মেয়াদী এ সকল বিদ্যালয়ের মাধ্যমে হরিজন শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা যাতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে তারা বাঙালি শিশুদের সাথে সহাবস্থানে থেকে পড়ালেখা করতে পারে এবং পরবর্তীকালে ঝরে না পড়ে। নির্ধারিত ১বছর শেষে কোর্স সম্পন্নকারী ১৫জন হরিজন শিশুদের নিকটতম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। এই কার্যক্রমে সফলতা এলেও দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ না পাওয়ায় বিএসডিও এই কার্যক্রমটি গুটিয়ে নেয়। পরে ২০০৯ সালে নওগাঁর বেসরকারি সংগঠন আরকো নওগাঁ হরিজন কলোনীতে একই কার্যক্রম গ্রহণ করে। যা অদ্যাবধি চলমান রয়েছে।
সরেজমিনে নওগাঁ হরিজন কলোনীতে গিয়ে দেখা গেছে হরিজন শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করণের লক্ষ্যে আরকো রিক সেন্টার (প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনের কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর দিপক কুমার বাঁশফোড় জানান, ২০০৯ সাল থেকে আরকো নওগাঁয় এই কার্যক্রম পরিচালিত করছে। প্রতি বছর ২০-২৫জন ৫-৬ বছর বয়সী হরিজন শিশুদের নিয়ে ১বছর মেয়াদী বিদ্যালয় পরিচালনা করা হয়। বছর শেষে বিদ্যালয়ে গমন উপযোগী শিশুদের নিকটতম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়। গত ৬ বছরে প্রায় ৪০জন হরিজন শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হলেও বাল্য বিবাহ প্রবণতা থাকায় এদের মধ্যে প্রায় ২০ভাগ শিশু ঝরে পড়েছে বলেও তিনি জানান। আলাপচারিতায় তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ে হরিজন শিশুদের পড়ালেখার পাশাপাশি সামাজিক শিক্ষা ও অভিভাবকদের অধিকার সচেতনতা বিষয়ে কাজ করা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হরিজন শিশুদের ভর্তি করে দেওয়া হলেও পরিবারে অভিভাবকদের ভ‚মিকা না থাকা, কলোনীতে নেশা প্রবণতা, আর্থিক সংকট ইত্যাদি কারণে হরিজন শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে চায়না। যা এই উদ্যোগকে বিঘিœত করছে।
সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে হরিজন অভিভাবকদের সাথে আলোচনা কালে রিক সেন্টার হতে খাঁস নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ২য় শ্রেণির ছাত্র নিশান বাঁশফোড় এর মা চাঁদনী বাঁশফোড় জানান, দরকার হলে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। সেখানে শিক্ষকরা ভালো ব্যবহার করে বলেও তিনি জানান। অন্যদিকে একই বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত প্রীতি বাঁশফোড় এর পিতা রামচন্দ্র বাঁশফোড় এর সাথে কথা বললে তিনি মেয়ে কোন শ্রেণিতে পড়ে তা বলতে পারেন নি। কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে খোঁজ-খবর রাখা হয় না বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে খাঁস নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুস্মিতা জানান, তাদের বিদ্যালয়ে মাত্র ৭জন হরিজন শিশু অধ্যয়ন করছে। এ সকল শিশুরা বিদ্যালয়ে অনিয়মিত হওয়ায় তারা বেশ সমস্যার মধ্যে আছেন। অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে তারা শতভাগ হরিজন শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে পারছেন না। হরিজন শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য অভিভাবকদের ব্যাপকভাবে সচেতন করার বিকল্প নেই বলেও মত দেন এই শিক্ষক।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সরকারি যে বরাদ্দ আছে তা হরিজন কলোনীর ছাত্র-ছাত্রীরা পেয়ে থাকেন। জেলা সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে গত ৩বছরে হরিজন কলোনীর ১১জন ছাত্র-ছাত্রী ২হাজার ৬শ টাকা করে শিক্ষা অনুদান পেয়েছে বলে আরকোর কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর দিপক কুমার বাঁশফোড় জানান।
বাংলাদেশের মূলধারার জনগোষ্ঠীর অভিভাবকরা যখন তাদের সন্তানদের পড়ালেখায় সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে তখন নওগাঁর দলিত জনগোষ্ঠী এখনও এ বিষয়ক অসচেতনতার তিমিরেই রয়ে গেছে। যা এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের দিন দিন প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দলিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অনগ্রসরতার কারণ অনুসন্ধান করে তাদের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে জেলার সার্বিক শিক্ষার হারের লক্ষ্য অর্জনকে ব্যাহত করবে এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা।
– মো. আতাউর রহমান, দৈনিক আজকের দর্পণ পত্রিকার নওগাঁ প্রতিনিধি এবং শারি’র দলিত ও মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।

Facebook Comments